UK Military

মান্ধাতা আমলের হাতিয়ার, প্রায় শূন্য গোলাবারুদ! ‘দুর্বল’ ফৌজ নিয়ে আতঙ্কে ২০০ বছর ভারত শাসন করা ইংরেজ

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সঙ্গে তীব্র হচ্ছে পশ্চিম ইউরোপের সংঘাত। এ-হেন পরিস্থিতিতে ইংরেজ ফৌজকে নিয়ে সংসদীয় কমিটির কাছে বিস্ফোরক তথ্য দিলেন ব্রিটিশ সিডিএস এয়ার চিফ মার্শাল রিচার্ড জন নাইটন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৯
Share:
০১ ১৮

এক দিকে রুশ আক্রমণের আতঙ্ক। অন্য দিকে গ্রিনল্যান্ড কব্জা করতে চেয়ে পারদ চড়াচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ-হেন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ ফৌজকে নিয়ে বোমা ফাটালেন সেখানকার ‘চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ’ (সিডিএস) এয়ার চিফ মার্শাল রিচার্ড জন নাইটন। জোড়া বিশ্বযুদ্ধ জেতা পরমাণু শক্তিধর ইংরেজরা বর্তমানে কোনও পূর্ণাঙ্গ লড়াইয়ের জন্য তৈরি নয় বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ওই মন্তব্যের পর ইউরোপ তথা দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।

০২ ১৮

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনড় মনোভাব দেখানোয় হঠাৎ করেই ইউরোপের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে জটিলতা। ডেনমার্কের মালিকানাধীনে থাকা পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপটির নিরাপত্তায় এগিয়ে এসেছে ফ্রান্স ও জার্মানি। সুর চড়িয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারও। এ-হেন পরিস্থিতিতে ইংরেজ সিডিএসের ফৌজি শক্তি নিয়ে সতর্কবার্তায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের কপালের ভাঁজ যে চওড়া হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। তবে কি এ বছর প্রতিরক্ষা খরচ বাড়াবে লন্ডন? আটলান্টিকের দ্বীপরাষ্ট্রে উঠেছে সেই প্রশ্নও।

Advertisement
০৩ ১৮

পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপটিকে দখল করতে যখন-তখন ট্রাম্প সামরিক অভিযান চালাতে পারেন বলে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে রয়েছে চাপা আতঙ্ক। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন আগ্রাসনের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে বাঁচাতে সেখানে সৈন্য পাঠিয়েছে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড। সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে কমান্ডার পদমর্যাদার একজন আধিকারিক পাঠিয়েছে ব্রিটেন। তিনি দেশ ছাড়ার পর সামগ্রিক ভাবে ফৌজের শক্তি সংসদীয় কমিটির সামনে তুলে ধরেন সিডিএস নাইটন, যা শুনে চোখ কপালে উঠেছে স্টার্মার প্রশাসনের।

০৪ ১৮

বিবিসি, দ্য টাইমস ও দ্য সান পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দুর্বলতার কারণ সংসদীয় কমিটির সামনে ব্যাখ্যা করেছেন এয়ার চিফ মার্শাল নাইটন। এর মূলে আছে প্রতিরক্ষা বাজেটের ঘাটতি। যদিও প্রকাশ্যে এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি। সূত্রের খবর, আগামী চার বছরে সামরিক খাতে অতিরিক্ত ২,৮০০ কোটি পাউন্ড ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট খরচ করুক, চাইছেন নাইটন। সেই লক্ষ্যে স্টার্মার সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক পুরোদমে কাজ শুরু করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে ওই সমস্ত ব্রিটিশ গণমাধ্যম।

০৫ ১৮

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রতিরক্ষার খাতে ব্যয়বৃদ্ধির পরিকল্পনা করে স্টার্মার সরকার। যদিও নানা কারণে তা বাস্তবের মুখ দেখেনি। তবে ওই সময় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতায় থাকায় লেবার পার্টির নেতা-মন্ত্রীদের ২০২৭ সালের মধ্যে ‘মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন’ বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) ২.৩ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত সামরিক খাতে খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিতে শোনা গিয়েছিল। এর তিন মাসের মাথায় সংসদীয় কমিটিতে সিডিএসের ডাক পড়াকে তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

০৬ ১৮

গত বছরের ডিসেম্বরে বড়দিনের আগে স্টার্মারের সঙ্গে দেখা করে দীর্ঘ বৈঠক করেন নাইটন। সূত্রের খবর, সেখানেই বাজেট ঘাটতির কথা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি, সেনাবাহিনীকে মজবুত করতে কী কী পদক্ষেপের প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা হয় তাঁদের। সংসদীয় কমিটির কাছে যার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন ইংরেজ সিডিএস। বলেছেন, ‘‘ফৌজকে শক্তিশালী করতে মন্ত্রীদের অনেক আপস ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তবে জাতীয় স্বার্থে সেটা অত্যন্ত জরুরি।’’

০৭ ১৮

সংসদীয় কমিটিকে নাইটন জানিয়েছেন, বর্তমানে যে জায়গায় ব্রিটিশ ফৌজ দাঁড়িয়ে আছে, বাজেট বৃদ্ধি হলেও সেখান থেকে রাতারাতি তাদের টেনে তোলা বেশ কঠিন। বাহিনীকে শক্তিশালী করতে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। তাঁর কথায়, ‘‘জিডিপির ২.৩-২.৫ শতাংশ সামরিক খাতে বরাদ্দ হলে বছরে অতিরিক্ত ৬০০ কোটি পাউন্ড খরচ করতে হবে সরকারকে।’’ ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৩.৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে আটলান্টিকের এই দ্বীপরাষ্ট্র।

০৮ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরেই বাজেট ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ২০২৩ সালে অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ১,৬৯০ কোটি পাউন্ড খরচ করার সিদ্ধান্ত নেয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। কিন্তু, ঠিক তার পরের বছরই ইংলিশ চ্যানেলের পারের দ্বীপরাষ্ট্রটির পার্লামেন্টের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি জানিয়ে দেয় সামরিক খাতে ২,৯০০ কোটি পাউন্ড বাজেট ঘাটতিতে চলছে সরকার।

০৯ ১৮

সেনাবাহিনীর দুরবস্থার কথা বলতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন ব্রিটিশ সিডিএস। সংসদীয় কমিটিকে তিনি জানান, দিন দিন ফৌজে সৈনিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এখনও বহু ক্ষেত্রে মান্ধাতা আমলের হাতিয়ার ব্যবহার করতে হচ্ছে তাঁদের। দূরপাল্লার ক্রুজ় বা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন যে বিশাল সংখ্যায় বাহিনীর বহরে রয়েছে এমনটা নয়। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে নৌসেনার শক্তিও বেশ কমেছে।

১০ ১৮

গত শতাব্দীর দু’টি বিশ্বযুদ্ধেই ব্রিটিশ নৌবাহিনী ছিল অপ্রতিরোধ্য। ফলে লড়াই চলাকালীন তাদের উপর ভর করেই ‘খেলা ঘুরিয়ে’ দিতে সক্ষম হন তৎকালীন ইংরেজ কমান্ডারেরা। কিন্তু নাইটনের দাবি, বর্তমানে সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ব্রিটিশ নৌসেনা। তাদের কাছে নেই কোনও ডুবো (আন্ডারওয়াটার) ড্রোন। তা ছাড়া বহরে থাকা ডুবোজাহাজের মধ্যে বেশ কয়েকটি বুড়ো হয়েছে। ফলে তাদের নিয়ে লম্বা দূরত্ব পাড়ি দিয়ে শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করা বেশ কঠিন।

