ভোটযুদ্ধেও এ বার অবতীর্ণ কৃত্রিম মেধা! রক্তমাংসের প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছে এআই চ্যাটবটও। কলম্বিয়ার ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে দেখা যাবে ‘গাইতানা’কে। আদিবাসী সংসদীয় আসনের জন্য এআই বট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে খবর।
শারীরিক অস্তিত্ব নেই, তাও এই ডিজিটাল অবতার ভোটারদের সামনে উপস্থিত হবে ও ভোট চাইবে।
এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই হইচই পড়ে গিয়েছে বিশ্ব জুড়ে। সংবাদমাধ্যম এল কলম্বিয়ানোর প্রতিবেদন অনুসারে, গাইতানা কোনও মানব প্রার্থী নয়। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ডিজিটাল অবতার। কলম্বিয়ার ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানিয়েছে গাইতানা।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় নির্বাচন ৮ মার্চ। তার আগেই কৃত্রিম মেধাচালিত এই বট তার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। তবে সে দেশটির আইন বলছে নির্বাচনী দৌড়ে শামিল হতে গেল তাকে অবশ্যই মানুষ হতে হবে। তাই গাইতানার ভোটে লড়ার ছাড়পত্র মিলবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশ্ব রাজনীতি এবং প্রযুক্তিমহল সরগরম এই গাইতানাকে নিয়ে। গাইতানাকে যিনি রূপ দিয়েছেন, তিনি কলম্বিয়ার ক্যারিবিয়ান উপকূলের জেনু সম্প্রদায়ের সদস্য কার্লোস রেডোন্ডো। উপজাতি তরুণীর আদলে গড়ে তোলা গাইতানার গায়ের রং নীল। পরনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পালকযুক্ত পোশাক।
কলম্বিয়ায় বহু আসন আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত। কৃত্রিম মেধার বট সেই আসনগুলির একটিতে প্রার্থী হওয়ার আবেদন জমা দিয়েছে। গাইতানার প্রতিপক্ষ অবশ্য মানুষই। গণতন্ত্রের পরীক্ষায় কৃত্রিম মেধার পদার্পণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে আদিবাসীদের কণ্ঠস্বরকে আরও জোরদার করার জন্য রাজনীতির ময়দানে গাইতানাকে আনা হয়েছে বলে মত সে দেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের। গাইতানা রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রকল্পের অংশীদার কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি ‘মানবী’।
গাইতানার স্রষ্টা রেডোন্ডো এই উদ্যোগটিকে একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রকল্প হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর লক্ষ্যই হল বর্তমান রাজনীতিবিদদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করা। একই সঙ্গে তাঁদের আইন প্রণয়নের ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিগুলির তুল্যমূল্য বিচার করা।
এই এআই প্রার্থীর নাম রাখা হয়েছে কলম্বিয়ার ইতিহাসের এক কিংবদন্তি আদিবাসী নেত্রী কাসিকা গাইতানার নামানুসারে। ষোড়শ শতাব্দীতে তিনি স্প্যানিশ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই লড়াইয়ের প্রতীক হিসাবেই বর্তমান যুগে তাকে এআইয়ের অবতার হিসাবে ফিরিয়ে এনেছেন রেডোন্ডো এবং তাঁর সহযোগীরা। নির্মাতাদের দাবি, কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতেই এই উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা।
আগামী দিনে নির্বাচনে এআইয়ের ভূমিকা কী হতে চলেছে তা জানার জন্য গাইতানার জন্ম হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্মাতারা। মানুষের নীতি নির্ধারক হতে পারবে কি এআই? প্রচেষ্টাটির মূল উদ্দেশ্য এটাই। এআই বটটি যে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সেখানে সাধারণত আদিবাসী সংগঠনের সুপরিচিত হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
মাত্র তিনটি ছোট সার্ভারে কাজ করা সত্ত্বেও, বটটি ক্রমাগত সামাজমাধ্যমে তার নির্বাচনী উপকরণ সরবরাহ করে চলেছে। গাইতানার প্রচারের মূলমন্ত্র, সকলের মতামত শোনার এবং সংগঠিত করার হাতিয়ার হল ‘ডিজিটাল গণতন্ত্র’।
রেডোন্ডোর মতে, এই কৃত্রিম মেধাচালিত যন্ত্রটির নীতিমালা ১০,০০০-এরও বেশি সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীর মতামত থেকে তৈরি। যদি ২০০ পৃষ্ঠার একটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়, তা হলে গাইতানা এটিকে কয়েকটি ইনফোগ্রাফিক্সে রূপান্তর করবে মুহূর্তে। মূল তথ্যের সারসংক্ষেপ করবে। সেটিকে জেনু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে নেবে। এর পর সদস্যেরা বিলটি সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করবেন। গাইতানা উত্তরগুলিকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাগে বিভক্ত করবে। এর পর, যে পক্ষ ৫০ শতাংশের বেশি সমর্থন পাবে, তা থেকে গাইতানা স্থির করবে সংসদে সে বিলের কোন পক্ষে ভোট দেবে।
গাইতানার নির্বাচনী লড়াইয়ে যোগ দেওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে কলম্বিয়ার বিরোধী দলগুলি। কলম্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী প্রার্থী হতে হলে এক জন মানুষের জন্মগত নাগরিকত্ব প্রয়োজন। তাই গাইতানা সরাসরি ব্যালটে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ভোটের লড়াইয়ে থাকা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মতে, গাইতানা আসলে কোনও প্রার্থীই নয়।
তাঁদের অনেকেই দাবি তুলেছেন, অন্য একজন ব্যক্তি মানব প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। গাইতানা নামের কৃত্রিম মেধাচালিত অবতার ডিজিটাল প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করবে। ব্যালটে, ভোটারদের কেবল ‘আইএ’ নামটি খুঁজতে হবে, যা স্প্যানিশ ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংক্ষিপ্ত রূপ। রেডোন্ডো স্বীকার করেছেন যে, তথ্যের সুরক্ষা এবং বিভিন্ন মতামতের একত্রীকরণের মতো ক্ষেত্রগুলিতে গাইতানাকে আরও উন্নত ও পরিমার্জন করার সুযোগ রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন দখল নিচ্ছে আমাদের জীবন ও যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই, গণ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেই বা তা বাদ যায় কেন! অনেকেরই ধারণা, কৃত্রিম মেধার বাড়বা়ড়ন্ত যতই হোক না কেন প্রযুক্তির উন্নতি সত্ত্বেও কিছু কিছু কাজে মানুষের কোনও বিকল্প নেই।
ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের বা সরকার পরিচালনার রূপরেখা কি তা হলে এআই নিয়ন্ত্রিত হবে? এই আলোচনা ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে। কেউ কেউ এটিকে উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা হিসাবে প্রশংসা করছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সরাসরি ভূমিকা পালন করা উচিত কি না সেই আলোচনাতেও দ্বিধাবিভক্ত নেটাগরিকেরা।