Lord of the Moon

চাঁদ, মঙ্গলে জমি বিক্রি করেন, দেন জমির দলিলও! নিজের সরকার বানিয়ে ৪৫ বছর ধরে কোটি কোটি আয় করেন হোপ

পৃথিবীতে এমনও একজন মানুষ রয়েছেন, যিনি ইতিমধ্যেই চাঁদের মালিকানা দাবি করেন এবং পৃথিবী থেকেই চন্দ্রালোকে জমি বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার আয় করেছেন। চাঁদকে নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করে চন্দ্রভূমি বিক্রির সাহস করা ওই ব্যক্তির নাম ডেনিস হোপ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১১
Share:
০১ ২০

গত ২ এপ্রিল ভোরে (ভারতীয় সময়) চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল নাসার মহাকাশযান। তাতে ছিলেন কমান্ডার রিড ওয়াইসম্যান (প্রাক্তন নৌসেনা পাইলট, ১৬৫ দিন মহাকাশে কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে), পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (নাসার ক্রু-১ অভিযানে শামিল হয়েছিলেন), অভিযান বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ (মহিলা হিসাবে সবচেয়ে বেশি সময় মহাকাশযান চালিয়েছেন) এবং জেরেমি হানসেন (কানাডার মহাকাশচারী, প্রথম বার মহাকাশে)।

০২ ২০

চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার চার নভশ্চর। ১০ দিন মহাকাশে কাটানোর পর শনিবার সকালে (ভারতীয় সময়) তাঁরা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। দক্ষিণ ক্যালিফর্নিয়ার উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে নাসার ক্যাপসুলটি। ভিতর থেকে ধীরে ধীরে চার জনকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসা হয়। নাসা এই চন্দ্রাভিযানের নাম দিয়েছিল ‘আর্টেমিস’।

Advertisement
০৩ ২০

‘আর্টেমিস ২’-এর লক্ষ্য চাঁদের মাটিতে পা রাখা ছিল না। বরং চাঁদের সামনে থেকে ঘুরে আসা ছিল। এটি তার দ্বিতীয় ধাপ। ২০২৮ সালে এই অভিযানের তৃতীয় ধাপেই চাঁদে ফের মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে নাসার। একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসাবে, দীর্ঘ পাঁচ দশক পরে চাঁদে মানুষ পাঠাচ্ছে নাসা। ১৯৬৯ সালে আমেরিকার এই সংস্থার অ্যাপোলো অভিযানেই চাঁদে প্রথম নেমেছিল মানুষ। ১৯৭২ সালে সেই অভিযান শেষ হয়। ৫৩ বছর পর ফের ‘আর্টেমিস’ অভিযানের হাত ধরে চাঁদ ছুঁতে চাইছে আমেরিকা।

০৪ ২০

তবে পৃথিবীতে এমনও একজন মানুষ রয়েছেন, যিনি ইতিমধ্যেই চাঁদের মালিকানা দাবি করে পৃথিবী থেকেই চন্দ্রালোকে জমি বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার আয় করছেন। চাঁদকে নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করে চন্দ্রভূমি বিক্রির সাহস করা ওই ব্যক্তির নাম ডেনিস হোপ।

০৫ ২০

সত্তরের দশকের শেষে ক্যালিফোর্নিয়ায় পুরনো বা ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রির ব্যবসা করতেন হোপ। তিনি তখন বিবাহবিচ্ছেদ এবং আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সময় হঠাৎই তাঁর মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। ১৯৮০ সাল থেকে চাঁদের মালিকানা দাবি করে চাঁদের জমি বিক্রি শুরু করেন তিনি। জমির দাম রেখেছিলেন সাধারণের আয়ত্তের মধ্যেই। ২৪.৯৯ মার্কিন ডলার থেকে শুরু হয় হোপের বিক্রি করা একরপ্রতি চাঁদের জমির দাম। ৫০০ ডলার এবং তার চেয়ে বেশি দামেরও জমি আছে। আবার মঙ্গল এবং অন্যান্য গ্রহের জমির দাম কিছুটা আলাদা। তবে জমি যেমনই হোক, একটি বিষয় নিশ্চিত করেছেন হোপ— সব জায়গা থেকেই পৃথিবীকে সমান ভাবে দেখা যাবে।

০৬ ২০

এ পর্যন্ত নাকি ৬০ লক্ষেরও বেশি ক্রেতাকে চাঁদের ৬১.১ কোটি একর জমি বিক্রি করেছেন হোপ। আয় করেছেন ১.২ কোটি ডলার। তাঁর দাবি, চাঁদের জমির চাহিদা ভালই। এমন নাকি অনেকেই আছেন যাঁরা জমি কিনতে বার বার ফিরে আসেন তাঁর সংস্থায়। ক্রেতার ব্যাপারে কোনও বাছবিচার নেই হোপের। তারকা থেকে সাধারণ চাকুরিজীবী— সবাই রয়েছেন তাঁর ক্রেতার তালিকায়। তাঁর দাবি, প্রায় ৭০০ জন নামী তারকা জমি কিনেছেন তাঁর কাছ থেকে। এমনকি, তিন জন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে বিক্রিও করেছেন জমি।