১১ ১৮

তৃতীয়ত, সমরাস্ত্র তৈরির ব্যাপারে ইংরেজদের বিদেশি নির্ভরশীলতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময় থেকেই হাতিয়ার সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যয়বরাদ্দ ধীরে ধীরে কমাতে থাকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। পাশাপাশি, রোবটিক্স ও কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির অস্ত্র তাদের হাতে প্রায় নেই বললেই চলে। তা ছাড়া দ্বীপরাষ্ট্রটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) বেশ নড়বড়ে।

১২ ১৮

সংসদীয় কমিটির কাছে সেনাবাহিনীর সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে আরও কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন নাইটন। তাঁর কথায়, আধুনিক লড়াইয়ে সামরিক কৃত্রিম উপগ্রহ এবং সাইবার সুরক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে লন্ডনের চেয়ে কয়েক গুণ এগিয়ে আছে চিন ও রাশিয়া। আর তাই সরকারকে সে দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

১৩ ১৮

এ ছাড়া সর্বাত্মক যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথাও নাইটনকে বলতে শোনা গিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘সংঘাত পরিস্থিতিতে রেল ও প্রতিরক্ষার পরিকাঠামোকে সবার আগে নিশানা করতে পারে শত্রুপক্ষ। সেই আক্রমণ ঠেকানোর জন্য আরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’’ তা ছাড়া লড়াইয়ের সময় আহত সৈনিকদের চিকিৎসার সুব্যবস্থার কোনও সামগ্রিক পরিকল্পনা এখনও করা যায়নি বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।

১৪ ১৮

ব্রিটিশ সামরিক ব্যবস্থার এ-হেন দুর্বলতার কথা নাইটন প্রথম বললেন, এমনটা নয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ ব্যাপারে ৭৩ পাতার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সের প্রতিরক্ষা কমিটি। এর গোড়াতেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীকে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

১৫ ১৮

ওই রিপোর্টে সৈনিক থেকে গোলাবারুদের ঘাটতির প্রতিটি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেন হাউস অফ কমন্সের প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্যেরা। সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে মূলত দু’টি জায়গায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা। সেগুলি হল, ধারাবাহিক ভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে ফৌজ। ফলে সৈনিকদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যথেষ্ট দ্বিধায় রয়েছে তারা।

১৬ ১৮

এই অবস্থায় সরকারের কী কী করণীয়, সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে তারও উল্লেখ করেছিল ওই কমিটি। তাতে বলা হয়, ‘‘যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি সামরিক অভিযানের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে অর্থসাহায্য করতে হবে। বাহিনীর বাজে খরচ কমানোর দিকে নজর দিক সরকার। পাশাপাশি, হাতিয়ারের গবেষণা ও উন্নয়ন (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট) খুবই জরুরি।’’

১৭ ১৮

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে প্রমাদ গোনে ব্রিটিশ সরকার। পূর্ব ইউরোপের ওই সংঘাতে খোলাখুলি ভাবে কিভের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে তারা। গত চার বছরে বিপুল পরিমাণে হাতিয়ার ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জ়েলেনস্কির হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেনি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। ফলে অনেকটাই ফুরিয়ে গিয়েছে ইংরেজদের গোলাবারুদের ভান্ডার। দু’বছরের মাথায় এই ইস্যুতেও সরকারকে সতর্ক করে প্রতিরক্ষা কমিটির রিপোর্ট।

১৮ ১৮

যদিও কঠিন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বার বার ঘুরে দাঁড়ানোর লম্বা ইতিহাস রয়েছে ব্রিটিশদের। উদাহরণ হিসাবে খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের নেতৃত্বে ক্রুসেড জয়, ১৫৮৮ সালে স্পেনীয় নৌবহর আর্মাডাকে ডুবিয়ে দেওয়া, কিংবদন্তি ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টকে হারানো এবং দুই বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের নাস্তানাবুদ করে ফেলার কথা বলা যেতে পারে। কত দ্রুত ইংরেজরা তাঁদের বাহিনীকে আগের মতো দুর্ধর্ষ করে তুলতে পারে, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement