এক পয়সা মুনাফা নেই। উল্টে দিন দিন বাড়ছে লোকসানের অঙ্ক। এই যুক্তি দিয়ে এ বার পাকিস্তান ত্যাগের ঘোষণা করল একটি চিনা সংস্থা। সেই লক্ষ্যে বালোচিস্তানের গ্বদরের কসাইখানা বন্ধ করেছে তারা। বেজিঙের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক বেশ মধুর। তার পরেও মান্দারিনভাষীদের এ-হেন সিদ্ধান্তে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের রক্তচাপ যে আরও বাড়ল, তা বলাই বাহুল্য।
গ্বদর-ত্যাগী চিনা সংস্থাটির নাম ‘হ্যাংগেং ট্রেড কোম্পানি’। পাক গণমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শ্রমিক দিবসে (পড়ুন ১ মে) কসাইখানা বন্ধের ঘোষণা করে তারা। কয়েক দিন আগেই অবশ্য সেখানকার সবাইকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। পরে ব্যবসা গোটানোর কারণ জানিয়ে বিবৃতি দেয় হ্যাংগেং। তাতে ইসলামাবাদের অস্বস্তি আরও বৃদ্ধি পায় বললে অত্যুক্তি হবে না।
হ্যাংগেং তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাকিস্তানে ব্যবসা চালাতে গিয়ে পরিচালনগত সমস্যার মুখে পড়েন তারা। ফলে ক্রমাগত সংস্থার লোকসানের অঙ্ক বাড়ছিল। পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান পূরণ করা সত্ত্বেও আটকে যায় সেই চালান। শেষ তিন মাস ধরে এই ধরনের সমস্যাগুলি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হলেও, সমাধানসূত্র মেলেনি। আর তাই কসাইখানায় তালা ঝোলাতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
পাকিস্তান থেকে ব্যবসা গোটানোর আগে যাবতীয় বকেয়া পরিশোধ করেছে এই চিনা সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে ছাঁটাই হওয়া কর্মচারীদের তিন মাসের বেতন, জরিমানা, বিদ্যুতের বিল এবং বিলম্বিত কন্টেনার ফি। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে ইসলামাবাদে লগ্নির ক্ষেত্রে বেজিঙের অন্যান্য সংস্থাগুলিকে বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছে হ্যাংগেং। কারণ হিসাবে উঠে এসেছে পাকিস্তানের ‘প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা’।
চলতি বছরের মে মাসের শেষের দিকে চিনসফরে যাবেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়। ড্রাগনভূমিতে একটি বিজনেস ফোরামে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ঠিক তার আগে বালোচিস্তান থেকে যাবতীয় ব্যবসা গোটাল বেজিঙের সংস্থা হ্যাংগেং। গ্বদর বন্দর সংলগ্ন ফ্রি জ়োনে কসাইখানা খোলে তারা। সেখানকার কর্মীদের ছাঁটাই করা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছে মান্দারিনভাষীদের সংস্থাটি।
দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশ বালোচিস্তানের গ্বদর সমুদ্রবন্দরটির গুরুত্ব ইসলামাবাদের অর্থনীতিতে অপরিসীম। সেখানে গিয়ে শেষ হবে ‘চিন পাকিস্তান আর্থিক বারান্দা’ বা সিপিসি (চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর) প্রকল্পের কাজ। এ-হেন গ্বদরে গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) ফেব্রুয়ারিতে ৭০ লক্ষ ডলার খরচ করে ঝলমলে কসাইখানা খোলে বেজিঙের সংস্থা হ্যাংগেং।
২০২৪ সালে চর্ম রফতানির ব্যাপারে চিনের সঙ্গে একটি চুক্তি করে পাকিস্তান। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, গ্বদরে খোলা হয় কসাইখানা। ঠিক হয়, সেখানে বছরে ৩ লক্ষ গর্দভ চর্ম প্রক্রিয়াকরণের কাজ করবে ড্রাগন সংস্থা হ্যাংগং। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ধর্মীয় কারণে অতীতে পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে ছিল না কোনও গাধার কসাইখানা।
বেজিঙের বাজারে পাকিস্তানি গাধার বিপুল চাহিদার মূল কারণ হল ‘এজিয়াও’। এটি প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী চিনা ওষুধের মূল উপাদান, যা তৈরি হয় গর্দভচর্মের আঠা দিয়ে। ড্রাগনভূমির আমজনতার একটি বড় অংশের বিশ্বাস, নিয়মিত ‘এজিয়াও’ সেবনে বৃদ্ধি পায় রক্ত সঞ্চালন, বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না ক্যানসার।
অন্য দিকে ইসলামীয় রীতিতে ‘পবিত্র পশু’র তকমা পেয়েছে গাধা। মূলত, মোট বহনের জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই চারপেয়ে প্রাণীটিকে ব্যবহার করে আসছে আর্থিক ভাবে অসচ্ছল পাক পরিবারগুলি। ফলে কসাইখানার জন্য ইসলামাবাদ পর্যাপ্ত গর্দভ সরবরাহ করে যেতে পারবে বলে আশাবাদী চিন।
গ্বদরের কসাইখানায় গাধার চামড়া প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কোলাজ়েন উৎপাদনের কথা ছিল। এটি ব্যবহার করেই চিনা ওষুধ সংস্থাগুলির কারখানায় তৈরি হয়ে থাকে ‘এজিয়াও’। বর্তমানে এর বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। ড্রাগনভূমিতে এর বিপুল চাহিদা থাকায় গর্দভচর্ম থেকে আরও বেশি মুনাফার স্বপ্নে বিভোর ছিল ইসলামাবাদ।
একসময় বিলাসবহুল পণ্য হিসাবে চিনাবাজারে ‘এজিয়াও’র বেশ পরিচিতি ছিল। কিন্তু, বর্তমানে অনেক বেশি সহজলভ্য এবং জনপ্রিয় হওয়ায় এর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, ‘এজিয়াও’র উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গর্দভচর্মের জন্য পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বেজিং।
গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে গ্বদরে গাধার কসাইখানা খোলার উপযোগিতার ব্যাখ্যা দেন পাক সংসদের নিম্নকক্ষ ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’র খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতা রানা মহম্মদ হায়াত। তাঁর কথায়, ‘‘জীবিত গাধা রফতানি করা অনেক বেশি কঠিন। এতে লাভের সম্ভাবনাও কম। আর তাই কসাইখানা খুলে গর্দভ-উপজাত দ্রব্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’
কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্বদরে গাধার কসাইখানা প্রতিষ্ঠা নিয়ে পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে ওঠে বিতর্কের ঝড়। বালুচিস্তানের ধর্মীয় নেতারা নির্বিচারে শয়ে শয়ে গাধা জবাইয়ের বিরোধিতা করতে দেখা গিয়েছে। তাঁদের যুক্তি, গরিব পাক নাগরিকেরা পরিবহণের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই এই প্রাণীটির উপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া এতে অচিরেই গর্দভের সংখ্যার উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
এই ইস্যুতে বালোচিস্তানে গণবিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠলে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলে ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘ডাঙ্কি স্যাঙ্কচুয়ারি’। তাদের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, চিনা ‘এজিয়াও’র জন্য ফি বছর বিশ্বব্যাপী জবাই হয় প্রায় ৫৯ লক্ষ গাধা। এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে পুরোপুরি গর্দভশূন্য হবে পৃথিবী। যদিও এই সতর্কবার্তায় কান দেয়নি শাহবাজ় প্রশাসন।
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের পরবর্তী সময়ে ঘরোয়া বাজারে ‘এজিয়াও’র চাহিদা বৃদ্ধি পেলে আফ্রিকার দেশগুলি থেকে গর্দভচর্ম আমদানি শুরু করে বেজিং। কিন্তু পরবর্তী কালে গাধা রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আফ্রিকান ইউনিয়ন। তার পর থেকেই বিশেষ এই চারপেয়ে প্রাণীটির জন্য ক্রমাগত পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে থাকে ড্রাগনভূমির সরকার। মুনাফার সুযোগ থাকায় ইসলামাবাদও তাতে ‘না’ বলেনি।
নির্বিচারে গাধা হত্যায় সৃষ্ট পরিবেশগত কুফলের পাশাপাশি ‘এজিয়াও’র ব্যাপারে আরও একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, এতে মোটা লাভের সুযোগ থাকায় গাধা চুরি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুরু হতে পারে চারপেয়ে প্রাণীটির ব্যাপক চোরাচালান। পাশাপাশি, গ্বদরে কসাইখানা খোলার জেরে পাক সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেননি তাঁরা।
যদিও এই সমস্ত সতর্কবার্তাই ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় শাহবাজ় সরকার। কারণ এখনও পাক অর্থনীতির একটি বড় অংশই পশুজাত পণ্য রফতানির উপর নির্ভরশীল। ২০১৫-’১৬ এবং ২০১৬-’১৭ আর্থিক বছরে আফগানিস্তানে যথাক্রমে ২৮ লক্ষ ও ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ডলার মূল্যের শূকরের মাংস পাঠিয়েছিল ইসলামাবাদ। ওই সময়ে হিন্দুকুশ পাহাড়ের কোলের দেশটিতে মোতায়েন ছিল মার্কিন শক্তিজোট নেটোর বাহিনী। মূলত, তাঁদের জন্যই ওই মাংস রফতানি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া পাক সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর মাংস ও চামড়ার জন্য প্রায় ২.১৬ লক্ষ গাধা রফতানি করে থাকে ইসলামাবাদ। এর সিংহভাগই যায় চিনে। চতুষ্পদটিকে বিক্রি করে বছরে কম-বেশি ৩০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হচ্ছে তাদের।
পাক গণমাধ্যমগুলির দাবি, গ্বদরের কসাইখানায় গাধা পাঠানো বন্ধ রেখেছিল শাহবাজ় সরকার। ফলে বিপাকে পড়ে চিনের চর্মপ্রক্রিয়াকরণ সংস্থাটি। কিন্তু, হ্যাংগেং ব্যবসা গোটানোর কথা বলতেই ১৮০ ডিগ্রি বেঁকে চতুষ্পদ প্রাণীটি সরবরাহের অনুমোদন দেয় শাহবাজ় প্রশাসন। তার পরেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি ব্যবসা চালাবে কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি।
২০২৫ সালে জুলাইয়ে পাকিস্তান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলে মাইক্রোসফ্ট। বিশ্বব্যাপী কর্মসঙ্কোচনের জেরে বহুজাতিক মার্কিন টেক জায়ান্টটি এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা গিয়েছিল। তা ছাড়া ইসলামাবাদের ডিজিটাল ব্যবসায় হু-হু করে কমছিল তাদের লাভের অঙ্ক। ফলে মাত্র পাঁচ জন কর্মীকে নিয়ে একটি দফতর চালাচ্ছিল তারা। পরে সেটারও ঝাঁপ বন্ধ করে দেয় মাইক্রোসফ্ট।