ভারতে ‘বিস্ময়’ বালক-বালিকার সংখ্যা অনেক। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ যে শুধু সময়ের আগে পড়াশোনা শেষ করেছেন তা নয়, অনেকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সাফল্য পেয়েছেন।
তেমনই এক বিরল মেধা সত্যম কুমার। মাত্র ১৩ বছর বয়সে আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সত্যম। সেই অর্থে সত্যমও ভারতের ‘বিস্ময় বালক’।
জয়েন্ট এন্ট্রান্স ভারতের কঠিন পরীক্ষাগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রতি বছর ভারতের বহু পরীক্ষার্থী জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসেন। লক্ষ্য, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি বা আইআইটিতে ভর্তি হওয়া।
পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের বেছে নেওয়া হয়। র্যাঙ্কের ভিত্তিতে তাঁরা বিভিন্ন আইআইটিতে ভর্তির সুযোগ পান। প্রতি বছর, আইআইটিতে ভর্তির জন্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া। তাঁদের মধ্যে সফল হন গুটি কয়েক।
মূলত দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার পরেই, অর্থাৎ ১৭-১৮ বছর বয়সে জয়েন্ট এন্ট্রান্স দেন দেশের অধিকাংশ পরীক্ষার্থী। কিন্তু সত্যম ছিলেন ব্যতিক্রমী। নির্দিষ্ট বয়সের আগেই আইআইটিতে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
১৯৯৯ সালের ২০ জুলাই বিহারের বক্সার জেলার বাখোরাপুর গ্রামে সত্যমের জন্ম। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা কুমার প্রথম দেশবাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করেন যখন তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে আইআইটি-জেইই পাশ করেন।
২০১২ সালে আইআইটির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৬৭০ র্যাঙ্ক করেন সত্যম। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩। আইআইটিতে ভর্তি হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় হিসাবে নজির গড়েছিলেন সত্যম।
২০১১ সালেও তিনি আইআইটি পরীক্ষায় বসেছিলেন। কিন্তু সে বছর সুযোগ পাননি। সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় হিসাবে সত্যমের পর নজির রয়েছে দিল্লির সহল কৌশিকের। সহল আইআইটিতে ভর্তি হন ১৪ বছর বয়সে।
কিন্তু এত কম বয়সে আইআইটিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া খুব সহজ ছিল না সত্যমের জন্য। বিহারের কৃষক পরিবারের সন্তান সত্যম ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছেন অভাব-অনটনের মধ্যে।
তবে সত্যমকে আটকে রাখা যায়নি। সব বাধা অতিক্রম করে আইআইটির বি টেক-এম টেক ‘ডুয়াল ডিগ্রি’ প্রোগ্রামে ভর্তি হন সত্যম। আইআইটিতে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা ল্যাব এবং ছাত্র উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।
সত্যমের লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, আইআইটি কানপুরের ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেম এবং স্লিপ ল্যাবরেটরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। যুক্ত ছিলেন রোবটিক্স ক্লাবের সঙ্গেও। জলে এবং স্থলে সমান ভাবে কাজ করবে, এমন রোবট তৈরির কাজ করেছিলেন সত্যম এবং তাঁর সহপাঠীরা।
২০১৪ সালে রোবটিক্স সংক্রান্ত একটি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন সত্যম এবং তাঁর বন্ধুরা। পরে তিনি ২০১৬ সালে ফ্রান্সে একটি গবেষণা ইন্টার্নশিপের জন্য চারপাক বৃত্তি এবং ২০১৭ সালে ভারত সরকারের একটি টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ফেলোশিপ পেয়েছিলেন।
২০১৮ সালে কানপুর আইআইটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন সত্যম। আইআইটি পাশ করার পর ২০১৯ সালে গবেষণার জন্য আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেন সত্যম। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মেশিন লার্নিং এবং ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের মধ্যে সমন্বয় সাধন। পাঁচ বছরের গবেষণা শেষে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গবেষণাপত্র জমা দেন সত্যম।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা শেষ করে ওই বছরই মাত্র ২৪ বছর বয়সে অ্যাপ্লে শিক্ষানবিশ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে যোগ দেন তিনি। শিক্ষানবিশ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে তাঁর প্রথম কর্মক্ষেত্র ছিল সুইৎজ়ারল্যান্ড।
২০২৪ সালের অক্টোবরে আমেরিকার টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসে একজন মেশিন লার্নিং সিস্টেম রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে তালিকাভুক্ত হন সত্যম। বর্তমানে মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম মেধা (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) নিয়ে কাজ করছেন তিনি। আয়ও করছেন অনেক।
বিহারের ভোজপুর এলাকার বাসিন্দা সত্যম কুমার কঠোর পরিশ্রম, অদম্য সঙ্কল্প এবং অবিচল অধ্যবসায়ের উদাহরণ। প্রচেষ্টা, গভীর প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ঠাকে প্রতিফলিত করে তাঁর পথচলা।