চিনের ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’র উপস্থাপক অধ্যাপক তিনি। ২০২৪ সালেই ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করেছিলেন, দ্বিতীয় বারের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে ফিরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। চিনের সেই শিক্ষাবিদ জুয়েকিন জিয়াং এ বার করলেন আরও পাঁচ ‘গণনা’।
বছর দু’য়েক আগে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আমেরিকা নিয়ে দু’টি পূর্বাভাসের কথা জানিয়েছিলেন জিয়াং। সেই দু’টি সত্যি বলে প্রমাণিত হওয়ার পরেই তাঁকে নিয়ে হইচই পড়ে। কেউ কেউ তাঁকে ‘চিনের নস্ত্রাদামুস’ আখ্যাও দিয়েছেন।
বেজিঙে দর্শন এবং ইতিহাসের অধ্যাপক জিয়াং। ইয়েল কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা, ঐতিহাসিক চক্র এবং ভূ-রাজনৈতিক তথ্যের বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ঘটনা বা প্রবণতার পূর্বাভাস দেওয়াই হল ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’ বা ‘ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইতিহাস’।
ইউটিউব চ্যানেলে জিয়াঙের ‘ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইতিহাস’ বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, জনসংখ্যা, সম্পদ এবং প্রযুক্তির মতো বিষয়ের বিশ্লেষণগুলি আকৃষ্ট করেছে তাঁর বহু অনুগামীকে।
তবে ট্রাম্প এবং আমেরিকা নিয়ে জিয়াঙের ভবিষ্যৎ কথন মিলে যাওয়ায় সমাজমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এল ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আরও পাঁচটি গণনা। এবং ঘটনাগুলি ঘটবে আগামী পাঁচ-দশ বা দশ-কুড়ি বছরের মধ্যে।
জিয়াঙের সেই পাঁচ ভবিষ্যদ্বাণী কী কী? চিনা শিক্ষাবিদের দাবি, আগামী ১০-২০ বছরের মধ্যে পশ্চিমি দুনিয়ায় গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার পতন হবে। পরিবর্তে উত্থান হবে স্বৈরাচারী ক্ষমতার।
‘চিনা নস্ত্রাদামুস’ আরও মন্তব্য করেছেন, পশ্চিমি দুনিয়ায় গণতন্ত্র ব্যবস্থায় অধঃপতন হলে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হবে। কাজ করার ইচ্ছাও কমবে। ফলে অর্থনৈতিক পতনও হবে।
অর্থনৈতিক পতনের কারণে অর্থসংস্থানের অভাব দেখা যাবে। সে কারণে বিভিন্ন দেশের মানুষ চাকরি এবং তুলনামূলক ভাল জীবনযাপনের জন্য অন্য দেশে যাবেন। ফলে আগামী দু’দশকের মধ্যে বিভিন্ন দেশে অনুপ্রবেশকারীদের সমস্যা বৃদ্ধি পাবে বলেও দাবি করেছেন জিয়াং।
জিয়াঙের দাবি, এই অনুপ্রবেশের সমস্যা থেকেই বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ বাধবে। একাধিক দেশের কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে ঘটতে চলা পাঁচ নম্বর এবং শেষ যে ভবিষ্যদ্বাণী জিয়াং করেছেন তা হল, বিভিন্ন দেশের মধ্যে ‘বোকা বোকা’ যুদ্ধ। জিয়াঙের দাবি, এই যুদ্ধগুলি মানুষকে শেষ করার জন্য চালানো হবে।
জিয়াঙের দাবি, তিনি যে পাঁচ অনুমান করলেন, তা ঘটবেই। তবে পর পর ঘটবে, না আগামী ২০ বছরের মধ্যে যে কোনও সময়ে ঘটবে, তা স্পষ্ট করে জানাননি তিনি।
২০২৪ সালের মে মাসে জিয়াং জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প যদি ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তা হলে ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে তিনি ইরানের সঙ্গে সম্মুখসমরে নামতে বাধ্য হবেন।
জিয়াঙের দাবি, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের সঙ্গে যে সামরিক সংঘাতের সৃষ্টি হবে তার পরিণতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেই অনুকূল হবে না। তাঁর মতে, এই সংঘাত কোনও সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাতে জড়িয়ে পড়বে পশ্চিম এশীয় দেশগুলি।
একটি রক্তক্ষয়ী ও বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত হতে পারে তেহরান-ওয়াশিংটন বিবাদ। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং স্বাভাবিক ভাবেই তা আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারকে প্রভাবিত করবে বলে দাবি জিয়াঙের।
৪১৫-৪১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঘটে যাওয়া একটি সামরিক অভিযানের উপর ভিত্তি করে ট্রাম্পের ক্ষতির বিশ্লেষণ করেছেন চিনের ‘ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা’ জিয়াং। ২০২৪ সালে যখন এই তত্ত্বটি সর্বসমক্ষে এনেছিলেন, তখন ইরানের উপর সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণকে সিসিলিয়ান অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন জিয়াং। আথেন্স বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে সিসিলিতে অভিযান শুরু করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ে পরিণত হয়। পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল আথেন্সকে।
ঠিক একই ভাবে তুলনামূলক কম শক্তিধর রাষ্ট্রের কাছে মাথা নোয়াতে হতে পারে মার্কিন ফৌজকে, এমনটাই দাবি করেছিলেন জিয়াং। তিনি বক্তৃতায় জানিয়েছিলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বেশ কিছুটা সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে থাকবে ইরান।
চিনা শিক্ষাবিদ দাবি করেছিলেন, বন্ধুর ভূখণ্ড এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার হওয়ার কারণে আমেরিকার রণকৌশলকে মাত দিতে পারেন সাবেক পারস্যভূমির রণকুশলী কমান্ডারেরা। আমেরিকার প্রাথমিক সামরিক সাফল্যকে কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত করতে পারে তেহরান, এমন সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছেন চিনা অধ্যাপক।
‘ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইতিহাস’-এর ভিডিয়োগুলি মনোযোগ আকর্ষণের পর সেগুলির ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন জিয়াং। তাঁর আশঙ্কা, তেলের পর আরব মুলুকের দেশগুলির ‘জীবনীশক্তি’তে আঘাত হানার চেষ্টা করবে ইরান। তেহরানের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে জল শোধনাগারগুলি। ইরান সরাসরি আমেরিকাকে আঘাত না করে ‘ভাতে’ মারতে চায়। আমেরিকার অর্থনৈতিক কাঠামোর স্থায়িত্বের বেশির ভাগটাই নির্ভর করে তেলের উপর। সহজ কথায় পেট্রোডলারের সঙ্গে আমেরিকার অর্থনীতি সম্পৃক্ত। আর এখানেই ওয়াশিংটনের গুমর ভাঙতে চায় তেহরান।
পেট্রোডলারকে ডলারে পরিণত করে তা বাজারে বিনিয়োগ করেই দেশের অর্থনীতির ভিত পোক্ত করে আমেরিকা। ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশের শেয়ার ব্যবস্থার ভিত নড়ে গিয়েছে। শেয়ারবাজারের সূচক অধোগতি। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষের আবহে দাম চড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রেরও। মূলত গম-সহ বিভিন্ন দানাশস্য, ভোজ্য তেল ও মাংসের দাম বাড়ার কারণেই ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব জুড়ে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
জিয়াঙের বিশ্লেষণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ড্রোন যুদ্ধের উত্থান। সস্তার ড্রোন। আর কম খরচের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই দুই হাতিয়ারে ভর করে ‘সুপার পাওয়ার’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ছে ইরান। সস্তার ইরানি অস্ত্র রুখতে মাঝেমধ্যেই হোঁচট খাচ্ছে মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটির আনুমানিক দাম ১০-৩০ লক্ষ ডলার। অন্য দিকে, মাত্র ৮-১০ লক্ষ ডলার খরচ করে এক একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে ইরান। অস্ত্রনির্মাণে খরচের এই বৈষম্যের কারণেই পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকা কিছুটা ‘ব্যাকফুটে’।
সব মিলিয়ে আমেরিকা এবং ট্রাম্পকে নিয়ে জিয়াঙের ভবিষ্যদ্বাণীর খানিকটা সত্যি হয়ে যাওয়ার পরেই তাঁকে নিয়ে নেটমাধ্যমে চর্চা শুরু হয়েছে। চিনা শিক্ষাবিদের ভিডিয়ো দেখার ধুম পড়েছে সমাজমাধ্যমে। এর মধ্যেই তাঁর আরও পাঁচটি ভবিষ্যদ্বাণীর কথা প্রকাশ্যে।