মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অদ্ভুত রণকৌশল নিয়েছে ইরান। লড়াইয়ের গোড়াতেই হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। ফলে বিশ্ব জুড়ে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি-সঙ্কট। যদিও সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ‘খেলা ঘোরাচ্ছে’ বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ, কাস্পিয়ান সাগর। এর মাধ্যমে অনায়াসেই রুশ অত্যাধুনিক হাতিয়ার আমদানি করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।
ইরানি মালভূমির উত্তরে অবস্থিত কাস্পিয়ান সাগরের কৌশলগত অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর এক দিকে রয়েছে ককেশাস পর্বতমালা। অপর অংশটি মধ্য এশিয়ার ‘স্তেপ’ বা তৃণভূমি নামে পরিচিত। ইরানকে নিয়ে দুনিয়ার সর্ববৃহৎ এই হ্রদকে ঘিরে আছে মোট পাঁচটি দেশ। সেগুলি হল রাশিয়া, আজ়ারবাইজান, কাজ়াখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান। এই ‘পঞ্চশক্তি’র নজর এড়িয়ে আর কারও সেখানে পণ্যবাহী জাহাজ চালানোর অনুমতি নেই।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই ইহুদি-মার্কিন জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস দেখাচ্ছে ইরান। কারণ, তেহরান খুব ভাল করেই জানে লড়াইয়ে অস্ত্রের ভান্ডার ফুরিয়ে গেলে ‘বন্ধু’ রাশিয়ার কাছে হাত পাততে হবে তাকে। মস্কো তাতে রাজি হলে হাতিয়ারের ‘সাপ্লাই লাইন’ হয়ে উঠবে কাস্পিয়ান সাগর। গত চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে ইতিমধ্যেই এর আঁচ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি বিশ্ব।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে মস্কোর ফৌজ ইউক্রেন আক্রমণ করলে পূর্ব ইউরোপে বেধে যায় যুদ্ধ। এই সংঘর্ষের শুরুর দিন থেকে কিভকে হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহ করে যাচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটো। ৩২ দেশের সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটির এ-হেন সমর্থন পাওয়ায় ক্রেমলিনের অগ্রগতি অনেকটাই ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির বাহিনী।
ইউক্রেন যুদ্ধের এক বছরের মাথায় (পড়ুন ২০২৩ সাল) হাতিয়ার ও গোলা-বারুদের সঙ্কটে ভুগতে থাকে রাশিয়া। ফলে রণাঙ্গনের কমান্ডার এবং সাধারণ ফৌজিদের মধ্যে তীব্র হচ্ছিল ক্ষোভ। ঠিক তখনই ক্রেমলিনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় শয়তান’ হিসাবে দেখা ইরান। তড়িঘড়ি মস্কোকে অস্ত্র সরবরাহের নির্দেশ দেন তেহরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। আর তখনই কাস্পিয়ান সাগরের ‘আসল গুরুত্ব’ অনুভব করে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রুশ সেনার হাতে মোট তিন লক্ষ কামানের গোলা তুলে (আর্টিলারি শেল) দেয় ইরান। এ ছাড়া একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য বিভিন্ন ধরনের কয়েক লক্ষ গুলি (অ্যামিউনিশন) মস্কো পাঠায় তেহরান। তালিকায় ছিল শাহেদ-১৩৬ কামিকাজে (আত্মঘাতী) এবং মোহাজ়ের-৬ ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী ড্রোন। এর মধ্যে আবার প্রথমটির নকশায় সামান্য বদল এনে রাতারাতি তার উন্নত সংস্করণ বানিয়ে ফেলে ক্রেমলিন। নাম দেয় ‘জেরান-২’।
পশ্চিমি সংবাদসংস্থাগুলির দাবি, কাস্পিয়ান সাগর বেয়েই ওই সময় যাবতীয় হাতিয়ার পৌঁছোয় মস্কোয়। ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটারের লবণাক্ত জলের হ্রদটি পেরোনোর সময় অবশ্য জাহাজের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রাখত তেহরান। ফলে কবে কখন অস্ত্রবোঝাই জলযান রুশ বন্দরে ভিড়ছে, তা বুঝতেই পারেনি কেউ। বর্তমানে ঠিক এর উল্টো ঘটনা ঘটছে বলেই সন্দেহ যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর বিভাগের।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে ইরানের মোট চারটি বন্দর রয়েছে। সেগুলি হল বন্দর-ই-আনজ়ালি, আমিরাবাদ, নৌশাহর এবং কাস্পিয়ান বন্দর। উল্টো দিকে সংশ্লিষ্ট হ্রদটিকে ঘিরে মোট তিনটি বন্দর তৈরি করেছে রাশিয়া। এগুলির নাম মাখাচকালা, আস্ত্রাখান এবং ওলিয়া। এর মধ্যে কোন দু’টি হাতিয়ার সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দুই দেশ ব্যবহার করেছে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
২০১৬ সালে রাশিয়ার থেকে এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা হাতে পায় ইরানের আইআরজিসি। কাস্পিয়ান সাগর দিয়েই সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি তেহরানে পাঠিয়েছিল মস্কো। যদিও ওই সময় অস্ত্র আমদানি-রফতানির স্বাভাবিক রুট হিসাবে বিশ্বের বৃহত্তম লবণাক্ত জলের হ্রদটি আত্মপ্রকাশ করেনি। কিন্তু, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছে সেই ছবি।
গত বছর রাশিয়ার সঙ্গে ৫০ কোটি ইউরোর অস্ত্র চুক্তি করে ইরান। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, মস্কোর থেকে যুদ্ধবিমান বা হেলিকপ্টার ধ্বংসকারী ৫০০ ভেরবাস ক্ষেপণাস্ত্র, ২,৫০০ মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে ভূমি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫০০ রাতচশমা (নাইট ভিশন গগল্স) পাবে আইআরজিসি। এ ছাড়া ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো আত্মঘাতী জ়েরান-২ ড্রোনও পারস্য দেশে পাঠাতে পারেন ‘বন্ধু’ প্রেসিডেন্ট পুতিন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক প্রায়ই সেখানে হামলা চালাচ্ছে মার্কিন এবং ইহুদি বিমানবাহিনী। ফলে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক রাস্তায় হাতিয়ার সরবরাহ হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে একাধিক পর্যায়ে ওই সমস্ত অস্ত্র কাস্পিয়ান সাগরের রাস্তাতেই আইআরজিসির ছাউনিগুলিতে মস্কো পাঠাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। আর তাই ওই হ্রদের তীরবর্তী তেহরানের বন্দরে বোমাবর্ষণও করে ইজ়রায়েলি বায়ুসেনা। যদিও তাতে হাতিয়ার আসা বন্ধ হয়নি।
চলতি বছরের ৫ এপ্রিল সৌদি আরবে মার্কিন গুপ্তচর বাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএ-র দফতরে হামলা চালায় তেহরান। রিয়াধের আমেরিকান দূতাবাসের মধ্যেকার ওই ভবনে এক মিনিটের ব্যবধানে পরপর দু’টি ড্রোন আছড়ে পড়ে। এর জেরে সিআইএ-র ওই ভবনে আগুন ধরে যায়। যদিও এতে কারও মৃত্যু হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়।
মার্কিন প্রশাসনের এক আধিকারিককে উদ্ধৃত করে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, ইরানি আক্রমণে মার্কিন দূতাবাসের একাংশ ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা সেখানকার সিআইএ দফতরে কী ভাবে ড্রোন হামলা চালানো হল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অন্য দিকে আক্রমণের ঝাঁজ আরও বাড়ানো হবে বলে ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তেহরান।
গত ২ এপ্রিল ইরানের কারাজে সে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘতম সেতু বি ১-এ বোমাবর্ষণ করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। ফলে উড়ে যায় তার একাংশ। এর পরই সেতুতে হামলার ভিডিয়ো প্রকাশ করে তেহরানকে হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেন, এখনও সময় আছে। না হলে এর থেকেও আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। আগামিদিনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে আক্রমণের কথাও বলতে শোনা যায় তাঁকে।
যদিও ট্রাম্পের হুঙ্কারের সামনে মাথা নোয়াতে রাজি নয় আইআরজিসি। পাল্টা পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আরব ‘বন্ধু’ দেশগুলির আটটি সেতু উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা। তেহরানের সেই ‘হিটলিস্টে’ আছে কুয়েতের শেখ জাবের আল-আহমেদ আল-সাবা সমুদ্রসেতু, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির শেখ জায়েদ, আল মাকতা এবং শেখ খলিফা সেতু। এ ছাড়াও বাহরিনের কিং ফাহদ কজ়ওয়ে (সৌদি এবং বাহরিনের সংযোগকারী সেতু), জর্ডনের কিং হুসেন, দামিয়া এবং আবদুন সেতু।
তবে মুখে সেতু উড়িয়ে দেওয়ার কথা বললেও নিখুঁত নিশানায় সেখানে হামলা চালানোর সক্ষমতা কতটা ইরানের রয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে এ ব্যাপারে পুতিনের সাহায্য লাগতে পারে আইআরজিসির। কাস্পিয়ানের রাস্তায় মস্কো থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র চলে এলে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ যে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।
এপ্রিলের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক লড়াকু জেটকে গুলি করে নামাচ্ছে ইরান। এর মধ্যে অন্যতম হল আমেরিকার এফ-১৫ ইগল এবং এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান। লড়াইয়ের গোড়ার দিকে তেহরানের এই সক্ষমতা দেখা যায়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এর নেপথ্যে আছে রুশ হাতিয়ার, যা আসছে কাস্পিয়ান সাগর দিয়েই।
পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের উপর চাপ বাড়াতে হরমুজ়ের পাশাপাশি লোহিত সাগর সংলগ্ন বাব-এল মান্দেব প্রণালীটিও বন্ধ করার ছক কষছে ইরান। এ ব্যাপারে তাদের হয়ে ইতিমধ্যেই আসরে নেমেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এই পরিস্থিতিতে কাস্পিয়ানের ‘লাইফলাইনে’ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।