০৭ ২০

হোপ আগে জানিয়েছিলেন, চাঁদের সবচেয়ে বড় জমির অংশটিতে ৫৩ লক্ষ ৩২ হাজার ৭৪০ একর জায়গা আছে। যদিও সেই জমির ক্রেতা এখনও পাননি হোপ। বেশি চাহিদা ১৮০০-২০০০ একরের জমিগুলির। বেশ কিছু হোটেলও জমি কিনেছে তাঁর কাছ থেকে। হোপের সংস্থার নাম ‘লুনার এমব্যাসি’, যার বাংলা অর্থ চন্দ্র দূতাবাস। চাঁদে হোপের জায়গাজমির ‘দেখভাল’ করে এই সংস্থাটি। হোপ নিজেই সংস্থার সিইও। যদিও এই সিইও-র অর্থ ‘চিফ এক্‌জ়িকিউটিভ অফিসার’ নয়, ‘সেলেশ্চিয়াল এক্‌জ়িকিউটিভ অফিসার’। মহাজাগতিক বিশেষ অধিকর্তা। তবে নিজেকে ‘চাঁদের মালিক’ বলতেই বেশি পছন্দ করেন হোপ।

০৮ ২০

চাঁদের জমির ব্যবসার বুদ্ধি এবং রসদ দুই-ই হোপ পেয়েছিলেন তাঁর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্ঞানের দৌলতে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপুঞ্জের আনা একটি প্রস্তাবের ফাঁকই সাহায্য করেছিল হোপকে। ওই প্রস্তাবের মূল বিষয় ছিল সৌরজগতের মধ্যে থাকা মহাজাগতিক বস্তু। রাষ্ট্রপুঞ্জ বলেছিল, বিশ্বের কোনও দেশ বা কোনও দেশের সরকার সৌরজগতের কোনও মহাজাগতিক বস্তুর উপর নিজেদের অধিকার, মালিকানা বা আইনি স্বত্ব দাবি করতে পারবে না।

০৯ ২০

১৯৬৭ সালে আনা ওই প্রস্তাবে পৃথিবীর প্রায় সব ক’টি দেশ সম্মতি দিয়েছিল। তবে ওই প্রস্তাবে কিছু অসম্পূর্ণতাও ছিল। মহাজাগতিক বস্তুর উপর সরকার বা দেশের অধিকার নিয়ে কথা বললেও এমনটা কোথাও বলা ছিল না যে কোনও ব্যক্তি এই দাবি করতে পারবেন না। ১৮৬২ সালের মার্কিন হোমস্টেড অ্যাক্ট থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রস্তাবের অসম্পূর্ণতাকে কাজে লাগিয়েই চাঁদের মালিকানা দাবি করেন।

১০ ২০

সান ফ্রান্সিসকোর এক রেজিস্ট্রি অফিসে পৃথিবী এবং সূর্য ছাড়া সৌরজগতের অন্য আটটি গ্রহ এবং তাদের উপগ্রহ-সহ সমগ্র চন্দ্রপৃষ্ঠের উপর মালিকানা দাবি করে একটি নথি জমা দেন হোপ। এর পর তিনি রাষ্ট্রপুঞ্জ, আমেরিকার সরকার এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। বিজ্ঞপ্তিতে তিনি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেন, চাঁদ এবং অন্য গ্রহ এবং উপগ্রহের জমি তিনি খণ্ডে খণ্ডে ভাগ করে বিক্রি করতে চান।

১১ ২০

আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিকে লেখা সেই চিঠিতে হোপ অনুরোধ করেছিলেন, কোনও আইনি আপত্তি থাকলে যেন তাঁকে জানানো হয়। তবে চিঠির জবাব আসেনি। এর পরেই রাষ্ট্রপুঞ্জের মৌনতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে চাঁদের জমি বিক্রি করতে শুরু করেন হোপ। সেই থেকে শুরু। ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করে গত ৪৬ বছর ধরে বেশ রমরমিয়ে চলেছে হোপের চাঁদের জমির ব্যবসা। আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে খাতা-পেন-খেলনার মতোই চাঁদের জমি বিক্রির বিজ্ঞাপনী পোস্টার পড়ত। ক্রেতারা আগ্রহ দেখালেও সে সময় ‘লুনার এমব্যাসি’র কার্যকলাপকে সে ভাবে গুরুত্ব দেননি কেউ।

১২ ২০

হোপের বিক্রি করা চাঁদের জমির মালিকানার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও জমির দলিল দেওয়া হয়। এমনকি, দেওয়া হয় মৌজা-পরচার মতো আইনি নথিও। দলিলে ক্রেতাদের নাম এবং জমির বিবরণও দেওয়া থাকে। তবে কেউ জমি কিনলেও তা চোখে দেখার সুযোগ নেই। তাই দলিলের সঙ্গে ক্রেতাদের একটি করে চাঁদের মানচিত্র দেন হোপ, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন ঠিক কোন জায়গায় জমি কিনলেন।

১৩ ২০

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোপ চোখ বন্ধ করে চাঁদের মানচিত্রের দিকে এলোমেলো ভাবে আঙুল বুলিয়ে জমি বরাদ্দ করতেন। আর বেশি টাকার বিনিময়ে তিনি মঙ্গল, শুক্র, বুধ এবং এমনকি প্লুটো পর্যন্তও এই সুযোগ প্রসারিত করেছিলেন। শুরুর দিকে বিক্রি ছিল সীমিত। কিন্তু পরে মেল এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রসারিত হয়।

১৪ ২০

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জমি বিক্রির প্রক্রিয়া বৈধ হতে পারে না। তার কারণ প্রশাসন বা সরকার ছাড়া কেউ জমি বিক্রি করতে পারে না। বিষয়টি জানার পরই অবশ্য দ্রুত পদক্ষেপ করেন হোপ। নিজস্ব সরকারই তৈরি করে ফেলেন তিনি। নাম দেন ‘গ্যালাকটিক ইনডিপেন্ডেন্ট গভর্নমেন্ট’। হোপ সেই সরকারের প্রেসিডেন্ট।

১৫ ২০

২০০৯ সালে হোপের গ্যালাকটিক সরকার নাকি আমেরিকার সরকারের মান্যতা পায়। সরকার থাকলে সংবিধান লাগে, দরকার নিজস্ব মুদ্রা, পতাকা, প্রতীক-সহ আরও অনেক কিছু। হোপ সেই সবই বানিয়েছেন। তাঁর গ্যালাকটিক সরকারের নিজস্ব মূদ্রা রয়েছে। আছে নিজস্ব আইনকানুনও। এ ছাড়া লুনার এমব্যাসির নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ছাড়াও জাপান এবং কোরিয়ায় রয়েছে কার্যালয়।

১৬ ২০

আমেরিকার পূর্ব উপকূলে নেভাদায় লুনার এমব্যাসির মূল কার্যালয়। সব মিলিয়ে ডজনখানেক কর্মী কাজ করেন সেখানে। জমির চাহিদার রকমফেরে কর্মীসংখ্যা বাড়ে-কমে। ৪৬ বছরের ব্যবসায় এখন আর অবশ্য শুধু চাঁদে থেমে নেই হোপ। পৃথিবীর উপগ্রহ থেকে তাঁর ব্যবসা ছড়িয়েছে ভিন্‌গ্রহেও। একই আইনের ফাঁক গলে এখন বুধ, মঙ্গল, শুক্র, প্লুটো এমনকি বৃহস্পতির উপগ্রহ আইও-তেও জমি বিক্রি করছেন তাঁরা।

১৭ ২০

যদিও হোপের মহাকাশে জমি বিক্রির দাবিকে মহাকাশ আইন বিশেষজ্ঞেরা সর্বসম্মত ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন প্রথম থেকেই। কারণ, তাঁদের মতে এর কোনও আইনি ভিত্তি নেই। তাঁরা উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের আইন যেমন সরকারের জন্য প্রযোজ্য, তেমনই কোনও ব্যক্তি এবং সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিশেষজ্ঞেরা আরও উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের নীরবতা সম্মতির সমতুল্য নয়। কারণ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি সাধারণত ভিত্তিহীন ব্যক্তিগত আবেদন উপেক্ষা করে থাকে।

১৮ ২০

প্রকৃতপক্ষে মার্কিন আইন, যেমন ২০১৫ সালের ‘কমার্শিয়াল স্পেস লঞ্চ কম্পিটিটিভনেস অ্যাক্ট’ আমেরিকার বাসিন্দাদের মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত পণ্য, যেমন খনিজ পদার্থ, অধিকার ও বাজারজাত করার অনুমতি দিলেও, চাঁদে জমির মালিক হওয়া বা আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করার অনুমতি দেয়নি।

১৯ ২০

এই প্রেক্ষাপটে হোপের দলিলগুলিকে নেহাতই শখের জিনিস বা কৌতুকের উপহার হিসাবে দেখা যায়। বড়জোর সেগুলিকে মজা হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে কিন্তু সেগুলি চাঁদে সম্পত্তির অধিকার দেয় না বলেই দাবি বিশেষজ্ঞদের।

২০ ২০

এত বাধা এবং আইনি মর্যাদা না থাকা সত্ত্বেও হোপের ব্যবসা ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। আপাতত হোপের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই। রাষ্ট্রপুঞ্জ। লুনার এমব্যাসির মহাজাগতিক অধিকারের চিঠির জবাব যদি শেষ পর্যন্ত তারা দিয়ে দেয় এবং তাদের দাবি খারিজ করে দেয় তবে ৬০ লক্ষ বিশ্ববাসীর হাতে চাঁদ পাওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হবে।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement