UCC in West Bengal

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে বিল আনছে রাজ্য, কী থাকতে পারে ওই আইনে? ঘুচবে পারিবারিক বৈষম্য?

উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসম মডেলে এ বার পশ্চিমবঙ্গেও চালু হবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। সেই লক্ষ্যে বিল আনছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। কী থাকবে ওই আইনে?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ১২:১৫
Share:
০১ ২০

প্রথমে উত্তরাখণ্ড। তার পর গুজরাত ও অসম। বিজেপি-শাসিত তিন রাজ্যে ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি)। এ বার সেই তালিকায় যুক্ত হবে পশ্চিমবঙ্গের নাম। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বিল আনার কথা বলেছেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

০২ ২০

চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে (পড়ুন সঙ্কল্পপত্র) ক্ষমতায় এলে ইউসিসি চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। ভোটে জিততেই তা পূরণ করার দিকে শুভেন্দু যে পা বাড়ালেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে অবশ্য ইতিমধ্যেই সুর চড়িয়েছে বিরোধীদের একাংশ।

Advertisement
০৩ ২০

এখন প্রশ্ন হল, কী এই ইউসিসি? এটি চালু হলে পারিবারিক আইনে আসবে সমতা? না কি খর্ব হবে ধর্মীয় স্বাধিকার? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু রয়েছে ভারতীয় সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে। সেখানে দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার জন্য রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে বলা হয়েছে।

০৪ ২০

অতীতে একাধিক মামলায় ইউসিসি চালু করার বিষয়টি ভাবার কথা সুপ্রিম কোর্টকে বলতে শোনা গিয়েছে। তবে কেন্দ্র বা রাজ্য কোনও সরকারকেই এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়নি সর্বোচ্চ আদালত। ২০২৩ সালে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে দলীয় অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বলেন, ‘‘এক একটি সম্প্রদায়ের জন্য যদি আলাদা আলাদা আইন থাকে তা হলে দেশ এগোতে পারবে না।’’

০৫ ২০

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কথাটির অর্থ হল, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন আচার-বিচারের মানুষের জন্য একটিই আইন। যেটা বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব, পারিবারিক অংশীদারি ইত্যাদি বিষয়ের আইনি সীমারেখা নির্ধারণ করবে।

০৬ ২০

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ১৫টি পারিবারিক আইন চালু রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে সেগুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। কিন্তু, এতে একাধিক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার খর্ব হবে বলে ইতিমধ্যেই আওয়াজ তুলেছে বিরোধীদের একাংশ।

০৭ ২০

স্বাধীনতার পরেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে সংবিধান সভায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। অধিকাংশ মুসলিম সদস্য জানিয়েছিলেন, বিধির প্রয়োগ হলে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ (পার্সোনাল ল) বিপন্ন হয়ে পড়বে।

০৮ ২০

এই বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদটি গ্রহণ করে সংবিধান সভা। সেখানে বলা হয়েছে, ইউসিসির প্রণয়ন এব‌ং প্রয়োগের দায়িত্ব ভবিষ্যতের সংসদ এবং সরকারের উপরে বর্তাবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) দাবি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রণয়ন একটি সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি, যা এখনও পালিত হয়নি।

০৯ ২০

২০২৪ সালে বিজেপি-শাসিত উত্তরাখণ্ডে প্রথম চালু হয় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ফলে বিয়ের পাশাপাশি ‘লিভ-ইন’ বা একত্রবাসের নথিবদ্ধকরণ বা রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ওই রাজ্যে। বিয়ে বা একত্রবাসের রেজিস্ট্রেশন না করা হলে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানার শাস্তিও রয়েছে বিধিতে। নিষিদ্ধ হয়েছে বহুবিবাহ।

১০ ২০

উত্তরাখণ্ডের পর গুজরাত ও অসম চালু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। জাত-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের জন্য বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও দত্তক সংক্রান্ত বিষয়ে একই আইন চালু করতে তিন বিজেপি-শাসিত রাজ্যের অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে মোটামুটি একই রকম নিয়ম মানা হয়েছে। তিন ক্ষেত্রেই জনজাতি সম্প্রদায়কে এর বাইরে রাখা হয়েছে।

১১ ২০

রাজনৈতিক শিবির তথা আইনজীবীরা মনে করছেন, উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসমের ‘মডেল’ মেনে পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি চালু হবে। পশ্চিমবঙ্গেও জনজাতি বা আদিবাসীদের ইউসিসি-র বাইরে রাখা হবে বলে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।

১২ ২০

উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসমে প্রথমে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির রূপায়ণ ও তার খসড়া তৈরির জন্য কমিটি তৈরি হয়। তার পরে ইউসিসি-র বিল বিধানসভায় পাশ হয়। এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও সেটা হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। ফলে বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনের মধ্যে আসতে পারে ওই বিল।

১৩ ২০

পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হলে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে জাত-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের জন্য চালু হবে একই আইন। এখন এ সব ক্ষেত্রে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি, সকলের আলাদা আইন বা রীতিনীতি রয়েছে।

১৪ ২০

উত্তরাখণ্ড, গুজরাত, অসম— তিন রাজ্যেই ইউসিসি চালু করে বিয়ের নথিবদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এত দিন বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠানটাই মূল ছিল। বিয়ের রেজিস্ট্রেশন ইচ্ছার উপরে নির্ভরশীল ছিল। এ বার তা বাধ্যতামূলক হয়েছে এই তিন রাজ্যে। সেই রাস্তায় আগামী দিনে হাঁটতে দেখা যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গকেও।

১৫ ২০

কিন্তু ওই তিন রাজ্যে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিয়ের ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারি ও ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। কারণ সাব-রেজিস্ট্রারকে বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের আর্জি খারিজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের যুক্তি, এর ফলে ১৮ বছরের কমবয়সি মেয়েদের বিয়ে, প্রতারণা রোখা যাবে।

১৬ ২০

এ ছাড়া তিন রাজ্যেই উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মের আলাদা আইন তুলে দিয়ে সম্পত্তির ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। পুত্র ও কন্যা সন্তানকে বাবা-মায়ের সম্পত্তির সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে কন্যা সন্তান বা হিন্দুদের ক্ষেত্রে স্বামীহারা স্ত্রীদের ক্ষেত্রে বৈষম্য রাখা হয়নি।

১৭ ২০

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে পারিবারিক বিষয় সংক্রান্ত অভিন্ন আইনের খসড়া তৈরিতে উদ্যোগী হয় কেন্দ্র। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন, নানা পেশার এবং শ্রেণির মানুষকে নিয়ে একশোর বেশি আলোচনা সভার আয়োজন হয়েছিল সে সময়।

১৮ ২০

২০১৭ সালে পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছিল, ব্যক্তিগত আইন সংশোধন করে মেয়েদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সেই বৈষম্য দূর করতে ২১তম আইন কমিশনের সুপারিশ ছিল, সব ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য বিয়ের নথিভুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক হোক।

১৯ ২০

পাশাপাশি, সব ধর্মে বিয়ের ন্যূনতম বয়স এক করা, দম্পতির মধ্যে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা না থাকাই বিবাহবিচ্ছেদের একমাত্র কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা এবং ধর্ম বদলে দ্বিতীয় বা বহুবিবাহ করার সুযোগ দেওয়া বন্ধ করার সুপারিশ করেছিল ওই কমিশন।

২০ ২০

পরবর্তীকালে ওই সুপারিশের উপর ভিত্তি করেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসম সরকার। এই আইন পাশ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের বিজেপি সরকারও। তার আগেই পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি চালু হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।

ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement