চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ৩২-এর খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। বহু ফুটবলার ইতিমধ্যেই ব্যাগ গুছিয়ে মার্কিন মুলুক ছেড়ে নিজের দেশের পথে পাড়ি দিয়েছেন। কারণ প্রতিযোগিতায় হার হয়েছে তাঁদের। অনেকে এখনও সেরার লড়াইয়ে টিকে রয়েছেন।
ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপের ময়দানে নামতে গেলে যোগ্যতা থাকা যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন উক্ত দেশের নাগরিকত্ব থাকা। অর্থাৎ, কেবল ফুটবলের মাঠে বল পায়ে জাদু দেখাতে পারলেই হবে না, উক্ত দেশের নাগরিকত্ব যদি আপনার কাছে থাকে, তা হলেই সেই দেশের জাতীয় দল থেকে আপনার কাছে খেলার জন্য ডাক আসবে। নচেৎ নয়।
কিন্তু ফুটবলের এক খ্যাতনামী মিডফিল্ডারকে সে সবের পরোয়া করতে হয়নি। তিনি জীবনে তিনটি দেশের হয়ে ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু নাগরিকত্ব বদলানোর প্রয়োজন পড়েনি তাঁর। এমনটা কী করে হতে পারে, সেটাই ভাবছেন তো?
বিখ্যাত সেই ফুটবলারের নাম ডেয়ান স্ট্যানকোভিচ। ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপের ময়দানে তিনি তিনটি দেশের হয়ে মাঝমাঠ কাঁপিয়েছেন। দেশ বদলালেও, তাঁর খেলার মানে কখনও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি।
ডেয়ানের বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটে ১৯৯৮ সালে। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৯। ফ্রান্সে বসা সেই বিশ্বকাপের আসরে ডেয়ান ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোশ্লোভিয়ার জার্সি গায়ে মাঠে নামেন।
অভিষেকেই নজিরবিহীন পারফর্ম করেছিলেন ডেয়ান। জার্মানির বিরুদ্ধে গোল করেছিলেন এই মিডফিল্ডার। মূলত তাঁর পায়ের জাদুতে ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোশ্লেভিয়া শেষ ১৬ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তার পর ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহু জল গড়িয়ে যায়। বদল আসে মানচিত্রে। ডেয়ানের নাগরিকত্বেও সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে। এর পর ২০০৬ সালে জার্মানিতে সংঘটিত হওয়া বিশ্বকাপে ডেয়ান সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর হয়ে খেলেন। সেই সময় তিনি জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসাবে ময়দানে নামেন।
সেই সময় সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো আর্জেন্টিনা এবং নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েছিল। সেই কারণে বেশি দূর এগোতে পারেনি ডেয়ানের দল। বিশ্বকাপ শুরুর প্রথম দিকেই প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যায়।
২০০৪ সালে ডেয়ানের পেশাদার জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। তিনি বিখ্যাত ইটালিয়ান ফুটবল ক্লাব ইন্টার মিলানে যোগ দেন। সেই সময় ইন্টার মিলানের কোচ ছিলেন হোসে মোরিনহো। ২০১০ সালে ইন্টার মিলান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যেতে, যাতে ডেয়ানের অবদান ছিল অসামান্য।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগেই শেষ নয়। হোসে মোরিনহোর তত্ত্বাবধানে সেই বার ডেয়ান তথা ইন্টার মিলান সিরি এ (ইউরোপিয়ান লিগ) জেতে। সেই লিগে জেনোয়ার বিরুদ্ধে ডেয়ানের করা গোল ফুটবলপ্রেমীরা আজও মনে রেখে দিয়েছেন।
এরই সঙ্গে সেই বছর ইন্টার মিলান কোপা ইটালিয়াও জিতে নেয়। রোমাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে তারা। ফুটবলের ইতিহাসে তা ‘ট্রেবল’ হিসাবে পরিচিত। ফুটবলের একই সিজ়নে কোনও ক্লাবের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি জেতাই হল ‘ট্রেবল’। ডেয়ানের ঝুলিতে তা রয়েছে। ২০০৯-’১০-এর ফুটবলের সিজ়ন ডেয়ানের ফুটবলজীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় ছিল।
২০১০ সালেই ডেয়ান জীবনের শেষ বিশ্বকাপ খেলেন। সেই বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে মানচিত্রে আবার বদল আসে। সার্বিয়া স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ডেয়ান সার্বিয়ার হয়ে ফুটবলের ময়দানে নামেন।
সে বার গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ডেয়ানের দল জার্মানির মুখোমুখি হয়। সেই ম্যাচে ডেয়ানদের জিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু জার্মানিকেও তাঁরা জিততে দেননি। ম্যাচের স্কোর হয়েছিল ১-১।
কিন্তু সার্বিয়া সে বারও বেশি দূর এগোতে পারেনি। মাঝপথেই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছিল ডেয়ানের দল। তবে বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখতে না পারলেও, ডেয়ানের বিশ্বকাপযাত্রা তাঁর নিজের জন্য এবং ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে ডেয়ান সার্বিয়ান সুপারলিগা ক্লাব রেড স্টার বেলগ্রাডের কোচ। ফুটবলার হিসাবে তিনি যেমন মাঠ কাঁপাতেন, প্রশিক্ষক হিসাবেও তিনি ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। তবে কোনও নামজাদা ক্লাব বা দেশের প্রশিক্ষক হয়ে ভবিষ্যতে ফুটবলের ময়দানে ডেয়ানের আবির্ভাব ঘটবে কি না তা দেখার জন্য মুখিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা।