Sham Nath Marg bungalow

বাস করে কেউ হারিয়েছেন পদ, কেউ প্রাণ, রাজধানীর বুকে মুখ্যমন্ত্রীর ‘অভিশপ্ত বাংলো’ কেন গুঁড়িয়ে ফেলছে দিল্লি সরকার?

সবুজ-শ্যামল সিভিল লাইন্স এলাকায় অবস্থিত এই দ্বিতল বাংলোর ভবনটি ৫,৫০০ বর্গমিটারেরও বেশি জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। কী ভাবে একটি সাধারণ সরকারি আবাসন ধীরে ধীরে ‘অভিশপ্ত’ ঠিকানার তকমা পেল, তার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক ঘটনা ও জনশ্রুতি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৭:৫৭
Share:
০১ ১৯

‘ভূত বাংলো’ হিসাবে বদনাম দীর্ঘ দিনের। বছরের পর বছর ধরে দিল্লির রাজনৈতিক মহলে ৩৩ শামনাথ মার্গের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘অভিশপ্ত’ তকমা। উত্তর দিল্লিতে দীর্ঘ দিন ধরে পরিত্যক্ত ঔপনিবেশিক আমলের এই বাংলোটির সঙ্গে বেশ কিছু দুর্ভাগ্যের কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। সাধারণত এটিকে এড়িয়েই চলেন মন্ত্রী থেকে শুরু করে আমলারা পর্যন্ত।

০২ ১৯

শামনাথ মার্গের ৩৩ নম্বর বাংলো, যা ভূতুড়ে বাংলো হিসাবে কুখ্যাত। কয়েক দশক ধরে দিল্লির সিভিল লাইন্স এলাকার ৩৩ শামনাথ মার্গ রাজধানীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রহস্যময় ও আলোচিত ঠিকানা। বিশাল আকারের এই সরকারি বাংলোটি একসময় বহু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার আবাসস্থল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়িকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা কাহিনি। কিছু হেভিওয়েট বাসিন্দার আকস্মিক বিদায়, রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখজনক ঘটনার সঙ্গে এই ঠিকানাটি বার বার জড়িয়ে গিয়েছে।

Advertisement
০৩ ১৯

একসময়ের বিতর্কিত ও রহস্যে ঘেরা এই সরকারি ঠিকানা এ বার নতুন প্রশাসনিক ভূমিকায় ব্যবহার হতে চলেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিত্যক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পত্তিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। যে ঠিকানা এত দিন রাজনৈতিক গুঞ্জন ও জনশ্রুতির কারণে আলোচিত ছিল, ভবিষ্যতে সেটিই দিল্লির জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে চায় প্রশাসন।

০৪ ১৯

বহু বছর ধরে প্রায় অব্যবহৃত থাকা ৩৩ শামনাথ মার্গের ঐতিহ্যবাহী ঔপনিবেশিক আমলের বাংলোটিকে এ বার নতুন রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে দিল্লি সরকার। পুরনো ভবনটিকে ভেঙে সেখানে দিল্লি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ডিডিএমএ)-র প্রথম সদর দফতর তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে খবর।

০৫ ১৯

বাংলোটি ভেঙে নতুন প্রশাসনিক ভবন তৈরির পরিকল্পনা হলেও, তার আগেই ৩৩ শামনাথ মার্গের অস্বাভাবিক ও বিতর্কিত ইতিহাস আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কয়েক দশক ধরে এই সরকারি বাংলোটি দিল্লির রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন, কাকতালীয় ঘটনা এবং রহস্যময় গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

০৬ ১৯

কী ভাবে একটি সাধারণ সরকারি আবাসন ধীরে ধীরে ‘অভিশপ্ত’ ঠিকানার তকমা পেল, তার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক ঘটনা ও জনশ্রুতি। এখানে বসবাসকারী কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আকস্মিক পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনার সঙ্গে এই বাড়ির নাম বার বার আলোচনায় এসেছে।

০৭ ১৯

সবুজ-শ্যামল সিভিল লাইন্‌স এলাকায় অবস্থিত এই দ্বিতল বাংলোর ভবনটি ৫,৫০০ বর্গমিটারেরও বেশি জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। ১৯২০ সালে নির্মিত এই ভবনে রয়েছে সুবিশাল লন, বাগান, সম্মেলন কক্ষ এবং কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থাও। একতলা থেকে দোতলায় ওঠার জন্য রয়েছে প্রশস্ত ঘোরানো সিঁড়ি। বাংলোটিতে রয়েছে তিনটি শোয়ার ঘর, একটি বৈঠকখানা, একটি খাবার ঘর।

০৮ ১৯

স্বাধীনতার পর, দিল্লি বিধানসভার কাছাকাছি হওয়ায় বাংলোটি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পছন্দের আস্তানা হয়ে ওঠে। তবে এই বাড়িটির প্রত্যেক বাসিন্দার স্বল্পকালের বসবাসেরই ইতিহাস রয়েছে। কয়েক দশক ধরে এর বাসিন্দারা একের পর এক সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকায় ধীরে ধীরে এটি একটি ‘অলুক্ষুনে ঠিকানা’ হিসাবে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

০৯ ১৯

স্বাধীনতার পরে এই বাংলোর প্রথম বাসিন্দা হয়ে আসেন দিল্লির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী ব্রহ্ম প্রকাশ। ১৯৫২ সালে এই বাসভবনে আসেন তিনি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৫৫ সালে পদত্যাগ করেন। ‘গুড় কেলেঙ্কারি’ সংক্রান্ত বিতর্কের জেরে অকালেই দিল্লির মসনদ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে।

১০ ১৯

সেই ঘটনার প্রায় চার দশক পরে ১৯৯৩ সালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মদন লাল খুরানা এই বাংলোটিতে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু জৈন হাওয়ালা কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোর পর ১৯৯৬ সালে তাঁকেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আকস্মিক পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

১১ ১৯

তত দিনে বাংলোটিকে ঘিরে গুঞ্জন ও বিতর্কিত কাহিনি পল্লবিত হতে শুরু করে দিল্লির রাজনৈতিক মহলে। বাংলোয় বসবাসের ধারণা বদলাতে শুরু করেছিল। একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খুরানার উত্তরসূরি সাহেব সিংহ বর্মা সপরিবার সেখানে বসবাস না করার সিদ্ধান্ত নেন। এই বাংলোটিকে কেবল ক্যাম্প অফিস হিসাবে ব্যবহার করতেন তিনি।

১২ ১৯

তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। তাঁর কার্যকালও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। পেঁয়াজের আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে ১৯৯৮ সালে তাঁকেও মুখ্যমন্ত্রীর গদি ছাড়তে হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন দিল্লির প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।

১৩ ১৯

বিধানসভা থেকে মাত্র ৯১ মিটার দূরের, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় থাকা এই বাংলোটির সঙ্গে অমঙ্গল বা দুর্ভাগ্যের সংযোগ রয়েছে এই ধারণাটি আরও বদ্ধমূল হয়ে যায় ২০০৩ সালে। তৎকালীন দিল্লি সরকারের মন্ত্রী দীপ চাঁদ বন্ধু তাঁর সহযোগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিষেধ সত্ত্বেও ওই বাংলোটিতে বাস করার জন্য উঠে আসেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন নন এবং বাংলোটিতে বসবাস শুরু করেন। এর কিছু দিন পরেই তিনি ম্যানিনজাইটিসে আক্রান্ত হন। পরে হাসপাতালে মারা যান।

১৪ ১৯

পরবর্তী দশ বছর কোনও রাজনীতিবিদ বা কর্মকর্তা এই বাংলোটিকে নিজেদের বাসস্থান বানাননি। ২০১৩ সালে, ঊর্ধ্বতন আমলা শক্তি সিংহ এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনিও মাত্র চার মাস এখানে থাকতে পেরেছিলেন। পরিস্থিতির কারণে তাঁকে দিল্লি সরকার ছাড়তে হয়। ২০১৫ সালে, বাংলোটি এক নতুন বাসিন্দা পায়।

১৫ ১৯

অরবিন্দ কেজরীওয়ালের সরকার এটিকে দিল্লি ‘ডায়ালগ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমিশনের’ কার্যালয়ে রূপান্তরিত করে। এই দফতরটি দিল্লি সরকারকে নীতিগত পরামর্শ প্রদান করে। কমিশনের ভাইস-চেয়ারম্যান আশীষ খেতান জায়গাটি পছন্দ করেন এবং বাংলোটিতে কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে এই বাংলোটি তাঁর অফিসের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তিনিও তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি এবং পদত্যাগ করেন।

১৬ ১৯

তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জেসমিন শাহ। পূর্ববর্তী সরকারের বাকি মেয়াদ শেষ করার পর, তিনিও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ২০২২ সালের নভেম্বরে, দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভিকে সাক্সেনা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়ালকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পদের অপব্যবহারের অভিযোগে শাহকে পদ থেকে অপসারণ করার নির্দেশ দেন।

১৭ ১৯

বর্তমানে দিল্লিতে ডিডিএমএ-র কোনও স্বতন্ত্র সদর দফতর না থাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম একাধিক দফতরে বিভক্ত থাকার কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সব বিভাগের মধ্যে নিখুঁত ভাবে সমন্বয় করা বেশ মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। তাই দিল্লি প্রশাসন চাইছে অন্ধবিশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলার ছন্নছাড়া ব্যবস্থাকে এক ছাতার নীচে কেন্দ্রীভূত করতে।

১৮ ১৯

বাংলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পত্তির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। যে ঠিকানা প্রশাসনিক ব্যবহারের চেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক গুঞ্জন, জনশ্রুতি ও নানা কাহিনির কারণে, সেটিই এ বার নতুন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে চলেছে।

১৯ ১৯

সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ৩৩ শ্যামনাথ মার্গের পুরনো পরিচয় ধীরে ধীরে বদলে যাবে। একসময়ের আলোচিত এই বাংলো ভবিষ্যতে আর রাজনৈতিক ভাগ্য বা রহস্যের গল্পের কেন্দ্র নয়, বরং দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জননিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো হিসাবে পরিচিতি পাবে। যে ঠিকানা এত দিন রাজনৈতিক গুঞ্জন ও জনশ্রুতির কারণে আলোচিত ছিল, ভবিষ্যতে সেটিই হয়ে উঠতে পারে দিল্লির জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ছবি: সংগৃহীত, পিটিআই ও এআইসহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement