ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে দেশছাড়া করা হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত (স্থানীয় সময় অনুসারে রাত ২টো) থেকে ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করেছে আমেরিকা। আমেরিকার এই সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা করেছে ভেনেজ়ুয়েলা। ভেনেজ়ুয়েলার সরকারের দাবি, সে দেশের খনিজ তেল এবং সম্পদ হাতানোর জন্যই এই কাজ করেছে আমেরিকা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই চেষ্টা সফল হবে না বলে জানিয়েছে তারা।
আমেরিকার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বসতি এলাকাতেও হামলা চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই মার্কিন হানার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন দেশ। অন্য দিকে, ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে আমেরিকা। মাদকসন্ত্রাস, কোকেনপাচারের মতো অভিযোগ তো রয়েইছে, এ ছাড়াও মাদুরোর বিরুদ্ধে অস্ত্র অপরাধের অভিযোগও আনা হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে দুর্নীতিগ্রস্ত, অবৈধ সরকার পরিচালনার অভিযোগও আনা হয়েছে। প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধেও সরকারি কর্তাদের প্রভাবিত করা, কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া থেকে শুরু করে মাদকপাচারে মদত দেওয়ার মতো নানা গুরুতর অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা।
আমেরিকার সঙ্গে ভেনেজ়ুয়েলার চাপানউতর দীর্ঘ দিন ধরেই চলছিল। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ভেনেজ়ুয়েলা সীমান্তে কোনও তেল ট্যাঙ্কার আসা-যাওয়া করতে পারবে না। সঙ্গে ভেনেজ়ুয়েলা সরকারকে ‘জঙ্গিগোষ্ঠী’ তকমাও দিয়েছিলেন তিনি। মাদুরোকে ‘অবৈধ শাসক’ বলে অভিহিত করে তাঁকে পদত্যাগ করতেও বলেছিলেন।
এই মুহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেলের ভান্ডার রয়েছে ভেনেজ়ুয়েলায়। প্রতি দিন প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন হয় সে দেশে। ভেনেজ়ুয়েলার দাবি, তাদের সেই খনিজ সম্পদ লুট করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তা ছাড়া, গত কয়েক বছরে চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে মাদুরোর সরকার। তার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন।
আমেরিকা বার বার দাবি করেছে, মাদকপাচার এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তেল ব্যবহার করছে ভেনেজ়ুয়েলা। ওই তেল আদতে চুরি করা হচ্ছে ভেনেজ়ুয়েলার বিভিন্ন খনি থেকে। তার পর তা বিক্রি করে জঙ্গি কার্যকলাপে ব্যবহার করা হচ্ছে। সে সব রুখতে কয়েক মাস আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণু-ডুবোজাহাজ নামিয়েছিল ট্রাম্পের সরকার। সর্ব ক্ষণ দেশটিকে একপ্রকার ঘিরে রেখেছিল মার্কিন ফৌজ। এর পর শুক্রবার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে আমেরিকা।
আমেরিকার হাতে মাদুরো বন্দি হওয়ার পর ভেনেজ়ুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেসকে আপাতত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ করেছে সে দেশের আদালত। ভেনেজ়ুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশ দিয়েছে। ক্ষমতা পেয়েই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দিয়েছেন ডেলসি। অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীর মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি। ভেনেজ়ুয়েলায় আমেরিকার অভিযানকে ‘বর্বরোচিত’ বলেও উল্লেখ করেছেন ডেলসি।
মাদুরোকে অপহরণের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, আপাতত আমেরিকাই ভেনেজ়ুয়েলা চালাবে। এই ঘোষণার নিন্দা করে ডেলসি জানিয়েছেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে তাঁরা প্রস্তুত। তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা কখনও কারও দাসত্ব করব না। কোনও সাম্রাজ্যের উপনিবেশ আর আমরা হব না। আমরা ভেনেজ়ুয়েলাকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।’’
যদিও পরে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো জানান, আমেরিকা সরাসরি ভেনেজ়ুয়েলা চালাবে না। তবে তেল নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হবে। তেলের ট্যাঙ্কারগুলির উপর আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপানো হবে। যত ক্ষণ না ভেনেজ়ুয়েলায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কিংবা ভেনেজ়ুয়েলার পরিস্থিতি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের সহায়ক হবে, তত দিন এই নিষেধাজ্ঞা চলবে।
পাশাপাশি, ভেনেজ়ুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য আটলান্টিক’-কে ট্রাম্প বলেন, “যদি রড্রিগেস সঠিক ভাবে কাজ না করেন, তা হলে তাঁকে মাদুরোর থেকেও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।”
ভেনেজ়ুয়েলায় প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতারের অভিযানে আমেরিকার অভিজাত ডেল্টা ফোর্স যুক্ত ছিল বলে জানা গিয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে পরিস্থিতি যদি বিস্তৃত সামরিক সংঘাতে পরিণত হয়, তবে ভেনেজ়ুয়েলার প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এই পরিস্থিতিতে দু’দেশের সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরাও। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে, দুই দেশ যদি প্রত্যক্ষ সংঘাতে নামে তা হলে কার পাল্লা ভারী থাকবে? কার ক্ষমতা কেমন, তা নিয়েও কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন অনেকে।
‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’-এর প্রতিবেদন বলছে, আমেরিকার হাতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। অন্য দিকে, ভেনেজ়ুয়েলা রয়েছে এর অনেক নীচে। সামরিক বাহিনীর দিক থেকে ৫০তম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি।
ভেনেজ়ুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর নাম ‘ন্যাশনাল বলিভারিয়ান আর্মড ফোর্সেস’। প্রাথমিক ভাবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৈরি হয়েছিল এই সামরিক বাহিনী।
ভেনেজ়ুয়েলায় প্রায় এক লক্ষ ন’হাজার সক্রিয় সেনা জওয়ান রয়েছেন। আমেরিকায় সেই সংখ্যা ১৩ লক্ষ ২৮ হাজার। ভেনেজ়ুয়েলার হাতে থাকা রিজ়ার্ভ সেনার সংখ্যাও আমেরিকার তুলনায় অনেক কম। দুই দেশে এই সংখ্যা যথাক্রমে— আট হাজার এবং আট লক্ষ। তবে ভেনেজ়ুয়েলার কাছে বাড়তি হিসাবে দু’লক্ষ ২০ হাজার আধাসামরিক বাহিনীও রয়েছে।
তবে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের মান, সরঞ্জাম এবং আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিতেও আমেরিকার থেকে অনেক পিছিয়ে ভেনেজ়ুয়েলা।
আকাশ এবং নৌ শক্তির দিক থেকে ভেনেজ়ুয়েলা শক্তিশালী হলেও আমেরিকার তুলনায় তা প্রায় নগণ্য। আমেরিকার বায়ুসেনা বিশ্বে এক নম্বর। ভেনেজ়ুয়েলা ৪২ নম্বর। দক্ষিণ আমেরিকার বায়ুসেনার হাতে রয়েছে ২২৯টি বিমান, যার মধ্যে অনেকগুলিই রাশিয়ার তৈরি পুরনো এসএউ-৩০এমকে২-এর মতো পুরনো।
অন্য দিকে, আমেরিকার বায়ুসেনার হাতে রয়েছে ১৩ হাজার ৪৩টি জেটবিমান, যার মধ্যে এফ-২২ এবং এফ-৩৫-এর মতো স্টেলথপ্রযুক্তি এবং উন্নত প্রতিরক্ষাযুক্ত আধুনিক জেট রয়েছে। ফলে, আকাশপথে আমেরিকা বলে বলে গোল দেবে ভেনেজ়ুয়েলাকে।
স্থলসেনার ক্ষমতার দিক থেকেও এগিয়ে আমেরিকা। মাদুরোর দেশে সেনাবাহিনীর হাতে ১৭০টি ট্যাঙ্ক এবং প্রায় ৮,৮০০টি সাঁজোয়া গাড়ি রয়েছে, যার বেশির ভাগই আধুনিক মানদণ্ড অনুসারে অপ্রচলিত বলে বিবেচিত হয়।
আমেরিকার কাছে ট্যাঙ্ক রয়েছে ৪,৬৪০টি। সাঁজোয়া গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ। এর বেশির ভাগই আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি।
ভেনেজ়ুয়েলার নৌসেনার ক্ষমতাও সীমিত। দেশটির হাতে মূলত ছোট যুদ্ধজাহাজ এবং উপকূলরক্ষী জাহাজ রয়েছে। কোনও রণতরী বা দীর্ঘপাল্লার যুদ্ধজাহাজ নেই। আমেরিকার কাছে যেখানে ৭০টি আধুনিক ডুবোজাহাজ রয়েছে, সেখানে ভেনেজ়ুয়েলার হাতে রয়েছে মাত্র একটি। এ ছাড়়াও মার্কিন নৌবাহিনীতে ৪০০-র বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। পরমাণু ক্ষমতাযুক্ত রণতরী রয়েছে ১১টি, যা ডুবোজাহাজ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত।
ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলির মধ্যে একটি হল প্রতিরক্ষা খাতে দেশটির ব্যয়। সামরিক খাতে বার্ষিক ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের বাজেট বরাদ্দ করে ভেনেজ়ুয়েলা। অন্য দিকে, সামরিক খাতে আমেরিকার বার্ষিক বাজেট ৮৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
ফলে স্পষ্টতই দেশের সামরিক বাহিনীর হাতে আধুনিক এবং উন্নত প্রযুক্তি বা যুদ্ধাস্ত্র তুলে দেওয়ার ক্ষমতা নেই ভেনেজ়ুয়েলার। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলি ভেনেজ়ুয়েলার যে কোনও অর্থবহ সামরিক আধুনিকীকরণকে আরও স্থবির করে দিয়েছে।
প্রচলিত শক্তির বাইরে পরমাণু ক্ষমতা, বিশ্বব্যাপী সামরিক ঘাঁটি, উপগ্রহ নজরদারি, সাইবার শক্তি এবং মহাকাশ অভিযানেও আধিপত্য বিস্তার করে আমেরিকা। ভেনেজ়ুয়েলার হাতে কোনও পরমাণু অস্ত্র নেই। দেশটির পরমাণু শক্তি কর্মসূচি ১৯৫০-এর দশকে শুরু হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে কোনও সক্রিয় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই ভেনেজ়ুয়েলায়।
ফলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ দু’টি যদি সরাসরি সংঘাতে নামে তা হলে আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানোর ক্ষেত্রে বেগ পেতে হবে ভেনেজ়ুয়েলাকে। আমেরিকার শক্তির কাছে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে ভেনেজ়ুয়েলার সামরিক বাহিনী। প্রযুক্তি, তহবিল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিফলিত হবে।
আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে ভেনেজ়ুয়েলার একমাত্র সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে স্থানীয় সশস্ত্রবাহিনীর উপর নির্ভর করা এবং ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তবে সে কৌশল নিয়েও ভেনেজ়ুয়েলা যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি দিন টিকতে পারবে না বলেই মত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের।