Asia’s largest slum Dharavi

৯০০০ কোটি টাকার অর্থনীতি চালায় এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি, ধারাবীর একটি ঘরের ভাড়ার দামে কেনা যায় ফ্ল্যাট!

মুম্বইয়ের মূল দুই রেললাইন পশ্চিম এবং মধ্য রেলওয়ের মাঝে রয়েছে ধারাবী বস্তি। নোংরা বস্তির এঁদোগলির প্রায় অধিকাংশ ‘খোলা’য় সূর্যের আলো না পৌঁছোলেও অর্থনীতির দিক থেকে যথেষ্ট শক্তপোক্ত। মধ্য মুম্বইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ধারাবীতে চলে সমান্তরাল অথচ অঘোষিত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:০৯
Share:
০১ ১৭

বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ের মধ্যে রয়েছে আরও একটি ‘মিনি ভারত’। মধ্য মুম্বইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ধারাবী বস্তি। মোট ৫২০ একর জমি। তাতেই কোনও রকমে মাথা গুঁজে দিন গুজরান করেন ১২ লক্ষ মানুষ। এশিয়ার বৃহত্তম বস্তিগুলির তালিকায় অন্যতম ধারাবী।

০২ ১৭

নীল রঙের পলিথিনে ঢাকা হাজারে হাজারে ঝুপড়ি। তার মাঝেমাঝে ছোট ছোট পাকা বাড়ি। একতলা থেকে দোতলায় উঠতে সিঁড়ি নয়, লোহার মই ভরসা। বিদ্যুৎ, পানীয় জলের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু নিকাশি ব্যবস্থা বলে প্রায় কিছুই নেই। ধারাবীর অলিগলিতে আবর্জনা, দুর্গন্ধ নিত্যসঙ্গী। নামেই বস্তি। ধারাবীর অর্থনীতি টেক্কা দিতে পারে একাধিক ছোটখাটো দেশকেও।

Advertisement
০৩ ১৭

মধ্য মুম্বইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ধারাবীতে চলে সমান্তরাল অথচ অঘোষিত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। তাতেই আসে বাসিন্দাদের মাসের উপার্জন। মূলত চামড়া, বস্ত্র, খাবার এবং মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ধারাবীবাসী। বস্তির মধ্যেই মাটির জিনিস তৈরির কাজ হয়। চামড়া এবং বস্ত্রশিল্পের কাজও চলে ধারাবীতে। ভোর থেকে শুরু হয়ে যায় ধারাবীর ব্যবসার কাজকর্ম।

০৪ ১৭

চামড়া, জামাকাপড়, প্লাস্টিক, কার্ডবোর্ড, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান, পাউরুটি, মিষ্টি, বিস্কুট, পাঁপড় তৈরি, হরেক কিসিমের কারখানা রয়েছে এখানে। অন্তত আড়াই লক্ষ মানুষের রুজিরুটি এই ক্ষুদ্র শিল্পগুলি। এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি অর্থনীতির দিক থেকে যথেষ্ট শক্তপোক্ত। বিশাল এলাকা জুড়ে যে ব্যবসা চলে তার সরকারি হিসাব পাওয়াও বেশ কঠিন।

০৫ ১৭

ধারাবীর অর্থনীতি মূলত অসংগঠিত। কোনও সরকারি জনশুমারি বা প্রতিবেদনে এর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে বিশ্বব্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের মানববসতি কর্মসূচির (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) মতো সমীক্ষার অনুমান অনুসারে, ধারাবীর বার্ষিক ব্যবসা ১০০০ কোটি থেকে ১৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকারও বেশি।

০৬ ১৭

মুম্বইয়ে ভাগ্য গড়তে আসা শ্রমিককুলের প্রথম গন্তব্যই হল ধারাবী। ধারাবীর ছোট ছোট ঘর, এক কামরার কারখানার গোলকধাঁধার সর্পিল রাস্তা দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটার পরেই মনে হবে বেরোনোর পথ বন্ধ। অ্যাম্বুল্যান্স, পুলিশ ভ্যান, দমকল, এমনকি খাবারের অ্যাপ ডেলিভারির সরবরাহ কর্মীও এখানে ঢুকতে ইতস্তত করবেন। বিচিত্র অর্থনীতি এবং জীবনযাপন ঘিরে দিবারাত্র সরগরম ধারাবীর গলি-উঠোন-রান্নাঘর-দোকানপাট।

০৭ ১৭

মুম্বইয়ের মূল দুই রেললাইন পশ্চিম এবং মধ্য রেলওয়ের মাঝে অবস্থিত ধারাবী বস্তি। মুম্বই বিমানবন্দর থেকেও এর দূরত্ব খুব বেশি নয়। এমনকি বাণিজ্যনগরীর সবচেয়ে আলোকিত, বর্ণময় বান্দ্রা অঞ্চলও রয়েছে ধারাবী থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে। এককালে খাঁড়ি অঞ্চল বুজিয়ে তৈরি হওয়া জনপদটির বেড়া, টিন, কাঠ, পাথর, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি খুপরিগুলির ভাড়া শুনলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য।

০৮ ১৭

মৎস্যজীবী কোলি সম্প্রদায়ের মানুষ এককালে যে মাথাগোঁজার ঠাঁই তৈরি করেছিলেন কালের নিয়মে তা হাতবদল হয়েছে। কেউ ভাড়া দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ তা বিক্রি করে দিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই এখানকার অর্ধেকের হাতে আইনি কাগজ নেই। বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্সের আলো ঝলমলে বিলাসবহুল মুম্বই জীবনের ঠিক উল্টো পিঠ ধারাবী।

০৯ ১৭

এখানে ঘর ভাড়া করা ঝুপড়ির জন্য প্রশাসনের কোনও সিলমোহরের দরকার নেই। কেউ কোনও প্রশ্ন তুলতে আসেন না। ঝুপড়ির ১০০ বর্গফুটের সাধারণ ঘরগুলির ভাড়া শুরু হয় তিন হাজার টাকা থেকে। সাত হাজার টাকার ঘরও রয়েছে ধারাবীতে। ধারাবীতে ব্যবসা চালাতে গেলে অবশ্য এই টাকায় ঘর পাওয়া সম্ভব নয়।

১০ ১৭

সুষ্ঠু নিকাশিব্যবস্থা বা জলের সমস্যা থাকলেও ধারাবীতে বাণিজ্যিক ভাড়া কয়েক লক্ষ টাকা! ধারাবীর এক চর্মশিল্প ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, প্রায় ৩০০ বর্গফুটের ঘরের জন্য মাসে ১.৫ লক্ষ টাকা ভাড়া দিতে হয়। সেখানে ৩ হাজার বর্গফুটের দোকান বা কারখানার ভাড়া মাসে পাঁচ লক্ষ টাকা ছুঁইছুঁই। ছোট ছোট পায়রার খোপের মতো ঘরগুলিতে মোবিল, চামড়া, আঠা, কবাব, পাঁপড়, কর্পূরের মেলানো বিচিত্র গন্ধের সহাবস্থান। সব মিলিয়ে ধারাবীতে ছোট ছোট শিল্পের সংখ্যা ২০,০০০-এরও বেশি। কামরার কারখানা, পোশাক তৈরির ইউনিট, পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র, খাবারের ব্যবসা, সবই গড়ে ১০০-১৫০ বর্গফুট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

১১ ১৭

ধারাবীর সবচেয়ে প্রচলিত ব্যবসা— চামড়ার ব্যবসা। ধারাবীতে ৫ হাজারের বেশি ছোট ছোট শিল্পোদ্যোগী ব্যাগ, জ্যাকেট এবং মানিব্যাগ থেকে শুরু করে ঘোড়ার জিন, চাবুক, জুতো এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র তৈরি করেন। কারও কারও ৪০০ বর্গফুটের বিপণি রয়েছে ধারাবীতে। যাঁরা তুলনামূলক বড় আকারের ব্যবসা চালান তাঁদের দৈনিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার টাকা। আর ছোট ব্যবসায়ীদের ৫ হাজার টাকা। তা না হলে আকাশছোঁয়া ভাড়া মেটানো কার্যত অসম্ভব।

১২ ১৭

বস্তির কোলিওয়াড়া রোডে মাত্র ৫০০ মিটার বিস্তৃত চামড়ার বাজারটি বার্ষিক ২৫০ কোটি টাকার ব্যবসা করে বলে জানান এক ব্যবসায়ী। এ কারণে চামড়ার বাজারের ভিতরে এবং আশপাশের বাণিজ্যকেন্দ্রের দাম এবং ভাড়া উভয়ই বেশি। মূলত কানপুর এবং চেন্নাই থেকে আসে ব্যবসার কাঁচামাল। মহারাষ্ট্রের চামার সম্প্রদায় ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ এবং বিহার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষ চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

১৩ ১৭

ব্যবসার পরিধি বাড়লেও শ্রমিকদের দুরবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি চামড়ার কারিগর সুনীল সোনাওয়ানের। ধারাবীর শ্রমিকের হাতের শিল্প ইউরোপ, আমেরিকার বাজারে কদর পেলেও তাঁরা ব্যাগপিছু ২০০-৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন। চামড়ার শ্রমিকদের জন্য নেই কোনও ভর্তুকি। আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক ভর্তুকি পেলে গুচি বা প্রাডার মতো ব্র্যান্ডগুলিকে টেক্কা দিতে পারবেন ধারাবীর চর্মশিল্পী ও ব্যবসায়ীরা।

১৪ ১৭

ধারাবীর কুম্ভারওয়াড়া এশিয়ার বৃহত্তম মৃৎশিল্পের কেন্দ্রস্থল। এখানকার বাতাসে ভেজা মাটি এবং চুল্লির ধোঁয়ার গন্ধ। গুজরাতের এক হাজারেরও বেশি কুমোর পরিবার আজও এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রতি বছর ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যবসা করেন ধারাবীর মৃশিল্পীরা।

১৫ ১৭

ধারাবীর সবচেয়ে বড় অথচ অখ্যাত ব্যবসাটি হল বাতিল এবং পুরনো জিনিসের কেনাবেচা। ধাতু, প্লাস্টিক, কাগজ, মরচে পড়া চামচ থেকে শুরু করে পুরনো ল্যাম্বরঘিনির কাঠামো— সবই বেচাকেনা চলে এখানে। মুম্বইয়ের ৮০ শতাংশ কঠিন বর্জ্য (প্রায় ২০,০০০ টন) ব্যবস্থাপনা করেন এই বস্তির কয়েক লক্ষ আবর্জনা সংগ্রহকারী। চিকিৎসা বর্জ্য থেকে শুরু করে ধারালো জিনিসপত্র সংগ্রহ চলে অবলীলায়। সুরক্ষাকবচ বলতে ছে়ঁড়া জুতো। সারা দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর ডিলার ব্যবসায়ীদের আয় হয় ১০০০ থেকে ৪০০০ হাজার টাকা। আবর্জনা সংগ্রহকারীরা পান তার ১০ শতাংশ। ১০০ থেকে ৪০০ টাকা দিনে আয় করেন ধারাবীর অখ্যাত ‘নায়কেরা’।

১৬ ১৭

এই বস্তি এলাকায় প্রতি ১৪৫০ জনের জন্য বরাদ্দ একটি করে শৌচাগার। ধারাবী বস্তির অন্দরমহল অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর। নানা সময় নানা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে এই ধারাবীতে। ১৮৯৬-এর প্লেগ থেকে শুরু করে ২০২০-র করোনা, বার বার বিপর্যস্ত হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি। ’৯৬-এর প্লেগে ধারাবী-সহ গোটা মুম্বইয়ের অর্ধেক মানুষ মারা গিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়।

১৭ ১৭

ধারাবীর নোংরা বস্তির এঁদোগলির প্রায় অধিকাংশ ‘খোলা’য় সূর্যের আলো পৌঁছোয় না। ধারাবীর বাসিন্দারা প্রকৃতির স্বাভাবিক অংশ বলে ময়লা পূতিগন্ধময় পরিবেশকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করেন। এই রূপ নিয়েই হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি চাকা ৩৬৫ দিন ঘুরে চলে ধারাবীতে। তাই এখানকার বাসিন্দাদের জবানিতে বলা চলে ধারাবীর চেহারা নর্দমার মতো হলেও সেই নর্দমা আসলে সোনা দিয়ে তৈরি।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement