গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েক দিন ধরে সুর চড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মধ্যেই এ বার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে দক্ষিণ সীমান্ত রক্ষা করার জন্য বিশেষ ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের ইঙ্গিত আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)-র ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে নেটোকে পরীক্ষায় ফেলতে পারেন তিনি।
ট্রাম্পের নিজস্ব সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ একটি পোস্ট করে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, “হয়তো আমাদের নেটোকে পরীক্ষায় ফেলা উচিত ছিল। নেটোর ৫ নম্বর ধারা ব্যবহার করে নেটোকে এখানে এসে আমাদের দক্ষিণ সীমান্তকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আরও আক্রমণ করা থেকে রক্ষা করতে বাধ্য করা উচিত ছিল।’’
তেমনটা করলে দক্ষিণ আমেরিকার সীমান্তে টহলরত বিপুলসংখ্যক বাহিনী অন্য কাজের জন্য উপলব্ধ হতে পারবে বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। বুধবার দাভোসে ৫৬তম বার্ষিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বা ডব্লিউইএফ-এর একটি অনুষ্ঠানে আমেরিকাকে রক্ষা করার জন্য নেটোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ওই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘‘নেটোর সমস্যা হল আমরা তাদের জন্য ১০০ শতাংশ থাকব। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই যে তারা আমাদের জন্য থাকবে কি না। আমরা ওদের জন্য যত টাকা, রক্ত, ঘাম এবং অশ্রু ব্যয় করি না কেন, ওরা আমাদের জন্য থাকবে কি না আমি জানি না।’’
সেই বক্তব্যের পর আবার সমাজমাধ্যমে নেটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে নেটোকে পরীক্ষায় ফেলার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু নেটোর ৫ নম্বর ধারা কী? কী লেখা রয়েছে সেখানে?
নেটো হল আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। ১৯৪৯ সালে তৈরি হয় এই জোট। জোটে ৩২টি সদস্য দেশ রয়েছে, যা নেটো মিত্র (নেটো অ্যালায়েস) হিসেবে পরিচিত।
ক্রমাগত সোভিয়েত হুমকির বিরুদ্ধে লড়তে ইউরোপকে সম্মিলিত ভাবে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান নেটোর সেক্রেটারি জেনারেল বা মহাসচিব হলেন মার্ক রুট।
সেই নেটো-র ‘আর্টিকেল ৫’ বা ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই জোটের কোনও সদস্য রাষ্ট্রের উপর যদি অন্য কেউ আক্রমণ করে, তবে জোটের বাকি ৩১ সদস্যও সেটাকে নিজেদের উপর আক্রমণ হিসাবে দেখবে এবং তা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে।
বাস্তবে, ৫ নম্বর ধারার গুরুত্ব মার্কিন সমর্থনের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। কারণ, প্রতিরক্ষার জন্য ইউরোপ মূলত আমেরিকার উপরেই নির্ভর করে।
ইতিহাসে নেটোর ‘আর্টিকেল ৫’ ব্যবহারের নজির রয়েছে মাত্র এক বার। ২০০১ সালে আমেরিকায় ৯/১১ জঙ্গি হামলার পর নেটো প্রথম বারের মতো ৫ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জঙ্গি হামলার পর নেটোর সদস্য দেশগুলি একজোট হয়ে আফগানিস্তানে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করে। পরবর্তী দু’দশক ধরে, এই সংঘাতে ৩,৪০০ জনেরও বেশি নেটো সেনা নিহত হন। এর মধ্যে হাজারেরও বেশি আমেরিকার বাইরের সেনা ছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটোর বার্ষিক বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেয় আমেরিকা। নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ জুড়ে প্রায় ৪০,০০০ নেটো সেনা মোতায়েন রয়েছে, যার মধ্যে ‘ইউরোপীয়ান ডিটারেন্স ইনিশিয়েটিভ’ (ইডিআই)-এর মতো উদ্যোগের জন্যও অনেক সেনা কাজ করে।
কিন্তু সীমান্ত এলাকায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে কেন নেটোকে কাঠগ়ড়ায় তুলেছেন ট্রাম্প? দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানের আবহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই প্রশ্ন তুলেছেন।
দ্বিতীয় বার আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পদে বসার পর থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা শোনা গিয়েছে ট্রাম্পের মুখে। দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে এবং সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে একাধিক কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
এর পর গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে মতানৈক্যের জেরে সম্প্রতি আমেরিকা এবং ইউরোপের একাধিক দেশের মধ্যে তরজা শুরু হয়েছিল। তবে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে ব্রাসেলসে এক শীর্ষ সম্মেলন থেকে বেরিয়ে আসার সময় ইউরোপীয় নেতারা জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে ট্রাম্প সরে এসেছেন। কিন্তু তাঁরা তীব্র ভাবে সচেতন যে ফের যে কোনও মুহূর্তে আর একটি সঙ্কট দেখা দিতে পারে।
এর পর নেটো সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখল এবং ইউরোপীয় দেশগুলির উপর শুল্ক আরোপ করা নিয়ে আরও সুর চড়ান ট্রাম্প। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
কিন্তু এই সপ্তাহের শুরুতে নেটো মহাসচিব রুটের সঙ্গে উত্তর মেরুর নিরাপত্তা এবং গ্রিনল্যান্ডের উপর ‘ভবিষ্যতের চুক্তির কাঠামো’ নিয়ে আলোচনার পর আটটি ইউরোপীয় দেশের উপর শুল্ক হুমকি প্রত্যাহার করেছেন ট্রাম্প। এ-ও বলেছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা চূড়ান্ত হলে আমেরিকা এবং নেটো জোট— উভয়েই লাভবান হবে।
দাভোসে ডব্লিউইএফ-এর সভায় ভাষণ দেওয়ার সময় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ‘তাৎক্ষণিক আলোচনার’ও আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। এ-ও পরিষ্কার করেছিলেন যে, তাঁর অবস্থান নেটোর জন্য হুমকি নয়।
যে কোনও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকা-সহ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে জন্ম হওয়া নেটোকে কোনও দেশ কি নিজের স্বার্থে বা সীমান্তরক্ষার কাজে ব্যবহার করতে পারে? ট্রাম্পের দাবিতে উঠে গিয়েছে সেই প্রশ্নও।
গ্রিনল্যান্ডের উপর দাবি পুনর্ব্যক্ত করার পর হঠাৎ করে বলপ্রয়োগের বিষয়টি উড়িয়ে এবং ইউরোপের উপর শুল্ক হুমকি তুলে নতুন যে ‘শান্তি’র ইঙ্গিত ট্রাম্প দিয়েছেন, তা আসলে কোনও তীক্ষ্ণ কৌশল কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তবে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের সর্বশেষ নেটোর ৫ নম্বর ধারা প্রয়োগের উস্কানি ট্রান্সআটলান্টিক জোটের স্থায়িত্ব সম্পর্কে ইউরোপীয় উদ্বেগকে আরও গভীর করেছ। পাশাপাশি, তিনি সেই ধারা প্রয়োগ করে আমেরিকার সীমান্ত বাহিনীকে অন্য কি কাজে ব্যবহার করতে চাইছেন, তা নিয়েও চিন্তিত অনেকে।