মুখে হুঙ্কার। মাঝেমধ্যেই যুদ্ধের হুঁশিয়ারি। খেলার মাঠে উধাও সৌজন্য করমর্দন। ‘অপারেশন সিঁদুর’-উত্তর কালে খাদে নেমেছে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক। এই আবহে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের ‘গোপন’ বৈঠকের খবর প্রকাশ্যে আসায় প্রশ্নের মুখে কেন্দ্র। তবে কি পরমাণু হামলার ভয়ে পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হল নরেন্দ্র মোদী সরকার, না কি আছে কোনও কূটনৈতিক চাল? উত্তর খুঁজছেন কূটনীতিকদের একাংশ।
পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করেনি ভারত। তবে নয়াদিল্লির একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে অন্তত দু’বার ইসলামাবাদের সঙ্গে বৈঠক করে কেন্দ্র। তাতে হাজির ছিলেন দুই দেশের কৌশলগত বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাবেক কূটনীতিক ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্তারা। নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে হয়েছে ওই আলোচনা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-পাক প্রথম বা ‘ট্র্যাক-১’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে। দ্বিতীয় দফার (পড়ুন ট্র্যাক-২) আলোচনা স্থল ছিল শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো। গত বছর (২০২৫ সাল) দুই প্রতিবেশীর সংঘর্ষবিরতি হতেই সমাজমাধ্যমে একটি ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘আগামী দিনে নিরপেক্ষ স্থানে কথা বলতে সম্মত হয়েছে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ।’’
রুবিওর ওই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাওয়ায় পাক ইস্যুতে মোদী সরকারের কড়া অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০২৫ সালের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর থেকেই সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রেখেছে নয়াদিল্লি। সেটা নিয়ে ঘন ঘন যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে ইসলামাবাদ। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে শত্রুর সঙ্গে এক টেবিলে বসার যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের কেউই।
স্বাধীনতার পর থেকে মূলত সাত-আটটা বিষয় নিয়ে ভারত-পাক সরকারকে নিয়মিত আলোচনা চালাতে দেখা গিয়েছে। সেগুলি হল, শান্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জম্মু-কাশ্মীর, সিয়াচেন, উলার বাঁধ ও তুলবুল নৌচলাচল প্রকল্প, স্যার ক্রিক খাঁড়ির সীমান্ত বিবাদ, সীমান্ত পার সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচার এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সহায়তা। ২০০৮ সালে মুম্বইয়ে ২৬/১১ জঙ্গি হামলার পর যা আনুষ্ঠানিক ভাবে বন্ধ করে নয়াদিল্লি।
২০১১ সালে পুনরায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কথা বলা শুরু করে দুই দেশ। ২০১৩ সালে জম্মু-কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসিতে (লাইন অফ কন্ট্রোল) মোতায়েন ভারতীয় ফৌজের দু’জন জওয়ানকে নৃশংস ভাবে খুন করে ইসলামাবাদ। ফলে ফের বন্ধ হয় বৈঠক। ২০১৫ সালে তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ় শরিফের নাতনির বিয়েতে আচমকাই হাজির হন মোদী। তাঁর লাহৌর সফরের পর কূটনৈতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালায় দুই প্রতিবেশী।
কিন্তু, ২০১৬ সালে পঞ্জাবের পঠানকোট বায়ুসেনা ঘাঁটিতে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিরা হামলা চালালে মোহভঙ্গ হয় ভারতের। তার পর থেকে গত ১০ বছরে আর কখনওই আলোচনার জন্য কাছাকাছি আসেনি নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ। গত বছর (২০২৫ সাল) জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পর্যটক-সহ ২৬ জনকে হত্যা করে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্ট ফ্রন্ট’ নামের একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী। তদন্তে জানা যায় পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছেন রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তারাই।
পহেলগাঁও হামলার বদলা নিতে পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় ভারত, যার সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখে নয়াদিল্লি। ওই সময় মাত্র চার দিনের মধ্যেই ইসলামাবাদের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটিকে ধ্বংস করে দেয় এ দেশের ফৌজ। ফলে তড়িঘড়ি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তারা। এর পাশাপাশি ১৯৬০ সালে পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে হওয়া সিন্ধু জলচুক্তিও স্থগিত করে মোদী প্রশাসন।
ভারতের এই সিদ্ধান্তে প্রমাদ গোনে ইসলামাবাদ। সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত হওয়ায় দেশ জুড়ে প্রবল জলসঙ্কটের আশঙ্কার কথা স্বীকার করে নেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। গত বছর (২০২৫) অবশ্য প্রবল বৃষ্টির জেরে পশ্চিমের প্রতিবেশীর বিশাল অংশ জুড়ে দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি। ফলে বিপদ এড়াতে সক্ষম হয় সেখানকার প্রশাসন। কিন্তু, ২০২৬ সালে জলের জন্য হাহাকার ইতিমধ্যেই টের পেতে শুরু করেছে তারা।
পাক গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, এ বছর সিন্ধ প্রদেশের রাজধানী তথা অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র করাচির ৭০ শতাংশ এলাকায় তীব্র আকার ধারণ করে জলসঙ্কট। ক্ষতি হয়েছে ফসলেরও। ফলে সংশ্লিষ্ট চুক্তি পুনরায় চালু করার দাবিতে সুর চড়িয়েছেন ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজ়া আসিফ। তাঁর কথায়, ‘‘সিন্ধুর জল নয়াদিল্লি আটকে রাখলে যুদ্ধ ছাড়া গতি নেই। তখন আমরাই হামলা চালাব ভারতে।’’
এর পাশাপাশি নদীর জল পেতে নতুন একটি তত্ত্ব খাড়া করেছেন পাকিস্তান পিপল্স পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান তথা সাবেক বিদেশমন্ত্রী বিলাবল ভুট্টো জারদারি। তাঁর কথায়, ‘‘আমরাই সিন্ধু সভ্যতার প্রকৃত তত্ত্বাবধায়ক। তাই সিন্ধু নদীর উপর ইসলামাবাদের ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে।’’ দেশভাগের পর থেকে এত দিন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে নিজেদের ইতিহাস বর্ণনা করে এসেছে পশ্চিমের প্রতিবেশী। আর তাই এই বদলকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
৭১২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৭ বছর বয়সে রাজা দাহিরকে হারিয়ে আজকের সিন্ধ প্রদেশটি জয় করেন আরবি সেনাপতি মহম্মদ বিন কাশেম। তাঁর ওই সামরিক সাফল্য পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম শাসকদের ভারত বিজয়ের রাস্তা খুলে দিয়েছিল। পরবর্তী কালে এই ঘটনাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় পাক সরকার। আর তাই ইসলামাবাদের স্কুল-কলেজে ইতিহাসের পাঠ্যসূচির শুরুটা হয়েছে কাশেমের সিন্ধ বিজয় দিয়েই।
কিন্তু সমস্যা হল, পাকিস্তানেই রয়েছে প্রায় ৮,০০০-৫,০০০ বছরের পুরনো সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম বড় নির্দশনস্থল ‘মহেঞ্জোদারো’। ১৯২২ সালে মাটি খুঁড়ে যা আবিষ্কার করেন বাঙালি পুরাতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৮০ সালে ওই এলাকাটিকে ‘হেরিটেজ’ আখ্যা দেয় ইউনেস্কো। তার পরও ইসলামাবাদ একে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। উল্টে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামীয় শাসনের মাহাত্ম্যই পাঠ্যসূচিতে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছে তারা।
দেশভাগের পর ‘মহেঞ্জোদারো’ নিয়ে পাক কিছুই করেনি, এমনটা নয়। ১৯৬৫ সালে নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে পেতে সেখানে খননকাজ চালান মার্কিন গবেষক জর্জ ডেলস। তার পরও সিন্ধু সভ্যতার বহু কিছু এখনও অনাবিষ্কৃতই রয়ে গিয়েছে। এ-হেন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সেখানে ফের খোঁড়াখুঁড়ির নির্দেশ দিয়েছে শাহবাজ সরকার। ইসলামাবাদের এই পদক্ষেপে দানা বাঁধছে সন্দেহ।
তা ছাড়া প্রাক্-ইসলামীয় ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলির মাহাত্ম্য হঠাৎ করেই তুলে ধরছে পাক প্রশাসন। সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিতের পর থেকে এই নিয়ে একের পর এক তথ্যচিত্র ও সেমিনারের আয়োজন করেছে ইসলামাবাদ। এর অধিকাংশই হচ্ছে সরকারি আনুকূল্যে। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়, গান্ধার ও কুষাণ সংস্কৃতি এবং বালোচিস্তানের নব্যপ্রস্তর যুগের মেহেরগড় সভ্যতার প্রত্ন নিদর্শনগুলিকে মূলত গুরুত্ব দিচ্ছে শাহবাজ় প্রশাসন।
গত এপ্রিলে বিশ্ব হেরিটেজ দিবসের একটি অনুষ্ঠানে পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বলেন, ‘‘পাকিস্তান হল সিন্ধু, মেহরগড় এবং গান্ধার সভ্যতার মিলনক্ষেত্র।’’ যদিও তাঁর এই দাবি খারিজ করেছেন আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজ়াই। তাঁর কথায়, ‘‘হিন্দুকুশের কোলে ছড়িয়ে আছে গান্ধার সভ্যতার বহু নির্দশন। ফলে ইসলামাবাদ কখনওই সেটা নিজের বলে দাবি করতে পারে না।’’
এই রাজনৈতিক তরজার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে বিশেষ প্রচার চালাচ্ছে ইসলামাবাদ। সিন্ধু সভ্যতার বহু নিদর্শন থাকার কারণে পাকিস্তানই প্রকৃত ভারত বলে আজগুবি পোস্ট করা হচ্ছে সেখানে। গোটা ঘটনার নেপথ্যে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) হাত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন এ দেশের গোয়েন্দা কর্তাদের একাংশ।
এ-হেন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি পাকিস্তান নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধান (সরসঙ্ঘচালক) মোহন ভাগবত এবং সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসবোলকে। ইসলামাবাদের সঙ্গে নয়াদিল্লির আলোচনার রাস্তা খোলা রাখা উচিত বলে মনে করেন তাঁরা। তাঁদের ওই ব্যক্তবের কয়েক দিনের মাথাতেই বাস্তবে সেটা হচ্ছে বলে সূত্র মারফত মিলল খবর।
যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রের পদস্থ আধিকারিক রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই ধরনের আলোচনা থেকে দুর্দান্ত কিছু আশা না করাই ভাল। তাঁর কথায়, ‘‘ভারত এখনও পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। বন্ধ রয়েছে দু’তরফের বাণিজ্য ও যাবতীয় কাজকর্ম। ইসলামাবাদ সীমান্ত পার সন্ত্রাস বন্ধ না করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার নয়।’’
দুঁদে কূটনীতিকদের দাবি, চরম শত্রু মনোভাবাপন্ন দুই দেশ সব সময়ই আলোচনার একটা রাস্তা খোলা রাখে। বর্তমানে সেটাই করছে ভারত ও পাকিস্তান। আগামী দিনে যুদ্ধ বাধলে এটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে দু’পক্ষই। ফলে আপাতত এই ধরনের বৈঠকগুলি থেকে যে চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই তা বলাই বাহুল্য।