ভেনেজ়ুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজ়লভ’ হোক বা ইরানে ‘মিডনাইট হ্যামার’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলা সামরিক অভিযানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কাঙ্ক্ষিত জয় এনে দিয়েছে তাঁর গর্বের বিমানবাহিনী। কী নেই তাতে? লড়াকু জেট, বোমারু বিমান থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র, বাঙ্কার বাস্টার বোমা, ড্রোন এবং সর্বোপরি পরমাণু হাতিয়ার। তা সত্ত্বেও কি সর্বশক্তিমানের মুকুট হারাতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুসেনা? চিনা ফৌজের উল্কার গতিতে উত্থানে উঠে গিয়েছে সেই প্রশ্ন।
মার্কিন বিমানবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নতুন রিপোর্ট প্রকাশ করে ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’ বা রুসি। এর ছত্রে ছত্রে রয়েছে যুদ্ধবিমান নির্মাণে চিনের একের পর এক সাফল্যের খতিয়ান। তাদের দাবি, গত পাঁচ বছরে বায়ুসেনার আধুনিকীকরণে সর্বাধিক জোর দিয়েছে বেজিং। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে এফ-২২ র্যাফটার এবং এফ-৩৫ লাইটনিং টুর মতো স্টেলথ শ্রেণির যুক্তরাষ্ট্রের জেটগুলিকে নিমেষে ধ্বংস করার জায়গায় পৌঁছে যাবে ড্রাগন।
রুসির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ সালে চিনের ‘পিপলস লিবারেশন অফ আর্মি’ বা পিএলএ বিমানবাহিনীর বহরে ছিল মাত্র ৯০ থেকে ১০০টি ওজনে ভারী জে-১৬ যুদ্ধবিমান। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সেই সংখ্যাটা বেড়ে পৌঁছোয় ৪৫০-এ। অর্থাৎ ২০২০-’২৫ সালের মধ্যে জে-১৬-এর উৎপাদন দ্বিগুণ করতে সক্ষম হয়েছে বেজিং। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে বছরে ৮০ থেকে ১০০টি যুদ্ধবিমান তৈরি করতে পারছে ড্রাগন। ২০২০ সালে যেটা ছিল মাত্র ৪০।
ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, ২০৩০ সালের মধ্যে পিএলএ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হবে ৯০০টি জে-১৬ লড়াকু জেট। এ ছাড়া ৮০০-র কাছাকাছি জে-১০সি যুদ্ধবিমান তারা মোতায়েন করতে পারবে বলে রুসির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন ভারতীয় বায়ুসেনার হামলায় বেজিঙের তৈরি জেট হারায় পাকিস্তান। সংঘাত পরিস্থিতিতে জে-১০সি তেমন কার্যকর না হওয়ায় ইতিমধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে এর গুণগত মান।
রুসির গবেষকেরা মনে করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে হাজারের বেশি স্টেলথ শ্রেণির জে-২০ লড়াকু জেট পিএলএ বিমানবাহিনীর বহরে শামিল করে ফেলবেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০২০ সালে বেজিঙের হাতে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটির সংখ্যা ছিল মেরেকেটে ৪০ থেকে ৫০। গত বছর সেটাই বেড়ে পৌঁছোয় ১২০তে। এগুলির পাশাপাশি পঞ্চম প্রজন্মের জে-৩৫এ লড়াকু জেটের ব্যাপক উৎপাদনও ড্রাগনভূমির প্রতিরক্ষা দফতর শুরু করেছে বলে জানিয়েছে ওই ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক।
অন্য দিকে লড়াকু জেট নির্মাণের গতির নিরিখে চিনের থেকে কয়েক যোজন পিছিয়ে আছে আমেরিকা। রুসির রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিনের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নির্মাণের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৯১। মার্কিন বিমানবাহিনীর পাশাপাশি আরও ১৮টি দেশকে সংশ্লিষ্ট জেটটি সরবরাহ করে তারা। সেখানে ১২০টি জে-২০ জেট কেবলমাত্র পিএলএ বায়ুসেনার ছাউনিতে পাঠিয়েছে ড্রাগনভূমির প্রতিরক্ষা সংস্থা চেংডু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন।
লড়াকু জেটের পাশাপাশি জে-১৬ডি ও জে-১৫ডিটি/ডিএইচের মতো ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান নির্মাণের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে চিন। পাশাপাশি, ষষ্ঠ প্রজন্মের দু’টি জেটের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে বেজিং। সেগুলির পোশাকি নাম জে-৩৬ এবং জে-৫০ বলে জানা গিয়েছে। ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নির্মাণের ঘোষণা অবশ্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও, যার বরাত যুক্তরাষ্ট্রীয় উড়ান সংস্থা বোয়িংকে দিয়েছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট জেটটির নাম এফ-৪৭ রেখেছে আমেরিকার যুদ্ধ দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার)।
ট্রাম্পের দাবি, বিশ্বের যে কোনও দেশের যুদ্ধবিমানের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে তাঁদের ষষ্ঠ প্রজন্মের জেট। একগুচ্ছ ড্রোন নিয়ে উড়ে গিয়ে শত্রুঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারবে এফ-৪৭। তবে তার নকশা ও অন্যান্য যাবতীয় তথ্য যথাসম্ভব গোপন রাখছে আমেরিকা। সংশ্লিষ্ট জেটটির পরীক্ষামূলক উড়ান কবে হবে, তা নিয়েও যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। এই নিয়ে সরকারি ভাবে এখনও কিছুই ঘোষণা করেনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
এগুলির পাশাপাশি মাঝ-আকাশের লড়াইতেও চিনকে এগিয়ে রেখেছে ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রুসি। তাদের যুক্তি, পিএলএ বিমানবাহিনীর হাতে আছে দু’ধরনের আকাশ থেকে আকাশের (এয়ার টু এয়ার) ক্ষেপণাস্ত্র। সেগুলি হল, পিএল-১৫ ও পিএল-১৬। অন্য দিকে, সাধারণত এক ধরনের এয়ার টু এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে থাকে মার্কিন বায়ুসেনা। তার নাম এইম-১২০ অ্যামরাম, যার সর্বোচ্চ পাল্লা ১৩০-১৬০ কিলোমিটার বলে জানা গিয়েছে।
পিএলএ বায়ুসেনার কাছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার দু’ধরনের আকাশ থেকে আকাশের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ফলে প্রয়োজনমতো সেগুলি ব্যবহার করতে পারবে তারা। অন্য দিকে, মার্কিন বিমানবাহিনীর হাতে থাকা অ্যামরাম মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হাতে না থাকায় সংঘাত পরিস্থিতিতে সমস্যা হতে পারে ওয়াশিংটনের। যদিও এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে।
গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন চিনের তৈরি পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভারতীয় জেট ধ্বংস করার চেষ্টা করে পাক বিমানবাহিনী। কিন্তু লক্ষ্যে আঘাত হানার পরিবর্তে পঞ্জাবের হোশিয়ারপুরে একটি সীমান্তবর্তী গ্রামে এসে পড়ে সেটি। সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রে কোনও বিস্ফোরণ হয়নি। ফলে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সেটিকে সংগ্রহ করে ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠায় স্থানীয় পুলিশ। ফলে পিএল-১৫র নকশা ও কার্যকারিতা পুরোপুরি হস্তগত করতে সক্ষম হয়েছে এ দেশের ফৌজ।
চিনের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রটি কাজ না করার নেপথ্যে মূলত দু’টি কারণের কথা বলেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। প্রথমত, ভারতের ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশলের কবচ ভেদ করতে ব্যর্থ হয় পিএল-১৫। ফলে রাস্তা ভুল করে পঞ্জাবের গ্রামে এসে পড়ে সেটি। জ্যামার থাকার কারণে তাতে কোনও বিস্ফোরণও হয়নি। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটি রেডার চালিত। যা আগেই এ দেশের বাহিনী উড়িয়ে দেওয়ায় লক্ষ্য খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছে বেজিং নির্মিত পিএল-১৫র।
লড়াকু জেট ও ক্ষেপণাস্ত্রকে বাদ দিলে চিনা ড্রোন বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছে রুসি। ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে আমেরিকার। কারণ, ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পাইলটবাহিনী যান রয়েছে বেজিঙের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’র অস্ত্রাগারে। একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠিয়ে হামলা চালানোর যুদ্ধকৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছে তারা। এ ছাড়া পাইলটবিহীন যানে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ব্যবহার করছে মান্দারিনভাষীরা।
গত বছরের ডিসেম্বরে পেন্টাগনের একটি গোপন রিপোর্ট ফাঁস করে নিউ ইয়র্ক টাইমস। জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যমটির দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে চিনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে, তারই পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন বাহিনীর শীর্ষকর্তারা। সেখানে দু’তরফের তুলনা টানতে গিয়ে ‘ওভারম্যাচ’ (মিল খাচ্ছে না) শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন তাঁরা। এককথায় বেজিঙের অত্যাধুনিক ফৌজের কাছে মার্কিন সেনাকে হারতে হতে পারে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে কী ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সুবিধাগুলি চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র সামনে অকেজো হয়ে পড়বে, তার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টটি যুদ্ধের মহড়া, সাইবার দক্ষতা এবং মার্কিন গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করে পেন্টাগনের ভিতরের ‘অফিস অফ নেট অ্যাসেসমেন্ট’ নামের একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। এতে কারা রয়েছেন, তা অবশ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত পেন্টাগনের গোপন নথিতে রয়েছে মার্কিন কৃত্রিম উপগ্রহ, রণতরী এবং লড়াকু জেট ধ্বংসের চিনা সক্ষমতার ভূয়সী প্রশংসা। পাশাপাশি, যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালেও এই ধরনের একটি রিপোর্ট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বা এনএসএ-র (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসার) কাছে পাঠায় সাবেক প্রতিরক্ষা দফতর, যা এখন নাম বদলে যুদ্ধ দফতর হয়ে গিয়েছে।
কোন যুক্তিতে চিনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ মার্কিন ফৌজ? এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পেন্টাগনের গোপন রিপোর্টে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, খুব কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন, হাইপারসনিক (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) অস্ত্র এবং সাইবার হাতিয়ার ব্যবহার করছে ড্রাগন পিএলএ। সেখানে আমেরিকার সেনাবাহিনীর অস্ত্রগুলি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। বর্তমানে সেগুলির উৎপাদনও হচ্ছে যথেষ্ট ধীর গতিতে।
আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, আধুনিক লড়াইয়ে ডুবো ড্রোন এবং স্পাইঅয়্যারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দুই অস্ত্রের নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ঢের বেশি এগিয়ে আছে চিন। সমুদ্রের গভীরে বিছানো ইন্টারনেটের তার কেটে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করতে পারে তারা। তা ছাড়া ওয়াশিংটনের রণতরী ডোবানোর ক্ষমতা রয়েছে ড্রাগনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের। স্পাইঅয়্যারে বেজিঙের আড়িপাতা ঠেকানোরও শক্তি নেই ওয়াশিংটনের।
মার্কিন যুদ্ধ দফতরের ফাঁস হওয়া ওই রিপোর্ট অবশ্য মানতে চাননি বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের সমর্থন পাবে যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া ওয়াশিংটনের পাশে রয়েছে নেটোর মতো সামরিক জোট, যার সদস্য ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইটালির মতো রাষ্ট্র। তা ছাড়া লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা চিনের খুবই কম। সংঘর্ষের সময় স্নায়ুর চাপ ধরে রেখে বেজিং কতটা কী করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।