ইরান যুদ্ধের মধ্যেই আমেরিকার তেল শোধনাগারে বিস্ফোরণ! বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে খাক যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। প্রাথমিক তদন্তে দু’টি ঘটনাকেই ‘সামান্য দুর্ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। যদিও তা মানতে নারাজ দুঁদে গোয়েন্দাকর্তাদের একাংশ। উল্টে জঙ্গি হামলার সঙ্গে তুলনা টেনে সরকারকে সতর্ক করেছেন তাঁরা। এই দুই ঘটনায় তেহরান মদতপুষ্ট ‘স্লিপার সেল’-এর হাত থাকার আশঙ্কা প্রবল। সেই অনুমান সত্যি হলে ওয়াশিংটনের চিন্তা যে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের ২৪ মার্চ সকাল ৯টা নাগাদ আচমকাই প্রবল বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের পোর্ট আর্থার এলাকার ভ্যালেরি তেল শোধনাগার। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, এর জেরে আশপাশের আবাসনগুলিও কেঁপে ওঠে। মুহূর্তে খসে পড়ে জানলার কাচ। শুধু তা-ই নয়, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হওয়ার পরও সেখান থেকে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া আকাশে উঠতে দেখা গিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে টেক্সাসের পোর্ট আর্থারে অবস্থিত ভ্যালেরো শোধনাগারটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এর দৈনিক জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষমতা প্রায় ৩.৮ লক্ষ ব্যারেল। এলাকাবাসীদের দাবি, সেখানে হওয়া বিস্ফোরণের শব্দ প্রায় ১৭ কিমি দূর থেকে শোনা গিয়েছিল। ফলে তড়িঘড়ি স্থানীয়দের নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলে মার্কিন প্রশাসন। সম্পূর্ণ খালি করা হয় ওই শোধনাগারও। তবে আশার কথা হল, এই ঘটনায় হতাহতের কোনও খবর নেই।
টেক্সাসের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকাশ্যে আসে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া প্রদেশের ঐতিহাসিক ফ্লয়েড কাউন্টি আদালতের অগ্নিকাণ্ডের খবর। মার্কিন গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, গত ২৪ মার্চ দুপুরের দিকে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীনই ওই ভবনে আগুন লেগে যায়। মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে সেটা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আদালত চত্বরে আটকে পড়েন বিচারক, আইনজীবী-সহ বেশ কয়েক জন। দমকল এসে তাঁদের উদ্ধার করে। যদিও আগুনের লেলিহান শিখা থেকে শতাব্দীপ্রাচীন ভবনটিকে বাঁচানো যায়নি।
১৮৯২ সালে জর্জিয়ার রোম শহরের ওয়েস্ট ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে ঐতিহাসিক ফ্লয়েড কাউন্টি আদালত চালু করে আমেরিকা। এই ভবনের ভিতরেই ছিল কর কমিশনারের (ট্যাক্স কমিশনার) দফতর। বিধ্বংসী আগুনে সেখানকার সমস্ত নথি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই ‘বিচার বিভাগীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। আগুন নেভার পর সেখানে সীমিত প্রবেশাধিকারের অনুমতি দিয়েছে দমকল। ভবনটি অত্যন্ত পুরনো হওয়ায় সেটা ধসে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া থেকে টেক্সাসের দূরত্ব প্রায় ১,৫৫০ কিলোমিটার। সড়কপথে গাড়িতে এক প্রদেশ থেকে অপরটিতে যেতে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে দু’টি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু, তার পরেও কাকতালীয় ভাবে একই দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দু’টি জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এ কথা মানতে চাইছেন না দুঁদে গোয়েন্দাদের একাংশ। ফলে উঠছে এর পিছনে ইরানি ‘ঘুমন্ত কোষ’-এর হাত থাকার জল্পনা।
এখন প্রশ্ন হল, কী এই ‘স্লিপার সেল’? গোয়েন্দাকর্তাদের দাবি, এটা প্রকৃতপক্ষে সুপ্ত অবস্থায় থাকা এক বা একাধিক সন্ত্রাসী বা কোনও নাশকতামূলক গোষ্ঠী, যাঁরা কোনও একটা দেশের আমজনতার সঙ্গে মিশে বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকে। ফলে তাদের নিয়ে কোনও সন্দেহ তৈরি হয় না প্রশাসনের। এর পর একটা সময় হ্যান্ডলার মারফত সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ পায় তারা। সঙ্গে সঙ্গে যে রাষ্ট্রে থাকছিল সেখানেই বড় আকারের জঙ্গি হামলা ঘটিয়ে ফেলে এই ‘স্লিপার সেল’।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন ফৌজ ইরানকে নিশানা করলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। ওই দিনই তাদের যৌথ অভিযানে নিহত হন সাবেক পারস্যের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর মৃত্যুতে বদলার আগুনে ফুঁসে ওঠে তেহরান। আর ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাঘাত শানাতে ইরানের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমেরিকার ‘এবিসি নিউজ়’।
মার্কিন গণমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর বিভিন্ন দেশে গোপনে বার্তা পাঠায় তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানি আধাসেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। সেই ফরমানে ‘ঘুমন্ত কোষ’গুলিকে জেগে ওঠার নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। সংশ্লিষ্ট গোপন বার্তাটি ইতিমধ্যেই হাতে পেয়েছে আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ। তবে তার সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করতে পারেনি তারা। এই রিপোর্ট প্রকাশের চার সপ্তাহের মাথায় টেক্সাস-জর্জিয়ায় বিধ্বংসী আগুন লাগায় দানা বাঁধছে সন্দেহ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে ‘এবিসি নিউজ়’ আরও জানিয়েছে, সাধারণত এই ধরনের বার্তা যাদের পাঠানো হয়, তারা এর পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম। মূলত বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীগুলি দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য এই বন্দোবস্ত করে থাকে। এই ভাবে গোপন বার্তা পাঠানোর সুবিধা হল, প্রেরক এবং প্রাপক— কোনও পক্ষকেই ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্কের উপর ভরসা করতে হয় না। ফলে গোপন তথ্য তৃতীয় পক্ষের হাতে পড়ার আশঙ্কা কম।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, বিশেষ একটি রণকৌশলের উপর ভিত্তি করে ইজ়রায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করছে আইআরজিসি। সেই লক্ষ্যে লড়াইয়ের গোড়াতেই ‘হরমুজ় প্রণালী’ অবরুদ্ধ করে তারা। পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের মধ্যবর্তী ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার যাবতীয় আরব রাষ্ট্র। ইরানি ফৌজ সেটা বন্ধ করায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে পেট্রোপণ্যের দাম।
এ ছাড়া প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে হামলা চালানোর অভিযোগও উঠেছে তেহরানের বিরুদ্ধে। সেই তালিকায় আছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আরামকোর মালিকানাধীনে থাকা রাস তানুরা তৈল শোধনাগার, কাতারের রাস লাফানের এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) উৎপাদন কেন্দ্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ফুজাইরাহ ও মুসাফাহ তেল টার্মিনাল। প্রতিটা জায়গাতেই ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন আছড়ে পড়ার খবর পাওয়া গিয়েছে।
লড়াইয়ের গোড়ার দিকে ওমানের দুকম বন্দরে জ্বালানি ট্যাঙ্ক এবং ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালায় ইরানি আইআরজিসি। ফলে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। তাদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সালালাহ বন্দর। জ্বালানি পরিবহণের জন্য এই বন্দর বহুল পরিমাণে ব্যবহার করে থাকে ওমান। পরে এ প্রসঙ্গে একটি বিবৃতিতে তেহরানের শিয়া ফৌজের এক কমান্ডার বলেন, ‘‘বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দর ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলারে নিয়ে যাব আমরা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেটা দুঃস্বপ্নের।’’
ইরানি ফৌজ হরমুজ় প্রণালী বন্ধ রাখায় বিশ্ব জুড়ে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কা। ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের উপর বাড়ছে চাপ। এ-হেন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর কথায়, ‘‘হরমুজ় বন্ধ থাকায় আমাদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে।’’ তাঁর এই মন্তব্য টেক্সাসের শোধনাগারে হামলা চালাতে ইরানি ‘স্লিপার সেল’কে উৎসাহিত করতে পারে, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
গোয়েন্দাকর্তাদের দাবি, আমেরিকার ভিতরে যে কোনও জায়গায় থাকতে পারে তেহরানের ‘ঘুমন্ত কোষ’। সেটা কোনও ছোট ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মী, তদন্ত সংস্থা ‘ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’ বা এফবিআইয়ের অফিসার এমনকি ফৌজি আধিকারিক হলেও বলার কিছু নেই। এই সন্দেহ সঠিক হলে আগামী দিনে বড় সড় নাশকতার মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তাই টেক্সাস ও জর্জিয়ার ঘটনাকে হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়।
তবে এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। সৌদি আরব-সহ পশ্চিম এশিয়ার একাধিক আরব রাষ্ট্রে তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে হামলার ঘটনাকে ইতিমধ্যেই ‘ইজ়রায়েলি চক্রান্ত’ বলে উল্লেখ করেছে তেহরান। ইরানি বিদেশ মন্ত্রকের দাবি, উপসাগরীয় দেশগুলিকে যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন চালাচ্ছে ইহুদি ফৌজ। পাশাপাশি, আমেরিকার ভিতরেও একই রকমের ‘মিথ্যা অভিযান’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সাবেক পারস্যের প্রশাসন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুকে ভয়ঙ্কর হামলা চালায় কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়দা। যাত্রিবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) জোড়া বহুতলে ধাক্কা মারে তাদের আত্মঘাতী জঙ্গিবাহিনী। ফলে চোখের নিমেষে গুঁড়িয়ে যায় ওই দু’টি ইমারত। একই কায়দায় আক্রমণ হয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনেও।
৯/১১ হামলায় ১৯ সন্ত্রাসবাদী এবং ২,৯৭৭ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গোটা ঘটনার ‘মূলচক্রী’ হিসাবে আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে চিহ্নিত করে আমেরিকা। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় ওয়াশিংটন। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে লাদেনকে নিকেশ করে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এই ঘটনাকে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ বলেই আখ্যা দিয়েছে ইরান।
জর্জিয়া ও টেক্সাসের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে অবশ্য সরকারি ভাবে বিবৃতি দেয়নি তেহরান। অন্য দিকে ইরানে চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি আমেরিকা নিচ্ছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সাবেক পারস্যের আশপাশে পশ্চিম এশিয়ার উপকূল সংলগ্ন এলাকায় ‘চালকবিহীন ড্রোন বোট’ নামিয়েছে পেন্টাগন। সেগুলি আবার ‘আত্মঘাতী’ হামলায় সক্ষম। জোড়া অগ্নিকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে এই আয়োজন? উঠছে সেই প্রশ্নও।