এক হাজারেরও বেশি বছর ধরে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকা মায়া সভ্যতার একটি গোপন শহরের সন্ধান পাওয়া গেল দক্ষিণ মেক্সিকোর গভীর জঙ্গলে। এর আগে এই শহর অনাবিষ্কৃতই ছিল। থেকে গিয়েছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে।
গোপন এই শহরটিকে বিশেষজ্ঞেরা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার হিসাবে অভিহিত করছেন। বিষয়টিকে মধ্য মায়া নিম্নভূমি জুড়ে তিন দশক ধরে চলা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার এক চূড়ান্ত সাফল্য বলেও মনে করছেন গবেষকেরা।
মিনানবে নামের এই স্থানটি মেক্সিকোর ক্যাম্পেচে শহরের কালাকমুল জীববৈচিত্র সংরক্ষণ অঞ্চলের এক দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিনানবে নামটি এসেছে ‘ইউকাটেক মায়া’ ভাষার একটি শব্দগুচ্ছ থেকে, যার অর্থ ‘কোনও পথ নেই’।
ওই অনাবিষ্কৃত জায়গায় পৌঁছোতে গিয়ে গবেষকদলকে যে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা-ই প্রতিফলিত করে শহরের নামটি।
‘হেরিটেজ ডেলি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘স্লোভেনিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টস’-এর গবেষণাকেন্দ্রের প্রত্নতাত্ত্বিক ইভান স্প্রাজেকের নেতৃত্বে মেক্সিকো ও স্লোভেনীয় গবেষকদের একটি যৌথ দল এই আবিষ্কারটি করেছে।
কী খুঁজে পাওয়া গিয়েছে গোপন শহরটিতে? অভিযানের অনুমোদন প্রদানকারী সংস্থা মেক্সিকোর ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গলের মধ্যে লুকোনো শহরটিতে ৪৩ ফুট উঁচু একটি পিরামিড-মন্দির (যা প্রায় চারতলা ভবনের সমান উচ্চতার) এবং খোদাই করা ১৪টি বেদি ও স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
জানা গিয়েছে, আকাশপথে ‘লিডার’ স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে বনের আচ্ছাদনের নীচে খোঁজ চালানোর সময় প্রায় ১৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত একটি বসতির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। পরবর্তী কালে সরেজমিন অনুসন্ধানে সেখানে একটি জটিল নগরকাঠামোর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
শহরটিতে প্রাসাদোপম ধর্মীয় ভবন দ্বারা পরিবেষ্টিত চত্বর (প্লাজ়া), সিঁড়িযুক্ত চত্বর (টেরেস) এবং জলাভূমি ও জলপ্রবাহের পথ-সহ এক বিশাল জল ব্যবস্থাপনা ছিল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এ সব বৈশিষ্ট্য উচ্চ মানের নগর পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।
প্রত্নতত্ত্ববিদ ভিতান ভুজানোভিচ, যিনি তাঁর সহকর্মী আতাস্তা ফ্লোরেস এস্কুইভেল, ইসরায়েল চাতো লোপেজ় এবং কুইন্টিন হার্নান্দেজ় গোমেজ়কে নিয়ে এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করেছিলেন, তিনি নিশ্চিত করেছেন যে পিরামিড-মন্দিরটিতে ‘রিও বেক’ স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
‘রিও বেক’ মায়া সভ্যতার এমন একটি স্থাপত্যশৈলী, যা খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভুজানোভিচ বলেন, ‘‘এই প্রথম আমি এমন কোনও এমন মন্দিরের সন্ধান পেলাম যা মোটামুটি ভাল অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে।’’
ঘন জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করা, দুর্গম পথের উপযোগী যানবাহন ব্যবহার এবং চরম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় কয়েক কিলোমিটার হাঁটার মতো কঠিন যাত্রার পর প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মেক্সিকোর গভীর জঙ্গলে প্রাচীন মায়া সভ্যতার এই অক্ষত শহরের সন্ধান পান।
ওই অঞ্চলে গাছ কাটার কোনও রাস্তা বা লুটপাটের কোনও চিহ্ন না থাকায় স্থানটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই অঞ্চলে আবিষ্কৃত এটিই প্রথম সম্পূর্ণ সংরক্ষিত নিদর্শন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরটি সম্ভবত ‘লেট ক্লাসিক’ বা পরবর্তী ধ্রুপদী যুগে (খ্রিস্টীয় ৬০০-৯০০ অব্দ) সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ‘মিনানবে’ শহরের আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে লিডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা ঘন বনের আচ্ছাদনের নীচে মাটির গভীরে থাকা কাঠামো শনাক্ত করতে সক্ষম।
শহরটিতে চত্বর, পিরামিড, প্রাসাদ এবং জল ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে, যা মায়া সভ্যতা সম্পর্কে নতুন তথ্য এবং ধারণা প্রদান করছে। গবেষকদের বিশ্বাস, আরও গবেষণার মাধ্যমে এখানকার অধিবাসী, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত শহরটির পতনের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব মেক্সিকো এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকার একটি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল মায়া সভ্যতা। পৃথিবীর অসংখ্য ইতিহাসবিদের কাছে আজও এই সভ্যতা নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে। রয়েছে মতভেদও।
এই সভ্যতার বেশ কিছু আবিষ্কার চমকে দিয়েছে আধুনিক মানুষকেও। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং শল্য চিকিত্সায় যথেষ্ট উন্নতি করেছিল এই সভ্যতা। এই সভ্যতা সম্পর্কে কিছু এমন তথ্যও রয়েছে, যা আবিষ্কার করে প্রত্নতত্ত্ববিদ থেকে ইতিহাসবিদেরাও অবাক হয়ে গিয়েছেন।
সে সময় মায়া অঞ্চলের নিচু ভূমিগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষের বসবাস ছিল এবং শহরটি আঞ্চলিক কৃষি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। প্রাপ্ত প্রমাণাদি থেকে এর পরবর্তী সময়ে শহরগুলির উপর বাইরের প্রভাব বা সংঘাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার মধ্যে স্মৃতিস্তম্ভগুলির ইচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধনও অন্তর্ভুক্ত।