ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতার পদে বসার পর বৃহস্পতিবার প্রথম প্রকাশ্যে এসেছে নিহত আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পুত্র মোজতবা খামেনেইয়ের বিবৃতি। ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য সান’-এ মার্কিন হামলায় তাঁর গুরুতর জখম হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোজতবার বিবৃতি প্রকাশ করে তেহরান।
বিবৃতিতে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মোজতবা। বলেছেন, ‘‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যাঁরা নিহত হয়েছেন, এ বার তাঁদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়াই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’’ পাশাপাশি ওই বিবৃতিতে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমু়জ় প্রণালী অবরুদ্ধ করেই রাখবে ইরানি সেনা। মোজতবার কথায়, ‘‘শত্রুর উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসাবেই অবরুদ্ধ করে রাখা হবে হরমুজ় প্রণালী।’’
সরকারি টিভি চ্যানেল মারফত প্রচারিত ওই অডিয়ো বিবৃতিতে মোজতবার মন্তব্য, ‘‘প্রতিশোধের একটি সীমিত অংশ ইতিমধ্যেই বাস্তব রূপ নিয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্যপূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেটিই হবে আমাদের অগ্রাধিকার।’’ সেই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় দেশগুলিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার আশ্বাস— ‘‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাস করে। কিন্তু এই দেশগুলিতে থাকা মার্কিন সেনাঘাঁটি নিশানা করে আমরা হামলা চালিয়ে যাব।’’ বৃহস্পতিবারই হরমুজ় প্রণালীতে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজের উপর হামলা চালিয়েছে ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)।
আমেরিকা-ইজ়রায়েলের হামলায় শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হারিয়েছে ইরান। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসেছেন তাঁর পুত্র মোজতবা। ৯ মার্চ বছর ৫৬-এর মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নেয় ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’। এর পরই তাঁর নামে জোড়া শত্রুর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে সুপ্রিম লিডারের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইআরজিসি।
এর মধ্যেই জানা গিয়েছে খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবার সুরক্ষার জন্য তাদের বিশেষ সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী ‘নোপো’ (এনওপিও)-কে মোতায়েন করেছে ইরান।
আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ়’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের একটি এলাকায় আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযানে খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মোজতবার সুরক্ষায় কালো পোশাক পরা এই বিশেষ বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্যারিস-ভিত্তিক ইরানের জাতীয় প্রতিরোধ পরিষদের কর্তা আলি সাফাভি জানিয়েছে, বিশেষ এই সশস্ত্র বাহিনী এখন থেকে নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতার সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে। সংবাদমাধ্যমে সাফাভি বলেছেন, ‘‘খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর সম্ভবত এখন মোজতবার সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে নোপো বাহিনী।’’
কিন্তু কী এই নোপো বাহিনী? নোপো হল ‘নিরৌয়েহ বিজেহ পাসদারান বেলায়াত’-এর ফার্সি সংক্ষিপ্ত রূপ, যা শাসনব্যবস্থা সুরক্ষার জন্য নিযুক্ত একটি বিশেষ বাহিনী।
সাফাভি জানিয়েছেন, বিশেষ এই বাহিনী তৈরি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ২৮তম ‘রুহুল্লা ডিভিশন’-এ এই বাহিনী তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা রুহুল্লা খোমেইনির নামেই বাহিনীর নামকরণ করা হয়েছিল।
সাফাভি আরও জানিয়েছেন, ইরানের বিশেষ এই বাহিনী তুলনামূলক ভাবে ছোট কিন্তু অত্যন্ত অভিজ্ঞ। ছ’টি ব্রিগেড নিয়ে গঠিত এই বাহিনীর চারটি ব্রিগেড তেহরানে এবং একটি করে ব্রিগেড মাশহাদ ও ইসফাহানে অবস্থিত।
সাফাভির মতে, নোপো বাহিনীর সদস্যেরা ইরানের সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির সেনাদের থেকে অনেক বেশি প্রশিক্ষিত, অনেক বেশি ভয়ঙ্কর এবং অনেক বেশি নির্মম।
বাহিনীটি মূলত অপহৃতদের উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার জন্য তৈরি করা হলেও পরে এই ইউনিটটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা এবং সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ দমন করার জন্যও মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাফাভি। নোপো বাহিনীর কয়েক জন সদস্য ইরান জুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা রোধের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছেন বলেও তাঁর দাবি।
সাফাভির কথায়, ‘‘নোপোর কিছু সদস্য সম্প্রতি সরকার কর্তৃক গৃহীত দমনমূলক এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।’’ বাহিনীটি পূর্বে বিদ্রোহ দমন করতে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালিয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন। ১৯৯৯ সালের ছাত্রবিক্ষোভ, ২০১৯ সালের অস্থিরতা এবং ইরানীয় তরুণী মহসা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে দেশ জুড়ে তৈরি হওয়া বিক্ষোভ দমনের জন্যও নাকি ব্যবহার করা হয়েছিল বিশেষ এই বাহিনীকে।
অন্য দিকে ফক্স নিউজ় জানিয়েছে, ইরানে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কায় উচ্চ-নিরাপত্তা সম্পন্ন এভিন কারাগার-সহ রাজনৈতিক বন্দিদের কয়েদ করে রাখা অন্যান্য জেলে কয়েকশো নোপো সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ইরানের এই বিশেষ সশস্ত্র বাহিনী অতীতে আন্তর্জাতিক সমালোচনারও মুখোমুখি হয়েছে। ২০২১ সালে আমেরিকার ট্রেজ়ারি বিভাগ ইরানের সাধারণ নাগরিকদের ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’-এর জন্য নোপোর উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল।
ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবাকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে মনোনীত করার কয়েক দিন পর সেই নোপো বাহিনীকেই তাঁর সুরক্ষার জন্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন হওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে উপস্থিত হননি মোজতবা। সূত্রের খবর, ইজ়রায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় মোজতবা আহত হলেও ‘নিরাপদ এবং সুস্থ’ রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, চলমান সংঘাতের আবহে নিরাপত্তার কারণে একটি অত্যন্ত নিরাপদ স্থানে রয়েছেন তিনি।
তবে বৃহস্পতিবার ইরানের এক চিকিৎসকের সূত্র উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য সান’-এর দাবি, মোজতবা বর্তমানে কোমায় রয়েছেন। তিনি রাজধানী তেহরানের সিনা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মার্কিন হামলায় তিনি পা হারিয়েছেন, গুরুতর জখম হয়েছে যকৃৎ। ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মহম্মদ রেজ়া জ়াফরগজ়ানির নেতৃত্বাধীন মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করছে।
মোজতবা নতুন নেতা মনোনীত হওয়ার পরে গত ৯ মার্চ ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে তাঁকে ‘জানবাজ় অফ রমজ়ান’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। আর তার পর থেকেই খামেনেই-পুত্রের শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা ছড়ায়। কারণ, ওই শব্দবন্ধের অর্থ হল ‘এক আহত অভিজ্ঞ সেনাপতি’।