State child Trafficking

রাজধানীর বুকে ‘শিশুবাজার’, আট লক্ষ টাকায় শিশুপুত্র, অর্ধেক দামে কন্যা! মূল চক্রীর পরিচয় জেনে চমকে গেল পুলিশও

একটি শিশুর জীবন ও ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার বাবা-মায়ের পরিস্থিতি এবং অপরাধীদের সীমাহীন লোভের অঙ্গুলিহেলনে। তদন্তে নেমে পুলিশের কাছে উঠে এসেছে দিল্লির অত্যন্ত সুসংগঠিত এক ‘বাজারের’ অস্তিত্বের কথা। চাহিদার নিক্তিতে যেখানে পুত্রসন্তানের দর ছয় থেকে আট লক্ষ। কন্যাসন্তানের দাম অর্ধেক, তিন থেকে চার লক্ষ টাকা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ ১২:৪৭
Share:
০১ ১৮

শিশুপুত্রের নাকি কদর বেশি। তাই তার দামও বেশি। সচ্ছল পরিবারে নিঃসন্তান দম্পতিরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতে দু’বার ভাবেন না। রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত এলাকার মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে এনে বিক্রি করে দেওয়া হয় মোটা টাকার বিনিময়ে। আন্তঃরাজ্য শিশু পাচার চক্র থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যাটা ক্রমশ কপালে ভাঁজ বাড়িয়ে তুলছে দিল্লির প্রশাসনিক কর্তাদের।

০২ ১৮

রাজস্থানে জন্ম নেওয়া এক শিশুকে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পাচার করে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে সেই শিশুকে হরিয়ানার এক দম্পতির কাছে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়। দিল্লিতে বেশ কয়েক বছর ধরে জাল বিছিয়ে রেখেছিল শিশু পাচার চক্রটি। পুলিশ সূত্রে খবর, রাজস্থান ও গুজরাত-সহ একাধিক রাজ্যের দরিদ্র দম্পতিদের কাছ থেকে শিশু কিনে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হত।

Advertisement
০৩ ১৮

সম্প্রতি রাজধানীর রোহিণী থেকে ২৫ দিনের সদ্যোজাতকে উদ্ধার করে পুলিশ। ৮ লক্ষ টাকায় শিশুটিকে কেনার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মাসের শুরুতে প্রকাশ্যে আসা একটি শিশু পাচার চক্রের তদন্তের সূত্র ধরে বড় অগ্রগতি পেয়েছেন তদন্তকারীরা। শিশু কেনাবেচায় অভিযুক্ত গরিমা জৈন এবং তাঁর শ্বশুর সতীশ জৈনের সন্ধান পেয়ে তাঁদের গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশ।

০৪ ১৮

পুলিশ জানিয়েছে, রোহিণীর বাসিন্দা পরিবারটির কোনও সন্তান না থাকায়, তাঁরা প্রায় আড়াই সপ্তাহ আগে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত এক মহিলার মাধ্যমে নবজাতকটিকে কিনেছিল। শিশুটিকে রাজস্থানের পালি জেলার একটি দরিদ্র পরিবার থেকে প্রায় দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকায় সংগ্রহ করে দিল্লিতে আনা হয়েছিল। আট লক্ষ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল জৈন পরিবারের কাছে।

০৫ ১৮

তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ, সক্রিয় এই শিশু পাচার চক্রটি গত ১৮ মাসে একাধিক রাজ্যের প্রায় ৩০টি শিশুকে অবৈধ ভাবে বিক্রি করেছে। এই মামলায় এখনও পর্যন্ত অভিযুক্ত পাচারকারী, মধ্যস্থতাকারী, ক্রেতা এবং দিল্লির বাইরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক-সহ মোট ১৩ জন পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন।

০৬ ১৮

তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, চক্রের সদস্যেরা মূলত আর্থিক ভাবে দুর্বল ও অসহায় পরিবারগুলোকে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতেন। বিশেষ করে রাজস্থান ও গুজরাতের বিভিন্ন আদিবাসী এলাকায় দরিদ্র পরিবারগুলোর অসহায়তার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শিশুদের সংগ্রহ করা হত বলে অভিযোগ।

০৭ ১৮

একটি শিশুর জীবন ও ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার বাবা-মায়ের পরিস্থিতি এবং অপরাধীদের সীমাহীন লোভের অঙ্গুলিহেলনে। তদন্তে নেমে পুলিশের কাছে উঠে আসে সুসংগঠিত এক ‘বাজারের’ অস্তিত্বের কথা। সেখানে ছেলে ও মেয়ের ভিন্ন ‘দর’। চাহিদার নিক্তিতে পুত্রসন্তানের দর ছয় থেকে আট লক্ষ। কন্যাসন্তানের দাম অর্ধেক। তিন থেকে চার লক্ষ টাকা।

০৮ ১৮

মধ্য দিল্লির পাহাড়গঞ্জের এক বাসিন্দার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ একটি অভিযান শুরু করে। ওই তথ্যে বলা হয়েছিল, এক মহিলাকে নিয়মিত বিরতিতে প্রতি বার ভিন্ন ভিন্ন শিশুর সঙ্গে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। তথ্য পেয়ে পুলিশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে এবং গোয়েন্দারা তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন।

০৯ ১৮

কয়েক দিন ধরে নজরদারি ও অনুসরণের পর পুলিশ ওই মহিলার পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। তদন্তের গতি আরও বাড়ানো হয়। গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয় যে, জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামে ওই মহিলা কথিত শিশু পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর পর তাঁর ভূমিকা, যোগাযোগ এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়।

১০ ১৮

একটি লেনদেনের অজুহাতে কমলেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে পুলিশ। এক মহিলা পুলিশ ছদ্মবেশী ক্রেতা সেজেছিলেন। সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয় এবং একটি শিশুর জন্য চুক্তি সম্পন্ন হয়। অগ্রিম হিসাবে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়েও সম্মতি হয়। গত ৫ জুন কমলেশ পুলিশের ছদ্মবেশী কর্মীর কাছে এক শিশুকে হস্তান্তর করতে এসে বমাল ধরা পড়েন। কমলেশকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আন্তঃরাজ্যব্যাপী ওই পাচার চক্রের হদিস মেলে।

১১ ১৮

এই চক্রটি রাজস্থান ও গুজরাতের দরিদ্র দম্পতিদের কাছ থেকে শিশু কিনে বা চুরি করে মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করত বলে অভিযোগ। কমলেশকে একটানা জিজ্ঞাসাবাদের ফলে পুলিশ তাঁর শাগরেদ শালু ও ললিত এবং পরে প্রতিভা ও বিপিন নামে আরও দু’জনের সন্ধান পায়। এরাই আড়কাঠি মারফত শিশু সংগ্রহ এবং বিক্রির জন্য চুক্তি করার মতো কাজ সামলাত বলে পুলিশ জানতে পারে।

১২ ১৮

সমস্ত অভিযুক্তকে ধারাবাহিক ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তদন্তকারীদের চোখ কপালে ওঠে। পুলিশ পশ্চিম দিল্লির একটি হাসপাতালের সন্ধান পায় তারা। হাসপাতালটি রোহিণীর বেগমপুরে অবস্থিত হীরার মাল্টিস্পেশ্যালিটি হাসপাতাল। এই হাসপাতালটিই পুরো চক্রটির আঁতুড়ঘর হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। আর এই চক্রটির মূল হোতা হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক বিবেকী।

১৩ ১৮

সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিংহ একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পাচারকারীরা শিশুদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগে তাদের বিবেকীর হাসপাতালে রাখত বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, ওই হাসপাতালটি শিশু পাচার চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা হত।

১৪ ১৮

বিবেকী এই পুরো চক্রের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। শিশুদের পরিচয় ও জন্মসংক্রান্ত নথি জাল করতে তিনি সহায়তা করতেন। জন্ম সনদ, প্রসবের নথি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাসপাতাল থেকেই তৈরি করা হত, যাতে দেখানো যায় যে শিশুরা সেখানেই জন্ম নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দিল্লি পুলিশের এই উচ্চপদস্থ কর্তা।

১৫ ১৮

পুলিশি তদন্তে দেখা গিয়েছে যে, প্রায় এক লক্ষ টাকায় একটি শিশুকন্যা সংগ্রহ করে প্রায় তিন থেকে চার লক্ষ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল, অন্য দিকে প্রায় দুই লক্ষ টাকায় একটি শিশুপুত্র কিনে ছয় থেকে আট লক্ষ টাকার মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছিল। ডিসিপি সিংহ বলেন, ‘‘বিবেকীর হাসপাতালেই এই লেনদেনগুলো হচ্ছিল। তিনি শিশু কিনতে আগ্রহী দম্পতি এবং পাচারকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করতেন।’’

১৬ ১৮

দিল্লিতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গুজরাতের সবরকান্থা থেকে সাবভাই ঘামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের মতে, উদয়পুরের বাসিন্দা ঘামার রাজস্থানের পালি এবং সবরকান্থার দারিদ্রপীড়িত পরিবারে দম্পতিদের কাছ থেকে শিশুদের ‘কিনে’ দিল্লিতে বিবেকীর হাসপাতালের মাধ্যমে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করতেন।

১৭ ১৮

উদ্ধার হওয়া শিশুগুলির আসল বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছোনোর চেষ্টা করছে পুলিশ। তাঁরা স্বেচ্ছায় শিশুদের বিক্রি করেছে, না কি তাঁদের জোর করা হয়েছে, অথবা শিশুদের চুরি করে আনা হয়েছে তা জানার জন্য পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। ডিসিপি জানিয়েছেন, পরিবারগুলি যদি নিজেদের ইচ্ছায় পাচারকারীদের কাছে শিশুদের বিক্রি করে থাকে, তবে তাঁদেরও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হবে।

১৮ ১৮

তদন্তে উঠে এসেছে, ঘামার ও তাঁর দল গত এক বছরে অন্তত ৩০টি শিশু পাচার করেছে। এই শিশুদের মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার দম্পতিদের কাছে বিক্রি করা হত। পুলিশ হরিয়ানার পানিপত থেকে সানি অরোরা ও ঋতু অরোরা নামে এক দম্পতিকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করেছে। এই দলের কাছ থেকে একটি শিশু কেনার অভিযোগে মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়রের বাসিন্দা আরও এক দম্পতিকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই পরিবারগুলিকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হবে।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement