Rajiv Gandhi Assassination

রাজীব গান্ধী হত্যায় বোমার ব্যাটারি জোগাড় করেন, ৩১ বছর জেল খেটে হাই কোর্টের আইনজীবী হলেন সেই পেরারিভালন

পেরারিভালন যখন ২০২২ সালে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তখন তাঁর কাছে মুক্তি মানে শুধু কারাগারের বাইরে পা রাখা ছিল না। ছিল নতুন করে সব কিছু শুরু করার প্রস্তুতি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৮:০০
Share:
০১ ১৯

১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরমবুদুরে নির্বাচনী জনসভায় আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। রাজীবকে হত্যা করেছিলেন ধানু নামের এক মহিলা। লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর সদস্য ছিলেন তিনি।

০২ ১৯

নির্বাচনী জনসভায় শরীরে বোমা বেঁধে সটান প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির হন ধানু। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তীব্র বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁর দেহ। মৃত্যু হয় রাজীবেরও। শ্রীলঙ্কা থেকে নৌপথে দু’মাস আগে এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের নির্দেশে ধানু ভারতের মাদ্রাজ (এখনকার চেন্নাই) শহরে আসেন রাজীব গান্ধীকে হত্যা করার জন্য।

Advertisement
০৩ ১৯

সেই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন নলিনী শ্রীহরণ-সহ সাত জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এজি পেরারিভালনও। ৩১ বছর জেল খাটেন তিনি। মুক্তির পর রাজীব হত্যামামলার সেই আসামিই এখন হাই কোর্টের আইনজীবী।

০৪ ১৯

পেরারিভালন যখন ২০২২ সালে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তখন তাঁর কাছে মুক্তি মানে শুধু কারাগারের বাইরে পা রাখা ছিল না। ছিল নতুন করে সব কিছু শুরু করার প্রস্তুতি। রাজীব গান্ধী হত্যামামলায় দোষী সাব্যস্ত সেই পেরারিভালনের জন্য সেই নতুন শুরুটা এখন তামিলনাড়ুর আদালতে উন্মোচিত হচ্ছে।

০৫ ১৯

২০২২ সালে সাজা মকুবের মাধ্যমে মুক্তি পেয়ে বেঙ্গালুরুর বিআর অম্বেডকর ল কলেজে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন পেরারিভালন। ২০২৫ সালে সর্বভারতীয় বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইনজীবী হয়েছেন তিনি।

০৬ ১৯

যে আইনি ব্যবস্থায় পেরারিভালন তাঁর জীবনের ৩১ বছর অভিযুক্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে কাটিয়েছেন, সেই ব্যবস্থাই এখন মাদ্রাজ হাই কোর্টে আইনজীবী হিসাবে কাজ করার অধিকার দিয়েছে তাঁকে।

০৭ ১৯

বর্তমানে পেরারিভালনের বয়স ৫৪। সোমবার আইনজীবীর কালো পোশাক পরে তিনি তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরি বার অ্যাসোসিয়েশনে আইনজীবী হিসাবে নিজেকে নথিভুক্ত করেছেন।

০৮ ১৯

১৯৯১ সাল থেকে কারাগারে কাটানো বছরগুলির স্মৃতিচারণ করে পেরারিভালন জানান, তিনি অন্যায় ভাবে আটক হওয়া, বিচারে বিলম্ব হওয়া এবং বিচারাধীন আসামিদের অধিকার সম্পর্কিত মামলাগুলি নিয়ে কাজ করতে চান। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই আইনি পরামর্শে রূপান্তরিত করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন পেরারিভালন। সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে পেরারিভালন বলেন, ‘‘যে সব বন্দি আইনজীবী জোগাড় করতে পারেন না, আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়ার উপর মনোযোগ দেওয়া হবে।’’

০৯ ১৯

পেরারিভালনের নাম তালিকাভুক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাদ্রাজ হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুশ্রুত অরবিন্দ ধর্মাধিকারী। তামিলনাড়ু ও পুদুচেরি বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পিএস অমলরাজ এবং ভাইস চেয়ারম্যান এস প্রভাকরণও অংশগ্রহণ করেন সেই অনুষ্ঠানে। আইনজীবী সিকে চন্দ্রশেখর তালিকাভুক্তির প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন এবং তালিকাভুক্তি কমিটির চেয়ারম্যান কে বালু শপথবাক্য পাঠ করান।

১০ ১৯

১৯৯১ সালে সন্ত্রাসী সংগঠন এলটিটিই দ্বারা সংঘটিত রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যখন পেরারিভালনকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। অভিযোগ ছিল, যে বেল্ট বোমায় রাজীব নিহত হয়েছিলেন, তার ব্যাটারি সরবরাহ করেছিলেন তিনি।

১১ ১৯

পেরারিভালনকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। পরিবার আশাবাদী ছিল যে, সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হবে তাঁকে। ফলে পেরারিভালনের বাবা-মা নিজেরাই তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। কিন্তু মুক্তি পাননি পেরারিভালন। পরিবর্তে, তাঁকে হেফাজতে রাখে সিবিআই। এমনকি পেরারিভালনের সঙ্গে তাঁর মাকেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

১২ ১৯

প্রথম ৫৯ দিন ধরে নাকি পেরারিভালনের কোনও খোঁজই পায়নি পরিবার। আদালতে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, এই ভয়ে পরিবারটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করতে ভয় পাচ্ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, শীঘ্রই মুক্তি পেয়ে যাবে পুত্র।

১৩ ১৯

তবে মুক্তি পাননি পেরারিভালন। এক দোকানদার সাক্ষী দেন তাঁর বিরুদ্ধে। ওই দোকানদার জানিয়েছিলেন, বোমায় ব্যবহৃত ব্যাটারি পেরারিভালন তাঁর দোকান থেকেই কিনেছিলেন। সন্ত্রাসবাদী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন (টাডা)-এর অধীনে মামলা দায়ের করা হয় পেরারিভালনের বিরুদ্ধে।

১৪ ১৯

১৯৯৮ সালে টাডা আদালত রাজীব হত্যাকাণ্ডে পেরারিভালন এবং ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত অন্যদের দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত প্রাথমিক ভাবে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় বহাল রাখে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নিষ্পত্তিতে ১১ বছরের বিলম্বের কারণে ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করে।

১৫ ১৯

বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর এবং ৩১ বছর কারাবাসের পর শেষে সুপ্রিম কোর্ট ২০২২ সালের ১৮ মে সংবিধানের ১৪২ নং অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে পেরারিভালনকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেয়। এর মাঝে তিন বার প্যারোলে ছাড়া পেয়েছিলেন তিনি।

১৬ ১৯

কিন্তু জেলমুক্তির পর পেরারিভালন কী ভাবে আইনজীবী হলেন? বন্দিদশাকে তাঁর শিক্ষাগত আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা হতে দেননি পেরারিভালন। কারাগারে থাকাকালীন তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। তামিলনাড়ু মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ডিপ্লোমা কোর্সে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। এ ছাড়াও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ১,২০০-এর মধ্যে ১,০৯৬ নম্বর পেয়ে বন্দিদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

১৭ ১৯

কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকাকালীন ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন পেরারিভালন। সঙ্গে সাতটি অতিরিক্ত ডিপ্লোমা কোর্সও করেন।

১৮ ১৯

২০২২ সালে মুক্তি পাওয়ার পর পেরারিভালন ভর্তি হন বেঙ্গালুরুর বিআর অম্বেডকর ল কলেজে। আইনের ডিগ্রি হাতে পান। এর পর ২০২৫ সালে সর্বভারতীয় বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯ ১৯

তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরি বার অ্যাসোসিয়েশনে আইনজীবী হিসাবে অন্তর্ভুক্তির পর পেরারিভালন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে বলেন, “আমার ইচ্ছা এক জন নামী ফৌজদারি আইনজীবী হওয়া নয়। বরং কারাগারে বন্দি সেই হাজার হাজার কয়েদির কণ্ঠস্বর হওয়া, যাঁরা কোনও আইনি সহায়তা পান না। সে সব দরিদ্র যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তেরা মুক্তির জন্য অবিরাম অপেক্ষা করেন, কিন্তু শুধুমাত্র খরচ বহন করতে না পারার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করব আমি।”

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement