Balochistan Crisis

৫৮ জায়গায় ৭৮ হামলা, ‘সিঁদুরের’ দগদগে ঘায়ে পেরেকের খোঁচা! পাক সেনার ঘুম কেড়েছে ‘হেরফ ২.০’

ভারতীয় ফৌজের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সুযোগ নিয়ে ‘অপারেশন হেরফ ২.০’ শুরু করেছে ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ বা বিএলএ। বালোচিস্তানের স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণের ঝাঁজ বৃদ্ধি করছেন তাঁরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৫ ০৭:৫৬
Share:
০১ ১৯

‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতের হাতে মার খাওয়ার পর ঘরের মাটিতে আরও বিপদে পাকিস্তান। দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালোচিস্তানে তীব্র হচ্ছে স্বাধীনতার দাবি। সেই সঙ্গে অবস্থার সুযোগ নিয়ে ইসলামাবাদের বাহিনীর উপর আক্রমণের ঝাঁজ বাড়িয়েছে ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ)। গত কয়েক দিনে ৫৮টি জায়গায় ৭৮টি হামলার দাবি করেছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী।

০২ ১৯

বিএলএর দাবি, স্বাধীনতার জন্য ‘অপারেশন হেরফ ২.০’ চালাচ্ছেন তাঁরা। এর জন্য বেছে বেছে বালোচিস্তানের কয়েকটি জেলাকে নিশানা করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, আক্রমণের তীব্রতা বাড়াতে স্থানীয় বিদ্রোহীদের সমন্বয় বজায় রেখে হামলা করা হচ্ছে। এতে পাক ফৌজের জওয়ান ও অফিসারদের নিকেশ করতে সুবিধা হচ্ছে তাঁদের। এ হেন গেরিলা যুদ্ধের একাধিক ভিডিয়োও প্রকাশ করেছে বিএলএ।

Advertisement
০৩ ১৯

‘অপারেশন হেরফ ২.০’ নিয়ে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির মুখপাত্র জিয়ান্দ বালোচ। তাঁর কথায়, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরেই বালোচিস্তানকে দখল করে রেখেছে পাক ফৌজ। এ বার পরাধীনতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় চলে এসেছে। সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অভিযানগুলি পরিচালনা করা হচ্ছে।’’ ইসলামাবাদ সেখান থেকে বাহিনী না সরালে আক্রমণ যে আরও তীব্র হবে, তা স্পষ্ট করেছেন তিনি।

০৪ ১৯

গত ১০ মে বালোচিস্তানের খুজদার জেলার ওরনাচ ক্রস এলাকায় জাতীয় সড়কের দখল নেয় বিএলএ। ওই সময়ে গাড়ি-ট্রাক আটকে রেখে তল্লাশি চালান বিদ্রোহীরা। বালোচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ বহনকারী গাড়িগুলিকে আটক করেন তাঁরা। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ওই দিনই ‘যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয় ভারত ও পাকিস্তান। অন্য দিকে, জাতীয় সড়কের দখল নিয়ে ১৩ মে প্রেস বিবৃতি জারি করে বিএলএ।

০৫ ১৯

খুজ়দারে সাফল্য পাওয়ার পর বালোচ বিদ্রোহীরা যে থেমে ছিলেন, এমনটা নয়। ১১ মে রাতে পাঞ্জগুরের নোকাবাদে অতর্কিতে হামলা করে পাক সেনাবাহিনীর একটি পোস্ট দখলের চেষ্টা করেন তাঁরা। বিএলএর মুখপাত্র জিয়ান্দা জানিয়েছেন, ‘‘দখলদার ফৌজের উপর রকেট লঞ্চার এবং গ্রেনেড দিয়ে আক্রমণ শানানো হয়েছে। এতে কমপক্ষে দু’জন নিহত এবং পাঁচ জন আহত হয়েছেন।’’ টানা ২৫ মিনিট ধরে গুলিবর্ষণ করায় ওই পাক পোস্টের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।

০৬ ১৯

এ ছাড়া পারুম জৈন এবং কালাদের গারাপ এলাকায় জোরালো হামলা চালায় বিএলএ। পারুমে পাক সেনাবাহিনীর নজরদারি ক্যামেরাকে ধ্বংস করা হয়। কালাদে আইইডি বিস্ফোরণে ইসলামাবাদের বেশ কয়েক জন সৈনিকের মৃত্যু হয়। বালোচিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হল এই কালাদ। পাকিস্তানের জন্মের আগে বেশ কয়েক বছর এলাকাটি ছিল ওই প্রদেশটির রাজধানী।

০৭ ১৯

বালোচিস্তানের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির রয়েছে নিজস্ব গুপ্তচর বাহিনী। বিশ্লেষকদের দাবি, সেই কারণে তাঁদের কব্জা করতে হিমসিম খাচ্ছেন রাওয়ালপিন্ডির ফৌজি অফিসারেরা। এ ব্যাপারে পাক গুপ্তচর সংস্থা ‘ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স’ বা আইএসআইকেও টেক্কা দিয়েছে বিএলএর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। বালোচিস্তানে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে প্রাণ দিয়েছেন ইসলামাবাদের চার এজেন্ট।

০৮ ১৯

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইএসআইয়ের এজেন্টদের চিহ্নিত করার পর বিএলএ প্রথমে তাঁদের তুলে নিয়ে যায়। পরে নোশকির গালাঙ্গর এলাকায় ওই চার জনের গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন পাকপত্তন এলাকার বাসিন্দা গোলাম মুস্তাফা, মহম্মদ লতিফ এবং রহিম ইয়ার খানের বাসিন্দা ইমরান আলির ছেলে মকসুদ আহমদ এবং ইরফান আলির ছেলে মকসুদ আহমদ।

০৯ ১৯

বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির তরফে জারি করা বিবৃতি অনুযায়ী, আহমদওয়াল এলাকার একটি চেক পয়েন্ট থেকে ওই চার জনকে অপহরণ করেন তাঁরা। এর পর গুপ্তঘাঁটিতে নিয়ে গিয়ে চলে জেরা। সেখানে গুপ্তচরবৃত্তির কথা স্বীকার করে নেন তাঁরা। পুরো ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ার পরই তাঁদের ‘চরম শাস্তি’ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে বালোচ লিবারেশন আর্মি।

১০ ১৯

পাশাপাশি, কাচির মাথ্রির সেনা পোস্ট এবং সিবির রেলস্টেশনে হামলাকেও ‘অপারেশন হেরফ ২.০’-এর অংশ বলে জানিয়েছে বালোচ বিদ্রোহীরা। এর মধ্যে রেলস্টেশনে তাঁদের ছোড়া গ্রেনেডে বেশ কয়েক জন সৈনিকের মৃত্যু হয়। কাচির পোস্টে অভিযানে প্রাণ হারান পাক ফৌজের অন্তত তিন জন জওয়ান। যদিও ইসলামাবাদের তরফে এই নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

১১ ১৯

‘অপারেশন সিঁদুর’কে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত বাধলে খোলাখুলি ভাবে নয়াদিল্লিকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করে বালোচদের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ইসলামাবাদ থেকে পৃথক হওয়ার জন্য কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের সমর্থন চান তাঁরা। ইরান এবং আফগানিস্তান লাগোয়া প্রদেশটিতে আমজনতাকে ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতেও দেখা গিয়েছে।

১২ ১৯

এই পরিস্থিতিতে আবার মার্কিন সার্চ ইঞ্জিন গুগ্‌লে বালোচিস্তানের স্বাধীনতা বা বালোচ লিবারেশন নিয়ে খোঁজাখুঁজি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সূত্রের খবর, সমাজমাধ্যমে ‘স্বাধীন বালোচিস্তান’-এর একটি মানচিত্রও ছড়িয়ে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। মানচিত্রটিতে পাক বালোচিস্তান প্রদেশ ছাড়াও ইরান এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়েছে।

১৩ ১৯

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বালোচ বিদ্রোহী বা আন্দোলনকারীরা তিনটি দেশ ভেঙে স্বাধীন হতে চাইলে ভারতের পক্ষে তাঁদের সরাসরি সমর্থন করা বেশ কঠিন হবে। কারণ, ইসলামাবাদের উপর চাপ বজায় রাখতে ইরান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে কখনওই সম্পর্ক খারাপ করার রাস্তায় হাঁটবে না নয়াদিল্লি।

১৪ ১৯

তবে ইসলামাবাদ থেকে বালোচিস্তানের আলাদা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মোটেই সহজ নয়। কারণ, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া এই প্রদেশটির একাধিক গুপ্তঘাঁটিতে পাক ফৌজ পরমাণু হাতিয়ার সাজিয়ে রেখেছে বলে মনে করেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। ফলে কোনও অবস্থাতেই একে হাতছাড়া করতে চাইবেন না রাওয়ালপিন্ডির সেনা অফিসারেরা।

১৫ ১৯

অন্য দিকে, বালোচিস্তানের সঙ্গে বেজিঙের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। কারণ পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে ‘চিন পাকিস্তান অর্থনৈতিক বারান্দা’র (চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর বা সিপিইসি) কাজ চালাচ্ছে ড্রাগন সরকার। এর জন্য কয়েক কোটি ডলার লগ্নি করেছে চিন। সংশ্লিষ্ট রাস্তাটির বড় অংশ বালোচিস্তানের মধ্য দিয়ে গ্বদর বন্দরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

১৬ ১৯

এই অবস্থায় প্রদেশটি পাকিস্তানের থেকে আলাদা হয়ে গেলে চিনের বিনিয়োগ করা কয়েক কোটি ডলার যে জলে যাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তা ছাড়া আর্থিক দিক থেকে ভারতকে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে বেজিং। সেই কারণে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনও ইসলামাবাদকে কখনও প্রকাশ্যে কখনও আবার আড়াল থেকে সমর্থন করে গিয়েছে শি জিনপিং সরকার।

১৭ ১৯

‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং তার পরবর্তী সময়ে চলা ‘যুদ্ধে’ ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভান্ডারে চিড় ধরেছে বলে সমাজমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে। এর থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমগুলির একাংশ। এই অবস্থায় ইসলামাবাদের হাতে আণবিক অস্ত্র থাকা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ।

১৮ ১৯

পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পাঁচ দিনের মাথায় (পড়ুন ১৫ মে) জম্মু-কাশ্মীরে যান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ। শ্রীনগরে চিনার কোরের অফিসার ও জওয়ানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। পরে বলেন, ‘‘বিশ্বের কাছে আমার প্রশ্ন, এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং দুর্বৃত্তপরায়ণ দেশের হাতে পরমাণু অস্ত্র কি নিরাপদ?” ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির নজরদারির দাবিও তোলেন তিনি।

১৯ ১৯

তবে লক্ষ্য যতই কঠিন হোক না কেন, বালোচিস্তানের স্বাধীনতা পেতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালানোর অঙ্গীকার নিয়েছে বিএলএ। গত ১২ মে থেকে পরিকল্পিত ভাবে ‘অপারেশন হেরফ ২.০’কে পরিচালনা করছেন তাঁরা। এখনও পর্যন্ত তাঁদের হামলায় শতাধিক পাক সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিএলএর সঙ্গে ‘যুদ্ধ’-এ আরও ফালা ফালা হতে পারে রক্তাক্ত পাকিস্তান, মত বিশ্লেষকদের।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement