প্রচণ্ড গতিতে কর্মক্ষেত্রের রূপ বদলে দিচ্ছে কৃত্রিম মেধা। তথ্য পরিচালনা থেকে শুরু করে গ্রাহক পরিষেবা, এমনকি বিভিন্ন সৃজনশীল কাজকেও স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। এ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগে পেশাদারি কর্মক্ষেত্রগুলি।
বিশ্ব জুড়ে পেশাদার সংস্থাগুলিতে ছাঁটাইয়ের ঢেউ। কৃত্রিম মেধা চাকরির বাজারে কোপ ফেলেছে এবং প্রচুর চাকরি কেড়ে নিচ্ছে— এই আশঙ্কায় কাঁটা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ। একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে ৫২ শতাংশ কর্মী কর্মক্ষেত্রে এআই-এর প্রভাব নিয়ে চিন্তিত।
এদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ কর্মী বিশ্বাস করেন যে অদূর ভবিষ্যতে কৃত্রিম মেধা তাঁদের চাকরির সুযোগে থাবা বসাবে। কৃত্রিম মেধার দ্রুত অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই কর্মক্ষেত্রকে নতুন করে রূপ দিতে পারে বলে আশঙ্কার বাণী শুনিয়েছেন বহু বিশেষজ্ঞ।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন আলোচনা উঠে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির প্রভাবের বাড়বাড়ন্তে একটি প্রশ্নই ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে— ভবিষ্যতে এআই কি পেশা থেকে রক্তমাংসের মানুষের ভূমিকা পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেবে?
এর আগে এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার প্রভাব বুঝতে এবং নজরদারি চালাতে একটি প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বিভিন্ন পেশা কতটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে তা নিয়ে বিশ্লেষণ চালাতে অ্যানথ্রোপিকের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বা এআই মডেল ‘ক্লড’-এর মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছিল।
অ্যানথ্রোপিকের সেই ‘ক্লড’-এর তথ্যের উপর ভিত্তি করে পেশাগত ক্ষেত্রে এআই কী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা দেখে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে এমন কয়েকটি পেশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এই এআইয়ের যুগেও যেগুলির টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোট ২২টি পেশার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সেই প্রতিবেদনে। বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, এমন ২২টি চাকরি রয়েছে যেখানে এআই-এর প্রভাব এখনও খুবই সামান্য। এআই নিয়ে ‘গেল গেল’ রব উঠলেও দৈনন্দিন কাজে এর ব্যবহার বর্তমানে কম। সুতরাং এআইয়ের কাজ করার সম্ভাবনা এবং প্রকৃত ব্যবহারের মধ্যে এখনও একটি ব্যবধান রয়েছে।
ক্লডের তথ্য বিশ্লষণ করে দেখা গিয়েছে, এআই সিস্টেমগুলি বিভিন্ন পেশায় প্রযুক্তিগত ভাবে অনেক কাজে সহায়তা করতে সক্ষম হলেও এর প্রকৃত ব্যবহার অনেক কম। কম্পিউটার ও গণিত বিভাগে, এআই টুলগুলি তাত্ত্বিক ভাবে প্রায় ৯৪ শতাংশ কাজ করতে সক্ষম দেখালেও বর্তমানে ক্লডে এর প্রকৃত ব্যবহার মাত্র ৩৩ শতাংশ।
অ্যানথ্রোপিকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অনেক কাজ দ্রুত করতে পারলেও কিছু নির্দিষ্ট পেশা রয়েছে যেখানে মানুষের ছোঁয়া অপরিহার্য। মূলত যে সব কাজে মানবিক ভূমিকা বা শারীরিক দক্ষতা এবং জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, সেই সমস্ত পেশা এআইয়ের আগ্রাসী প্রভাব থেকে তুলনামূলক ভাবে সুরক্ষিত।
অ্যানথ্রোপিকের তথ্য বলছে, এআই দ্বারা কম প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেই সমস্ত পেশার মধ্যে আছেন চিকিৎসক, সেবিকা, বিচারক, বিমানচালক, সৃজনশীল শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, লেখক, অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক এবং কৃষক। এঁদের ভূমিকাকে এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা কঠিন। এ ছা়ড়াও রয়েছেন রাঁধুনি, গাড়ি সারাই কর্মী, আপৎকালীন জীবনরক্ষাকারী কর্মী, পানশালার কর্মী ও ব্যক্তিগত সহকারীর মতো ভূমিকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দখল করতে পারবে না।
কৃষিবিশারদ, মনোরোগবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, অপরাধের বিচার, শিক্ষকতা, মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা, গল্প-উপন্যাস-কবিতা লেখার মতো ক্ষেত্রে বাড়বে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা। এই সমস্ত ক্ষেত্রে মানবিক চাহিদা থাকায় এআই থাবা বসাতে পারবে না বলে তথ্যযাচাইয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত নানা পদে হাতেকলমে দক্ষতা অপরিহার্য। যেমন শল্যচিকিৎসকের মতো পেশায় অস্ত্রোপচারের সময় অত্যন্ত সূক্ষ্ম শারীরিক ত্রুটি নিরাময় এবং তাৎক্ষণিক জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়া কৃত্রিম মেধার পক্ষে অসম্ভব। একই কথা প্রযোজ্য সেবিকাদের ক্ষেত্রে। রোগীদের সেবার পাশাপাশি মানসিক সমর্থন ও সহানুভূতি দেওয়ার মতো মানবিক কাজ করতে পারবে না এআই।
আবার মানুষের গভীর এবং জটিল মানসিক সমস্যাগুলো বুঝতে মানুষেরই প্রয়োজন। তাই মনস্তত্ত্ববিদের পেশা সুরক্ষিত। ক্লডের তথ্য বলছে, অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং স্পর্শকাতর অস্ত্রোপচার চালাতে পেশাদার দন্তচিকিৎসকদের জায়গা দখল করতে পারবে না কৃত্রিম মেধা। এ ছাড়াও ফিজিয়োথেরাপিস্টদের পেশাও এই ঝুঁকির মধ্যে নেই।
কারিগরি ও দক্ষ শ্রমিকের চাকরি কাড়তে পারবে না এআই। বৈদ্যুতিক কর্মী, কলের মিস্ত্রি, নির্মাণ ব্যবস্থাপক, গাড়ি সারাই কর্মীদের চাকরি কাড়তে পারবে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই ধরনের কাজে হাতেকলমে দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। কৃত্রিম মেধার সাহায্যে কাজের সেই শর্তপূরণ করা সম্ভবপর না-ও হতে পারে। তাই এই পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষদের এখনই কোনও শঙ্কার কারণ নেই।
পারিবারিক বা সামাজিক সঙ্কট মোকাবিলা, যেখানে সহমর্মিতা ও মানবিক সম্পর্কের প্রয়োজন, সেখানে কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না কৃত্রিম মেধা। তাই সমাজকর্মীদের চাহিদা কমবে না। তেমনই কমবে না শিশুদের আচরণগত শিক্ষা এবং মানসিক বিকাশে সাহায্য করেন যে সব শিক্ষক বা শিক্ষিকা তাঁদের চাহিদা। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্বতন্ত্র প্রয়োজন বোঝা ও যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়বে মানুষের।
ফরেন্সিক বিজ্ঞানী, আর্থিক বিশেষজ্ঞ, ভূতাত্ত্বিক প্রযুক্তিবিদ থেকে শুরু করে শিল্পক্ষেত্রে হিসাবরক্ষকের চাকরি— সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব ক্রমশ বাড়বে। কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার ব্যবহার হবে সীমিত।
গবেষণা অনুসারে, অনেক পেশায় এমন সব কাজ জড়িত থাকে যে সমস্ত কাজের জন্য শারীরিক পরিশ্রম, বাস্তব জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বা দায়িত্বের প্রয়োজন হয়। সেই কাজ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের পক্ষে সহজে সামলানো সম্ভব নয়। কৃষিকাজের মধ্যে গাছ ছাঁটাই বা খামারের যন্ত্রপাতি চালানোর মতো কাজগুলি এআই সিস্টেমগুলো করতে পারে না। আবার আদালতে মক্কেলদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো আইনি কাজও বর্তমান এআই মডেল বা সিস্টেমের আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এআই এখনও তার কাজের সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। তবে, ভবিষ্যতে এআই-এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে এমন চাকরিগুলিতে কর্মজীবনের অগ্রগতি মন্থর হয়ে যেতে পারে। মার্কিন সরকারি সংস্থা ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের অনুমান অনুযায়ী, ২০৩৪ সাল পর্যন্ত এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার থাকবে এমন চাকরিগুলিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার সামান্য কমে যেতে পারে।