আমেরিকা-ইজ়রায়েল-ইরানের মধ্যে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কারণে দেশে রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) জোগানে টান পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উৎপাদন বৃদ্ধি, বুকিং পদ্ধতির বদলের পরে এ বার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গৃহস্থালিতে রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র।
কেন্দ্রের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। গ্যাস বুক করার দুই থেকে আড়াই দিনের মধ্যেই সিলিন্ডার পাওয়া যাবে। ফলে অযথা ‘প্যানিক বুকিং’ করার কারণ নেই। ভয় পেয়ে বাড়তি সিলিন্ডার বুক করারও প্রয়োজন নেই।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তরফে বুধবার সাংবাদিক বৈঠক করেন মন্ত্রকের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা। তিনি জানান, সঙ্কট আঁচ করে বাড়তি গ্যাস যাতে কেউ বুক করে না রাখেন, তা নিশ্চিত করতে দু’টি গ্যাস বুকিংয়ের মধ্যেকার ন্যূনতম ব্যবধান ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। তবে সরকারের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। খনিজ তেলের সরবরাহও নিয়ন্ত্রণে। ভারতে ঘরোয়া এলপিজি উৎপাদন ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ঘরোয়া নয়, এমন এলপিজি (নন-ডোমেস্টিক)-র ক্ষেত্রে হাসপাতাল এবং অন্য জরুরি পরিষেবাগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি নিয়ে যে উদ্বেগের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ভয় পেয়ে অনেকে আগেভাগে গ্যাস বুক করে রাখছেন। এই ‘প্যানিক বুকিং’ মূলত ভুল তথ্যের কারণে হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সুজাতা। তবে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি গ্যাসের অপচয় বন্ধ করার আর্জিও জানিয়েছেন।
খনিজ তেল, স্বাভাবিক গ্যাসের জোগানের উপর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কী প্রভাব পড়েছে, দেশের জোগান কতটা, তার হিসাবও দিয়েছে কেন্দ্র। সুজাতার কথায়, ‘‘খনিজ তেলের জোগান আমাদের নিয়ন্ত্রণে। দেশে তেলের দৈনন্দিন খরচ প্রায় ৫৫ লক্ষ ব্যারেল। অন্তত ৪০টি দেশ থেকে খনিজ তেল আমদানি করি আমরা। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যে তেল আসে, তা ব্যাহত হয়েছে। তবে ৭০ শতাংশ জোগানই আসছে অন্য রাস্তা দিয়ে। আর কিছু দিনের মধ্যে তেলবোঝাই আরও দু’টি জাহাজ আসছে। ফলে জোগান বাড়বে।’’
অন্য দিকে, এলপিজি-র মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ ভারত আমদানি করে। তার ৯০ শতাংশ আবার আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। গ্যাসের ক্ষেত্রে ভারতের মোট খরচ দৈনন্দিন ১৮.৯ কোটি মেট্রিক আদর্শ ঘনমিটার (এমএসসিএমডি)।
তার মধ্যে ৯.৭৫ কোটি এমএসসিএমডি গ্যাস ঘরোয়া ভাবে উৎপাদন করা হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। সরকার জানিয়েছে, ৪.৭৪ কোটি এমএসসিএমডি-র জোগান পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কটের কারণে প্রভাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিকল্প রুটে জোগান বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।
সুজাতা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি-র দাম যে পরিমাণ বেড়েছে, সেই অনুপাতে দেশে বাড়েনি। তা ছাড়া অনেক পড়শি দেশের চেয়েও ভারতে এলপিজি-র দাম কম। সুজাতা বলেন, ‘‘গ্যাসের জোগানের চক্রে কোনও পরিবর্তন হয়নি। বুকিং করলে আড়াই দিনের মধ্যেই গ্যাস পাওয়া যাবে। আগে থেকে সিলিন্ডার বুক করার কোনও প্রয়োজন নেই। এটা একটা সঙ্কটময় পরিস্থিতি। কিন্তু ভারতে জোগান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছে। নাগরিকদের কাছে আমাদের অনুরোধ, ভয় পেয়ে বুকিং করবেন না, যেখানে সম্ভব গ্যাস সংরক্ষণ করুন।’’
সব মিলিয়ে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানালেও সত্যিই কি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে? জ্বালানি গ্যাসের জোগান ব্যাহত হওয়ায় কোন রাজ্যে কী পরিস্থিতি? দেখে নেওয়া যাক এক নজরে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাসের পর্যাপ্ত জোগানের অভাবে বিয়ের মরসুমে পঞ্জাবে বহু বিয়ে বাতিল হয়ে গিয়েছে। গ্যাস না পেয়ে ইতিমধ্যেই বন্ধ একাধিক কেটারিং পরিষেবা। রাজধানীতে রান্নার গ্যাসের অভাবে নাজেহাল দিল্লি হাই কোর্টের ক্যান্টিনগুলি। এলপিজি পৌঁছোনো বন্ধ হওয়ায় ক্যান্টিনগুলিতে কেবল ঠান্ডা খাবার পাওয়া যাচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশের অবস্থাও তথৈবচ। গোরক্ষপুরে গ্যাসের গুদামের বাইরে লম্বা লাইন লক্ষ করা যাচ্ছে কয়েক দিন ধরে। রান্নার গ্যাস পেতে সাধারণ মানুষ হাতাহাতিতেও জড়িয়েছেন। বিহারেও গ্যাসের জোগান কমেছে। উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
গ্যাস না পাওয়ায় অসমে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেও সুর চড়িয়েছেন সে রাজ্যের আমজনতা। পর্যটনের জন্য সারা বছর ভিড় লেগে থাকে ওড়িশায়। গমগম করে হোটেল-রেস্তরাঁগুলি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের অভাবে ইতিমধ্যেই ওড়িশার বহু হোটেল-রেস্তরাঁয় ইনডাকশনে রান্না চলছে। খাদ্যতালিকাতেও কাটছাঁট করা হয়েছে। আবার গ্যাস পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় ছত্তীসগঢ়ে অনেক রেস্তরাঁ, রাস্তার ধারের ছোট দোকান, চায়ের দোকান, ক্লাউড কিচেনের কার্যক্রম প্রায় বন্ধের মুখে।
জ্বালানির অভাব চিন্তা বাড়িয়েছে দক্ষিণ ভারতেরও। অন্ধপ্রদেশের তিরুপতিতে বাণিজ্যিক গ্যাসের জোগান বন্ধ হয়েছে ইতিমধ্যেই। ক্ষতির মুখে পড়েছে একাধিক ব্যবসা। তামিলানাড়ুর অনেক হোটেল-রেস্তরাঁ বন্ধের মুখে। অনেকে দোকান খুলছেন না। অনেক ব্যবসায়ী আবার দোকান খুলে রাখছেন কম সময়ের জন্য।
কর্নাটকে পড়ুয়া এবং চাকরিজীবীদের আবাসনগুলিতেও প্রভাব পড়েছে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায়। বিভিন্ন আবাসনে কেবল দু’বেলা খাবার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যে খাবারগুলি বানাতে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগে, সেগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে খাদ্যতালিকা থেকে। অনেকে আবার বৈদ্যুতিন কুকারে খাবার তৈরির পন্থা অবলম্বন করেছেন। কেরলে আগামী তিন দিনের মধ্যে অনেক হোটেল-রেস্তরাঁ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মহারাষ্ট্রেরও রান্নার গ্যাসের সমস্যা প্রকট রূপ ধারণ করছে। মুম্বইয়ে প্রায় ১০ হাজার ক্যাফে-রেস্তরাঁর ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে প্রায় ৪ লক্ষ কর্মীর জীবনে। অন্য দিকে, গুজরাতে অনেক রেস্তরাঁ তাদের পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্য রাজ্যগুলির মতো রান্নার গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। বিগত কয়েক দিন গ্যাসের বুকিং বেড়েছে ২০০ শতাংশ। তবে অন্য বড় শহরগুলির তুলনায় কলকাতার অবস্থা ভাল। এখনও প্রায় সমস্ত হোটেল-রেস্তরাঁ খোলা রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি একই থাকলে শীঘ্রই ব্যবসা সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে পারেন অনেক ব্যবসায়ী। রাজ্যে হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ এবং মিড-ডে মিলের জন্য গ্যাসের জোগান অব্যাহত রয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুধবার তেলসংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের ন্যূনতম জোগান বজায় রাখার আবেদন করেছেন।
৭ মার্চ থেকে কলকাতায় ১৪.২ কেজির গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৯৩৯ টাকা। হোটেল-রেস্তরাঁয় রান্নার ১৯ কেজির বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১১৪.৫০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৯৯০ টাকা।
এলপিজি-র মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ ভারত আমদানি করে। তার ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। গত ৮ মার্চ সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। তাতে দেশের অভ্যন্তরে এলপিজি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, এর ফলে ২৫ শতাংশ উৎপাদন বেড়েছে। রেস্তরাঁ, হোটেলের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করা হয়েছে।