বলিপাড়ার জনপ্রিয় প্রযোজক-অভিনেতা। তবে পেশাগত জীবনের চেয়ে তিনি শিরোনামে বেশি এসেছেন ব্যক্তিগত জীবনের কারণে। বয়সে ছ’বছরের বড় নায়িকাকে বিয়ে, বিয়ের পর বহু অভিনেত্রীর সঙ্গে পরকীয়া, এমনকি প্রেমিকা-নায়িকার নাবালিকা পরিচারিকার সঙ্গেও নাকি গোপনে প্রেম করতেন আদিত্য পঞ্চোলী।
আশির দশকে টেলিভিশনের পাশাপাশি বড়পর্দায় অভিনয় করতে শুরু করেন আদিত্য। বলিপাড়ার মাটি শক্তপোক্ত করার সময়েই বয়সে বড় অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে এক ছবির সেটে বলি অভিনেত্রী জ়ারিনা ওয়াহাবের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আদিত্যের। প্রথম দেখাতেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তাঁরা।
এক সাক্ষাৎকারে জ়ারিনা জানিয়েছিলেন, ছবিতে একটি দুঃখের দৃশ্যে অভিনয় করার কথা ছিল আদিত্যের। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে সেই দৃশ্যে কান্নাকাটি করতে হত তাঁকে। কিন্তু ‘কাট’ বলার পরেও আদিত্যের কান্না থামছিল না। গাড়িতে বসে কেঁদেই চলেছিলেন আদিত্য।
জ়ারিনা বলেছিলেন, ‘‘আদিত্যের কান্না থামানো যাচ্ছিল না। আমি ওকে শান্ত করার জন্য হাতে হাত রাখি। সেই স্পর্শে যেন ম্যাজিক ছিল। আমি আর আদিত্য পরস্পরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।’’ প্রথম আলাপের ১৫-২০ দিনের মাথায় বিয়ে সেরে ফেলেন আদিত্য এবং জ়ারিনা।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ইসলাম ধর্মমতে বিয়ের সময় আদিত্য সেই ধর্ম গ্রহণ করেননি। তবে, বিয়ের প্রথাকে সম্মান জানাতে অন্য নাম গ্রহণ করে জ়ারিনাকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর এক পুত্র এবং এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন জ়ারিনা।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে যে, বিয়ের চার বছর পর জ়ারিনার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে আদিত্যের। সেই সময়ে পূজা বেদীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়ান অভিনেতা। নিয়মিত পূজার বাড়ি যেতেন তিনি। কিন্তু সম্পর্কের কথা গোপন রেখেছিলেন দু’জনেই।
অভিনেত্রীর নাবালিকা পরিচারিকা আদিত্যের বিষয়ে পূজার সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে দুই তারকার সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে আসে। এক সাক্ষাৎকারে আদিত্যের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছিলেন পূজা। আদিত্য যে নায়িকার সঙ্গে পরকীয়া করতে গিয়ে তাঁর পরিচারিকার সঙ্গেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, সে কথাও উল্লেখ করেন পূজা।
পূজার দাবি, তাঁর নাবালিকা পরিচারিকার গলায় কালশিটে লক্ষ করায় তা নিয়ে মশকরা করছিলেন নায়িকা। ‘প্রেমিকের দেওয়া ভালবাসা’ বলে মজা করছিলেন পূজা। তাঁর পরিচারিকাও হাসিমুখে সে কথা মেনে নেয়।
পরে প্রেমিকের বিষয় নিয়ে আবার আলোচনা ওঠায় পরিচারিকা দাবি করে, তার প্রেমিককে খুব ভাল করে চেনেন পূজা। কথাপ্রসঙ্গে আদিত্যের নাম আসে। পরিচারিকা তখন পূজাকে জানায়, নায়িকার অবর্তমানে নাকি তার সঙ্গে দেখা করতেন আদিত্য।
পূজা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, আদিত্যের সঙ্গে মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। সেই ফাঁকে আদিত্য যে নায়িকার পরিচারিকার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, তা টের পাননি পূজা। পূজার পরিচারিকার দাবি, আদিত্য তাঁকে অভিনয়ে সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ক্লাসের সমস্ত খরচ দিতেও নাকি রাজি ছিলেন আদিত্য।
আদিত্যের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ছিল বলেও দাবি করে পূজার নাবালিকা পরিচারিকা। সমস্ত শোনার পর আদিত্যকে সে বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন পূজা। অভিনেত্রীর দাবি, আদিত্য তাঁর কাছে সব কিছু স্বীকার করেন। তার পরেই সম্পর্কে ইতি টেনেছিলেন পূজা।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ১২ বছর পর পূজার পরিচারিকাকে শারীরিক নিগ্রহের মামলায় আদিত্যকে দোষী সাব্যস্ত করে অন্ধেরীর এক আদালত। এক বছর হাজতবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আদিত্যকে। তবে, ১২ হাজার টাকা জরিমানার বিনিময়ে আদিত্যের তাৎক্ষণিক জামিন মঞ্জুর করে দিয়েছিল আদালত। তবে এর পরেও বার বার আদিত্যকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল।
২০১৫ সালের ঘটনা। গভীর রাতে মুম্বইয়ের জুহুর একটি ক্লাবে গিয়েছিলেন মদ্যপ আদিত্য। গান নিয়ে সেই ক্লাবের ডিজের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। ক্লাবের বাউন্সাররা সেই অশান্তি থামাতে গেলে তাঁদের মারধর করতে শুরু করেছিলেন আদিত্য। এই ঘটনায় এক জন বাউন্সার জখমও হন।
আদিত্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিলেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ। ওই রাতেই আদিত্যকে আটক করেছিল মুম্বই পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পরের দিন সকালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যদিও পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
ওই বছর আরও এক বার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদিত্য। বাড়ির মালিককে হেনস্থা করার অপরাধে তাঁকে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয় বম্বে হাই কোর্ট। বাড়ির মালিককে ১৩ হাজার টাকা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। তাতে আপত্তি জানিয়েছিলেন আদিত্য।
১৯৬০ সালে জুহুর সেই বাংলো ভাড়া নিয়েছিলেন আদিত্যের বাবা। সেই সময় ভাড়া ছিল মাসিক ১৫০ টাকা। ১৯৭৭ সালে বহু মাসের ভাড়া বাকি থাকার অভিযোগে মামলা করেছিলেন বাড়ির মালিক। বম্বে হাই কোর্টের নির্দেশের পর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদিত্য। সুপ্রিম কোর্টের তরফে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তাঁকে বাংলো ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদিত্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছিলেন বলি অভিনেত্রী কঙ্গনা রনৌত। নায়িকার অভিযোগ, মাত্র ১৭ বছর বয়সে বি-টাউনে যখন প্রথম পা দিয়েছিলেন, তখন বাবার বয়সি এক ব্যক্তির কাছে শারীরিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। সেই ব্যক্তি আর কেউ নন, স্বয়ং আদিত্য পঞ্চোলী।
কঙ্গনার দাবি, আদিত্যের স্ত্রী জ়ারিনার কাছেও সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জ়ারিনা সব জেনেও কোনও রকম সাহায্য করেননি। সে কারণে বাধ্য হয়ে কঙ্গনা পুলিশের সাহায্য চেয়েছিলেন। তবে, আদিত্যকে শুধুমাত্র সতর্ক করেই নাকি ছেড়ে দিয়েছিল মুম্বই পুলিশ। পরে অবশ্য আদিত্য এবং কঙ্গনার পরকীয়া সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন জ়ারিনা।
কঙ্গনাকে নিয়ে উল্টো সুর ছিল জ়ারিনার গলায়। স্বামীর সঙ্গে কঙ্গনার পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে জ়ারিনা বলেছিলেন, ‘‘কঙ্গনা বেশ কয়েক বার আমাদের বাড়ি এসেছিল। আদিত্য সব সময় ওর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করত। হঠাৎ কী এমন হল আমি বুঝলাম না! কিন্তু এটা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, আদিত্য তেমন কিছু করেনি।” জ়ারিনার দাবি, যাঁরা তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাঁরা আসলে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারেননি। প্রতিশোধ নিতে এমন পদক্ষেপ করেন তাঁরা।
কঙ্গনার সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কথা এক সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করেছিলেন আদিত্য। ২০১৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে নবাগতা অভিনেত্রী কঙ্গনাকে সাহায্য করার জন্য আদিত্যকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর এক বন্ধু। এক বৃষ্টির দিনে কঙ্গনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আদিত্যের। তার পর কঙ্গনা নিজে থেকেই বার বার আদিত্যকে ফোন করতেন।
আদিত্য জানিয়েছিলেন, এক বন্ধুর বাড়িতে তিন বছর কঙ্গনার সঙ্গে একত্রবাস করেছিলেন তিনি। আলাদা থাকার জন্য ফ্ল্যাট কেনার চিন্তাভাবনা করছিলেন দুই তারকা। সেই উপলক্ষে কঙ্গনাকে নাকি ৫৭ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন আদিত্য। কিন্তু কঙ্গনাই নাকি সম্পর্কে থাকাকালীন ঠকিয়েছিলেন আদিত্যকে।
২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শাকালাকা বুম বুম’ ছবির শুটিংয়ের সময় কঙ্গনার সঙ্গে ছিলেন আদিত্য। তাঁর দাবি, সম্পর্কে থাকাকালীন কঙ্গনা অন্য এক অভিনেতার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় চালাচ্ছিলেন। নায়িকা যখন ঘুমোচ্ছিলেন, তখন তাঁর ফোন ঘাঁটতে গিয়ে গোপন চ্যাট দেখে ফেলেছিলেন আদিত্য।
আদিত্য সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘প্রেমপর্ব শুরুর সময় কঙ্গনা আমার সঙ্গে যে ভাবে দুষ্টুমিষ্টি চালে কথা বলত, একই ভাবে অন্য অভিনেতার সঙ্গে চ্যাট করেছিল। তা দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। রাগে-দুঃখে কঙ্গনার গায়ে হাত তুলেছিলাম আমি।’’ তখনই নাকি সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন আদিত্য।
অন্য দিকে কঙ্গনার দাবি, সম্পর্কে থাকাকালীন প্রায়শই আদিত্যের কাছে শারীরিক হেনস্থার শিকার হতেন তিনি। মাঝেমধ্যে রক্তারক্তি কাণ্ডও হয়ে যেত। আদিত্যের স্ত্রীকে সব জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি।
স্বামীর একাধিক পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে অবগত হলেও জ়ারিনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘আমার স্বামী বাড়ির বাইরে যা খুশি করুক। আমি কিছু দেখতে যাব না। এ সব নিয়ে ভাবি না আমি। যত ক্ষণ না পর্যন্ত আদিত্য বাড়ির ভিতর সে সব নিয়ে আসে। দিনের শেষে আদিত্য এক জন ভাল স্বামী, এক জন ভাল বাবা। আমি তা নিয়েই সন্তুষ্ট।’’