China in US-Iran War

পাকিস্তানের ‘কাঁধে বন্দুক’ রেখে গুটি গুটি রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব, মার্কিন-ইরান যুদ্ধ থামাতে ‘জামিনদার’ হবে চিন?

ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। যদিও প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনায় উঠে আসছে চিনের নাম। ওয়াশিংটনের জন্য সেটা কতটা স্বস্তিজনক? উঠছে প্রশ্ন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১:২২
Share:
০১ ১৮

পেরিয়ে গিয়েছে এক মাস। তার পরেও থামার নাম নিচ্ছে না ইরান যুদ্ধ। অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট সংঘাত নিয়ে প্রায় প্রতি দিনই নিত্যনতুন বিবৃতি দিয়ে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বাড়াচ্ছে জটিলতা। এই আবহে পর্দার আড়ালে থেকে কি আসল কলকাঠি নাড়ছে চিন? মধ্যস্থতায় নজিরবিহীন ভাবে বেজিঙের নাম উঠে আসতেই তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।

০২ ১৮

চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই চিনসফর করেন পাক উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশক দার। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বেজিঙের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই-র সঙ্গে কথা হয় তাঁর। পরে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে যৌথ বিবৃতি দেয় দুই দেশ। সেখানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির উপর জোর দিয়েছে পাকিস্তান ও চিন। বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

Advertisement
০৩ ১৮

ইসলামাবাদের দাবি, দার ও ওয়াং ই-র মধ্যে কয়েক ঘণ্টা আলোচনার পর একটি ব্যাপারে নাকি সম্মত হয়েছে চিন। সেটা হল, পশ্চিম এশিয়ায় যুযুধান পক্ষগুলি অবিলম্বে আলোচনায় বসুক, চাইছে বেজিং। যদিও ড্রাগন সরকার তাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তা হলে কি ইরান যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবেন মান্দারিনভাষীরাও? না কি বেজিঙের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে পশ্চিমের প্রতিবেশী? উঠছে প্রশ্ন।

০৪ ১৮

পাকিস্তানের সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা সিএনএন জানিয়েছে, ইশক দারের চিনসফরের জেরে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির জামিনদার হিসাবে থাকতে প্রস্তুত বেজিং। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশরের সঙ্গে একটি চতুর্মুখী বৈঠকে বসবে ইসলামাবাদ। সেখানে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওই বৈঠকের আগে চিনা দূতাবাসে গিয়ে কথা বলেন পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি।

০৫ ১৮

যদিও সরকারি ভাবে এ ব্যাপারে মুখ খুলছে না কোনও পক্ষই। এ প্রসঙ্গে পাক বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেছেন, ‘‘সংশ্লিষ্ট আলোচনাগুলি সংবেদনশীল এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ফলে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখনই এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’’ অন্য দিকে চিনের বক্তব্য, ‘‘আমরা ইসলামাবাদ এবং অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতাকে সমর্থন করি। শান্তিপ্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে বেজিং সব সময়ই সমন্বয় বজায় রাখতে ইচ্ছুক।’’

০৬ ১৮

ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ অবশ্য মনে করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে নিজেকে জামিনদার হিসাবে তুলে ধরে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে বেজিং। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রমুখী বিশ্বের সামনে নিজেকে বিকল্প হিসাবে তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত, এতে আমেরিকাকে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টিকারী দেশ হিসাবে প্রচার করার সুযোগ পাওয়া। পাশাপাশি বেজিং থাকবে শান্তির প্রতীক হয়ে।

০৭ ১৮

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর সিনিয়র ফেলো টং ঝাও। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় দেশগুলিতে দীর্ঘ দিন ধরেই ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে আমেরিকা। সেখানে রয়েছে তাঁদের একাধিক বড় বড় সামরিক ছাউনি। তা ছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলির অর্থনীতি পুরোপুরি ভাবে খনিজ তেলের উপর নির্ভরশীল, বিশ্ববাজারে যা বিক্রি হয় ডলারে। ইরান যুদ্ধে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিতে জামিনদার থাকলে ওই এলাকায় পা রাখার সুযোগ পাবে বেজিং।’’

০৮ ১৮

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেকে শান্তিস্থাপনকারী হিসাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটাই চিনের প্রথম প্রচেষ্টা নয়। ২০২৩ সালের ১০ মার্চ বেজিঙের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করে ইরান ও সৌদি আরব। ফলে দুই উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে কেটে যায় সাত বছরের কূটনৈতিক অচলাবস্থা। ধীরে ধীরে দূতাবাস খোলার ব্যাপারেও রাজি হয় তেহরান এবং রিয়াধ। এ ছাড়া গত বছর (২০২৫ সাল) তাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘাত চলাকালীন আলোচনার আয়োজন করে মান্দারিনভাষী শি জিনপিঙের সরকার।

০৯ ১৮

এ ছাড়া পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতেও উদ্যোগী হয়েছে চিন। সূত্রের খবর, ড্রাগনভূমির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উরুমকি শহরে কাবুল এবং ইসলামাবাদের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা। ২০২১ সালের অগস্টে দ্বিতীয় বারের জন্য হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে ক্ষমতায় আসে তালিবান। তার পর থেকেই বার বার তাদের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়েছে পাক ফৌজ। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা যুদ্ধের রূপ নেয়। ফলে তলানিতে ঠেকেছে দু’তরফের কূটনৈতিক সম্পর্ক।

১০ ১৮

তবে পশ্চিম এশিয়ার হিসাব একেবারেই সহজ নয়। কারণ, ইরান সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে পাকিস্তানকে মেনে নিয়েছে তেহরান এবং ওয়াশিংটন। কিন্তু, শান্তিপ্রতিষ্ঠায় জামিনদার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ চিনকে স্বীকার করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। তা ছাড়া লড়াইয়ে আমেরিকার অন্যতম সহযোগী হল ইজ়রায়েল। মার্কিন ফৌজ সরে গেলেও লড়াই থামবে না বলে ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তেল আভিভ।

১১ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ১৯৯২ সালে ইজ়রায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয় চিন। তবে তার বহু আগে থেকে প্যালেস্টাইনকে মান্যতা দিয়ে এসেছে বেজিং। বর্তমানে এই সমস্যা সমাধানে ‘দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্বে’ (টু স্টেট সলিউশন্‌স) জোর দিচ্ছেন মান্দারিনভাষীরা। তাতে প্রবল আপত্তি আছে আরব দেশগুলির। অন্য দিকে ইহুদি দেশটিকে কোনও দিনই স্বীকৃতি দেয়নি পাকিস্তান। ধর্মীয় কারণেই তেল আভিভকে ‘কট্টর দুশমন’ মনে করে ইসলামাবাদ।

১২ ১৮

পশ্চিম এশিয়ার আরব মুলুকগুলিতে বড় বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে লম্বা সময় ধরে স্বস্তিতে রয়েছে ইজ়রায়েল। সেখানে চিনা ‘অনুপ্রবেশ’ যাবতীয় ভূ-রাজনৈতিক অঙ্ক পাল্টে দিতে পারে। তেল আভিভ ও ওয়াশিংটন দুই পক্ষেরই সেটা মেনে নেওয়া অসম্ভব। আর তাই ইহুদি বিমানবাহিনী আক্রমণের তেজ বাড়িয়ে বেজিঙের যাবতীয় পরিকল্পনায় যে জল ঢালতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

১৩ ১৮

তৃতীয়ত, ইরান যুদ্ধ থামাতে চাওয়ার নেপথ্যে ড্রাগনের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। লড়াইয়ের গোড়া থেকেই পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের সংযোগকারী হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান। সঙ্কীর্ণ ওই সামুদ্রিক রাস্তাতেই যাবতীয় খনিজ তেল বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাঠিয়ে থাকে পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য আরব দেশ। এর পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ। এ-হেন হরমুজ় বন্ধ থাকায় জ্বালানি সঙ্কটের আঁচ এসে লেগেছে বেজিঙের গায়েও।

১৪ ১৮

কিন্তু, হরমুজ় খোলার দায়িত্ব আপাতত নিতে রাজি নয় ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। সম্প্রতি এ ব্যাপারে এগিয়ে এসে সামরিক সাহায্য করতে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সকে আহ্বান জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দুই ইউরোপীয় ‘বন্ধু’ই এ ব্যাপারে কোনও আগ্রহ দেখায়নি। এই অবস্থায় হরমুজ় খুলতে ওয়াশিংটন কোনও বড় পদক্ষেপ করবে না বলে স্পষ্ট করেছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)।

১৫ ১৮

তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার তুলনায় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় প্রভাব বিস্তারে বেশি করে আগ্রহী বেজিং। সেখানকার দ্বীপরাষ্ট্র সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ানকে (রিপাবলিক অফ চায়না) কব্জা করার দীর্ঘ দিন ধরেই ছক কষছে ড্রাগন। ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত থাকলে সেটা করা চিনা লালফৌজ বা ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’র (পিএলএ) পক্ষে অনেক বেশি সহজ হবে। আর তাই জামিনদার হওয়ার ভুল এ ক্ষেত্রে করবে না তারা।

১৬ ১৮

গত ২ এপ্রিল জাতির উদ্দেশ্য ভাষণ দেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ থেকে সরে আসবে মার্কিন সেনা। তার আগে আমরা ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেব। তেহরানের আর পরমাণু অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা থাকবে না।’’ যদিও তাঁর ভাষণ শেষ হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই ইজ়রায়েলকে নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় সাবেক পারস্যের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।

১৭ ১৮

ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘গত ৪৭ বছরের ইরানি হিংস্রতার বিরুদ্ধে এ বার আক্রমণ শানিয়েছে আমেরিকা। সে দেশের প্রথম সারির নেতৃত্বকে ইতিমধ্যেই হত্যা করা হয়েছে। ফলে অনেকটাই কম গিয়েছে তেহরানের লড়াই করার ক্ষমতা। আমাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য প্রায় সফল। আমরা জিততে চলেছি। বিরাট জয়।’’ আমেরিকার পরবর্তী প্রজন্ম এই সংঘাতকে মনে রাখবে বলেও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে উল্লেখ করেছেন তিনি।

১৮ ১৮

মার্কিন গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষের সাহায্যে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স। নিজস্ব প্রশাসনিক পরিসরে তিনি নাকি জানিয়েছেন ট্রাম্পের ধৈর্য্যচ্যুতির কথা। অন্য দিকে তেহরান জানিয়েছে আগামী কয়েক মাস সহজেই লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে তারা। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক দানে চিন কোন রাস্তা ধরে সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement