সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে হিন্দি চলচ্চিত্রজগতে নায়কদের পাশাপাশি খলনায়কদেরও স্বর্ণযুগ ছিল। গব্বর সিংহ থেকে শুরু করে মোগ্যাম্বো— বড়পর্দার খলচরিত্রেরা দর্শকমনে ভীতি সঞ্চার করত সহজেই। প্রাণ, ড্যানি ডেনজ়ংপা, শক্তি কপূর, প্রেম চোপড়া, আমজ়াদ খানের মতো অভিনেতারা তারকা হয়ে উঠেছিলেন খলনায়ক হিসাবেই। তবে, উপার্জনের দিক থেকে সকলকে টেক্কা দিয়ে ফেলেছেন অমরীশ পুরী।
কেদারার হাতলে আঙুল নাচিয়ে ‘মোগ্যাম্বো খুশ হুয়া’ দৃশ্যটি সিনেমাপ্রেমীদের মনে গেঁথে রয়েছে। নিজের নামের পাশাপাশি ‘মোগ্যাম্বো’ তকমাও পেয়ে গিয়েছিলেন অভিনেতা। সেই সময় সর্বোচ্চ উপার্জনকারী খলনায়কদের তালিকায় অমরীশ ছিলেন শীর্ষে।
১৯৩২ সালের জুনে পঞ্জাবে জন্ম অমরীশের। বাবা-মা, দুই দাদা, এক দিদি এবং ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি। অমরীশের দুই দাদা চমন এবং মদন পুরী দু’জনেই বলিউডে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন খলনায়ক হিসেবে। দুই দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অমরীশও অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।
একরাশ স্বপ্ন নিয়ে পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় পঞ্জাব ছেড়ে অমরীশ পৌঁছেছিলেন মুম্বইয়ে। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করা সহজ ছিল না। ‘স্ক্রিন টেস্টে’ অনুত্তীর্ণ হন তিনি। ছবিনির্মাতারা জানিয়েছিলেন, রুক্ষ্ম চেহারা এবং কর্কশ কণ্ঠস্বরের জন্য অমরীশ কোনও দিন অভিনেতা হতে পারবেন না। অভিনয়ের সুযোগের প্রতীক্ষায় বসে না থেকে মুম্বইয়ে চাকরির খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন অমরীশ।
বহু খোঁজাখুঁজির পর একটি সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন অমরীশ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘এমপ্লয়িজ স্টেট ইনসিওরেন্স কর্পোরেশন’-এ চাকরি শুরু করেছিলেন তিনি। চাকরি করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল হবু জীবনসঙ্গিনীর।
বিমার অফিসে ঊর্মিলা দিভেকেরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল অমরীশের। কর্মী-গ্রাহকের কেজো সম্পর্ক থেকে তাঁদের আলাপ গড়িয়েছিল বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত। কিন্তু সম্পর্ক পরিণতি পাওয়ার পথে ছিল বাধা। তাঁদের সম্পর্কের কথা জানাজানি হতেই দুই পরিবারে আপত্তি উঠেছিল।
কিন্তু অমরীশ এবং ঊর্মিলা দু’জনেই ছিলেন একরোখা স্বভাবের। বিয়ে যে করবেন, সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা। বিয়ের জন্য পরিজনদের সম্মতিও আদায় করে ছেড়েছিলেন দু’জনে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৭ সালে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা।
নতুন সংসার পাতলেও অর্থাভাবে দিন কাটছিল অমরীশ এবং ঊর্মিলার। অমরীশের সামান্য বেতনে সংসারের খরচ বহন করা সম্ভব হত না। সংসারের হাল ধরতে চাকরি শুরু করেছিলেন ঊর্মিলাও। স্বামীর অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নপূরণের জন্য জীবনসঙ্গিনীর পাশাপাশি সহযোদ্ধাও হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
অমরীশ যেন অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়তে পারেন সে জন্য সংসারের প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময় অফিসে কাজ করে উপার্জন করতে শুরু করেছিলেন ঊর্মিলা। রোজগারের দিক থেকে নিশ্চিন্ত হওয়ার পর অমরীশ পৃথ্বী থিয়েটারে অভিনয় করতে শুরু করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মঞ্চজগতেও পরিচিত হয়ে উঠছিলেন।
প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব সত্যদেব দুবের অধীনে তিনি কাজ শিখতে শুরু করেছিলেন। থিয়েটার করার সময় তিনি তাঁর ভরাট কণ্ঠস্বরকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সত্তরের দশকে বিজ্ঞাপনে কাজ করতে করতেই বড়পর্দায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন অমরীশ। ৩৮ বছর বয়সে অভিনেতা হিসাবে কেরিয়ার গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
সত্তরের দশকে মূল খলনায়কের সহকারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অমরীশ। জনপ্রিয়তা পেতে আরও এক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাঁকে। তার পর থেকে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বলিউডের এক ও অদ্বিতীয় খলনায়ক। মূল খলনায়ক হিসাবে তিনি প্রথম নজর কাড়েন ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হম পাঁচ’ ছবিতে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে অমরীশই ছিলেন বলিউডের জনপ্রিয়তম খলনায়ক। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর জিতে নিয়েছিল দর্শকের মন।
‘মিস্টার ইন্ডিয়া’, ‘বিধাতা’, ‘মেরি জঙ্গ’, ‘ত্রিদেব’, ‘ঘায়েল’, ‘দামিনী’, ‘কর্ণ অর্জুন’, ‘নায়ক’-এর মতো একাধিক হিন্দি ছবিতে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেছিলেন অমরীশ। অন্য দিকে, ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’, ‘চাচি ৪২০’, ‘ফুল অউর কাঁটে’, ‘গরদিশ’, ‘পরদেশ’, ‘বীরাসত’, ‘ঘাতক’, ‘মুঝে কুছ কহেনা হ্যায়’, ‘চায়না গেট’-এর মতো ছবিতে ইতিবাচক ও আবেগপ্রবণ চরিত্রে অভিনয় করেও নজর কেড়েছিলেন তিনি।
হিন্দি ছবির পাশাপাশি হলিউডেও কাজ করেছিলেন অমরীশ। রিচার্ড অ্যাটেনবোরোর ‘গান্ধী’ এবং স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য টেম্পল অব ডুম’ ছবিগুলিতে অভিনয় অমরীশের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছিল। অমরীশের অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন স্পিলবার্গ।
‘ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য টেম্পল অব ডুম’-এর জন্য মাথা মুড়িয়ে ফেলেছিলেন অমরীশ। পরে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’। চুলবিহীন মাথায় নিজের লুক নিয়ে পরে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন তিনি।
সত্তরের দশক থেকে অভিনয় করে কেরিয়ারের ঝুলিতে সাড়ে চারশোরও বেশি ছবি ভরে ফেলেছিলেন অমরীশ। সেই সময় খলনায়কদের মধ্যে সর্বোচ্চ উপার্জনকারী ছিলেন তিনি। কোনও কোনও ছবিতে অভিনয়ের সময় তিনি নাকি নায়কদের চেয়েও বেশি পারিশ্রমিক ধার্য করতেন বলে শোনা যায়।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, কেরিয়ারে সাফল্যের স্বাদ পেলেও খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন অমরীশ। তাঁর কোনও ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন না। অধিকাংশ সময় বাসেই যাতায়াত করতেন। কখনও কখনও আবার গাড়ি চালিয়ে সেটে পৌঁছে যেতেন। কোনও চালক রাখতেন না তিনি।
অমরীশের এই সাধারণ জীবনযাপন দেখে কেউ প্রশ্ন তুললে তিনি মজা করে বলতেন, ‘‘উপার্জন করছি নিজের জন্য। যদি আমার জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কর্মী রাখতে হয়, তা হলে নিজের জন্য কী খরচ করব আর টাকা জমাবই বা কী করে?’’
২০০৪ সালে মাইলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম নামের দুরারোগ্য ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন অমরীশ। ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য তাঁর একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ৭২ বছর বয়সে মারা যান অভিনেতা।