পশ্চিম এশিয়ায় চলছে যুদ্ধ। হরমুজ়ে অবরোধের জেরে জ্বালানি সঙ্কট। এর মাঝেই সুরাপ্রেমীদের জন্য দুঃখের খবর। এই গরমে ঠান্ডা বিয়ারে চুমুক দিয়ে গলা ভেজাতে হলে খসবে অতিরিক্ত কড়ি। কারণ ইরান-মার্কিন উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে সুরায়। যুদ্ধের আঁচ পড়তে চলেছে মদের বাজারে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে বাণিজ্যিক গ্যাস অমিল। আর তার জেরে সরাসরি ভারতে দাম বাড়তে চলেছে বিয়ারের। কারণ বোতল ও ক্যান তৈরির কাঁচামালের সঙ্কট। সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটার কারণে জ্বালানির দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর জেরে এক ধাক্কায় বাড়তে পারে বিয়ারের দাম, যা সুরাপ্রেমীদের কাছে নিঃসন্দেহে দুঃসংবাদ।
শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা হেইনকেন, অ্যানহাইজার-বুশ ইনবেভ এবং কার্লসবার্গের মতো সমস্ত ব্র্যান্ডের বিয়ারের দামবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। ‘ব্রিউয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’ সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, কাচের বোতলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। কাগজের কার্টনের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেবেল ও টেপের মতো অন্যান্য প্যাকেজিং উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি।
‘ব্রিউয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’ (যাতে হেইনকেন ও কার্লসবার্গের মতো বড় সংস্থাগুলি রয়েছে) ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্য সরকারের কাছে বিয়ারের দাম ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। কারণ বিয়ার-সহ অন্যান্য অ্যালকোহলজাত পানীয়ের দাম বাড়া বা কমার সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের কাঁধেই ন্যস্ত।
ভারতে গ্রীষ্মকালে বিয়ারের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। ঠিক এই সময়েই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিয়ার প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি এই বাড়তি খরচের বোঝা ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। বর্তমানে পরিস্থিতি যে ভাবে এগোচ্ছে, তাতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিয়ারের দামে বড় ধরনের বদল আসতে পারে।
ইরান-আমেরিকার উত্তেজনার ফলে হরমুজ় দিয়ে বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। ওই সঙ্কীর্ণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান। এর ফলে কাতার থেকে ভারতে এলএনজি আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ভারতে কাচের বোতল তৈরির কারখানাগুলির জ্বালানির প্রধান উৎস হল এই লিকুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস।
আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি নিয়ে সঙ্কট দেখা গিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাসঘাঁটি এবং একটি প্রধান এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) কেন্দ্রে হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে
প্যাকেজিংয়ের কাঁচামাল জোগান দিতে এলএনজি অপরিহার্য। চুল্লি জ্বালানোর গ্যাসে ঘাটতির কারণে বেশ কিছু কাচের বোতল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান সরবরাহকারীরা সম্ভাব্য ঘাটতির বিষয়ে সতর্ক করেছে বিয়ার প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে।
কাচের বোতলের সঙ্কটের কারণে অনেক সংস্থাই এখন ক্যানের দিকে বেশি ঝুঁকছে। যাঁরা ক্যানড বিয়ার বেশি পছন্দ করেন, তাঁদের পকেটে চাপ আরও বাড়তে পারে। কারণ অ্যালুমিনিয়ামের দাম বাড়ায় ক্যানড বিয়ারের দাম বোতলের তুলনায় বেশি বাড়ার আশঙ্কা করছেন এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক দেশ ভারত। প্রাকৃতিক জ্বালানির চাহিদা পূরণের জন্য নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে কাতার থেকে। কাতারের অন্যতম বড় গ্যাসঘাঁটি রাস লাফানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে তেহরান। কাতার তো বটেই, এটি প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশ্বের অন্যতম বড় ঘাঁটি। ইরানি হামলার কারণে কাতারের রফতানি আংশিক ভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলত যত দিন এগোচ্ছে ভারতে গ্যাসের সরবরাহ তলানিতে এসে ঠেকছে।
উত্তরপ্রদেশের কাচশিল্প কেন্দ্র বলে পরিচিত ফিরোজ়াবাদের একটি কাচের বোতল প্রস্তুতকারক সংস্থার সিইও সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে তিনি কারখানায় উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁর গ্রাহকদের মধ্যে মদের সংস্থার পাশাপাশি ফলের রস ও কেচাপের বোতল প্রস্তুতকারকেরাও রয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই উৎপাদন কমানো এবং দাম ১৭-১৮ শতাংশ বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে ভারতের ৫০০ কোটি ডলারের বোতলের জলের বাজার ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাস্টিকের বোতল ও ঢাকনার দাম বাড়ার ফলে কিছু উৎপাদক ১১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে।
‘গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের মদের বাজার ছিল ৭৮০ কোটি ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবসা বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির ফলে সে গুড়ে বালি। মদশিল্পে বড় ধাক্কা দিতে চলেছে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত, এমনটাই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ভারতে বিভিন্ন পণ্য এবং পরিষেবার উপর জিএসটি রয়েছে। একমাত্র মদ এবং পেট্রোলিয়াম এর আওতায় পড়ে না। সে কারণে দেশের এক এক রাজ্যে মদের উপর শুল্কের হার এক এক রকম। অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে মদ সস্তা। গোটা দেশের মধ্যে গোয়ায় পানীয়ের দাম সবচেয়ে কম। এই রাজ্যে পানীয়ের উপর কর সবচেয়ে কম। আবার গোয়ায় যতটা সস্তা, কর্নাটকে ততটাই দামি মদ।
ব্রিউয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, যে সব রাজ্য দাম বাড়ানোর অনুমতি দেবে না, সেখানে তারা বিয়ার সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে মহারাষ্ট্র, কর্নাটক বা গোয়ার মতো রাজ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও অন্যান্য রাজ্যে বিয়ারের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত নতুন কাচের বোতল ব্যবহার করে। যেহেতু ব্রিউয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ১২ থেকে ১৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, তাই বহুলপ্রচলিত ব্র্যান্ডগুলির ৬৫০ মিলি বোতলের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সুরাপ্রেমীরা।