শপথ নেওয়া ইস্তক নিজেকে ‘পিস’ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তুলে ধরেছেন তিনি। গত এক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার কম চেষ্টা করতে দেখা যায়নি তাঁকে। নিজেই বলেছেন, তাঁর কথায় থেমেছে ভারত-পাকিস্তান সহ মোট আটটি যুদ্ধ। আর তাই নোবেল শান্তি পুরস্কারের তিনি যে অন্যতম দাবিদার প্রকাশ্যে সে কথা বলতে এক বারও কুণ্ঠা বোধ করেননি ‘সুপার পাওয়ার’ দেশের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক। কিন্তু, সময়ের চাকা ঘুরতেই আসল রূপ বেরিয়ে এল তাঁর। শান্তির রাস্তা ছেড়ে লড়াইয়ের ময়দানে ঝাঁপাতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে।
তিনি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নেতৃত্বে নতুন বছরের শুরুটা ভেনেজ়ুয়েলা আক্রমণের মধ্যে দিয়ে শুরু করল ওয়াশিংটনের ফৌজ। সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে নিউ ইয়র্ক শহরে উড়িয়ে এনেছে তারা। কয়েক ঘণ্টার সামরিক অভিযানে ল্যাটিন (পড়ুন দক্ষিণ) আমেরিকার দেশটির ‘দখল’ নেওয়ার কাজ শেষ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা যে এখনই ব্যারাকে ফিরছে, এমনটা নয়। কারণ, ট্রাম্প যে ভাবে সুর চড়াচ্ছেন তাতে এ বছর তাঁর বাহিনী অন্তত চারটি দেশের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
মাদুরো গ্রেফতারের পরই নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট। সেখানে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মিলিয়ে মোট তিনটি দেশকে কার্যত হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তাঁর ‘বিষ নজরে’ থাকা ওই তিন রাষ্ট্র হল, মেক্সিকো, কলম্বিয়া এবং কিউবা। মাদকপাচার এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ওয়াশিংটনের ট্রাম্প সরকার যে কোনও রকম আপস করবে না, তখনই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, ‘‘মাদক সন্ত্রাস নিয়ে ভেনেজ়ুয়েলাকে বার বার সতর্ক করেছি। কিন্তু তাতে কোনও কাজ হয়নি। সেই কারণেই ওদের বিরুদ্ধে বড় কিছু করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। একই কথা মেক্সিকো, কলম্বিয়া এবং কিউবার ক্ষেত্রেও সত্যি। মাদক সন্ত্রাস রুখতে যদি ওই এলাকায় আমেরিকাকে পা রাখতে হয়, প্রয়োজনে সেটা করতেও আমরা প্রস্তুত। আর এর জন্য কারও চোখরাঙানি মেনে নেব না।’’
দ্বিতীয় বারের জন্য ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মেক্সিকোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সংঘাত চরমে পৌঁছেছে। এর নেপথ্যে মূলত শরণার্থী অনুপ্রবেশ। অতীতেও এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দক্ষিণের প্রতিবেশীকে হুমকি দিতে দেখা গিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমেরিকায় শরণার্থী অনুপ্রবেশ আটকাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ করুক মেক্সিকোর সরকার। নইলে তাদের ফল ভুগতে হবে।’’
২০২৪ সাল থেকে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট পদে আছে ক্লডিয়া শিনবম পার্ডো। তাঁর সঙ্গে বর্তমানে ট্রাম্পের সম্পর্ক ‘সাপে-নেউলে’ বললে অত্যুক্তি হবে না। অনুপ্রবেশ ইস্যুকে বাদ দিলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেপরোয়া শুল্কনীতির অন্যতম বড় সমালোচক ক্লডিয়া। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সালের) এপ্রিলে তা চালু করেন ট্রাম্প। এর জেরে আমেরিকার বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে মেক্সিকোর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের। ফলে আর্থিক দিক থেকে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।
প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথম জমানাতেও (২০১৭-’১৯ সাল) ট্রাম্পের সঙ্গে মেক্সিকোর সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট অম্ল-মধুর। ওই সময় অবৈধ অভিবাসন এবং মাদক কারবারের রমরমা নিয়ে দক্ষিণের প্রতিবেশীকে বার বার সতর্ক করেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, মেক্সিকো সীমান্তে উঁচু পাঁচিল তোলার কাজও চালাচ্ছিল তাঁর সরকার। পরবর্তী কালে অবশ্য পার্ডো সম্পর্কে কোনও বিষোদ্গার করতে দেখা যায়নি তাঁকে। উল্টে গণমাধ্যমের সামনে তাঁর প্রশংসাই করেছেন রিপাবলিকান দলের যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট।
গত বছর একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘‘পার্ডো খুব ভাল মানুষ। আমরা বেশ ভাল বন্ধু। কিন্তু সমস্যা হল মেক্সিকোকে উনি পরিচালনা করছেন না। দেশটাকে চালাচ্ছে কিছু মাদক ব্যবসায়ী।’’ ভেনেজ়ুয়েলায় তাঁর আগ্রাসী পদক্ষেপকে অবশ্য একেবারেই ভাল চোখে দেখেননি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট। কারাকাসে মার্কিন সামরিক অভিযানের কড়া নিন্দা করেছেন তিনি। এর পর ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি আসায় নতুন করে পরিস্থিতি জটিল হল বলে মনে করা হচ্ছে।
ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের জেরে মেক্সিকোর পাশাপাশি চাপ বেড়েছে কলম্বিয়ার উপরেও। সেখানকার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোকে পরোক্ষে ‘মাদক সম্রাট’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দাবি, পেট্রোর কোকেন তৈরির একাধিক কারখানা আছে। চোরাপথে সে সব পাঠানো হচ্ছে আমেরিকায়। সেই কারণে কলম্বিয়ায় প্রেসিডেন্টকে শিক্ষা দিতে চাইছেন তিনি।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল কিউবার। সেখানকার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ়-কানেলকে ‘ব্যর্থ শাসক’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, ‘‘হাভানার পরিস্থিতি এখন ভাল নয়। সেখানকার প্রশাসনিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। কিউবার জনগণের জন্য সেটা মোটেই সুখকর নয়। বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ শাসকের জন্য তাঁদের ফল ভোগ করতে হচ্ছে। এ বার কিউবাবাসীকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে।’’
২০২৫ সালের শেষ সপ্তাহ থেকে মুদ্রাস্ফীতি এবং মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয় ইরান। রাজধানী তেহরান-সহ সাবেক পারস্য দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে চলছে গণবিক্ষোভ, যা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিয়া মুলুকটির পুলিশ-প্রশাসনকে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে সাত জনের। নিহতদের মধ্যে এক জন পুলিশকর্মীও রয়েছেন। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই সাবেক পারস্য দেশটিকে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ইরান ইস্যুতে মুখ খোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ করা পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘‘নিরীহ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে নির্মম ভাবে হত্যা করলে চুপ করে বসে থাকবে না আমেরিকা। এটাই ওদের রীতি। আমরা তখন বাঁচাতে যাব। এর জন্য আমরা তৈরি আছি।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পর দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় হইচই।
ট্রাম্প যে সমস্ত দেশকে হুমকি দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার অতীত অভিজ্ঞতা আছে মার্কিন ফৌজের। উদাহরণ হিসাবে প্রথমেই মেক্সিকোর কথা বলা যেতে পারে। ১৮৪৫ সালে টেক্সাস অধিগ্রহণ করে আমেরিকা। ওই সময় সেটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে টেক্সাসের উপর মেক্সিকোর প্রভাব ছিল ষোলো আনা। শুধু তা-ই নয়, সেখানকার শাসকেরা টেক্সাসকে মেক্সিকোর অংশ বলেই মনে করতেন।
টেক্সাসের উপর মার্কিন দখলদারি তাই মেক্সিকো মেনে নেয়নি। ১৮৪৬ সালের এপ্রিল মাসে এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বেধে যায় যুদ্ধ, যা পরবর্তী দু’বছর চলেছিল। ১৮৪৮ সালে শেষ পর্যন্ত টেক্সাসের উপর আমেরিকার সার্বভৌম অধিকার মেনে নেয় পরাজিত মেক্সিকোর বাহিনী। একাধিক সামরিক চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শেষ হয় লড়াই।
১৮৯৮ সালে স্পেনের হাত থেকে কিউবাকে মুক্ত করতে বড় ভূমিকা নেয় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। পরবর্তী দশকগুলিতে হাভানার সরকারের উপর যথেষ্ট প্রভাব ছিল আমেরিকার। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর (১৯৩৯-’৪৫) পৃথিবীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) কমিউনিস্ট মতাদর্শকে আপন করতে থাকেন সেখানকার বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাতে থাকেন দুই কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গেভারা।
কিউবায় কমিউনিস্ট প্রভাব শেষ করতে ১৯৬১ সালে পিগস উপসাগরে সামরিক অভিযান চালায় আমেরিকার বাহিনী। কিন্তু তাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পর্দার আড়ালে থেকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে বিপদ কেটে যাওয়ার পর মস্কোর সঙ্গে আরও সুসম্পর্ক তৈরি হয় হাভানার। এতে মার্কিন সরকারের কপালের চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হয়েছিল।
১৯৭৯ সালে ‘ইসলামিক বিপ্লব’-এর জেরে ইরানে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। শিয়া ধর্মগুরুদের শাসনে চলে যায় পারস্য উপসাগরের ওই দেশ। তাঁরা ক্ষমতায় আসতেই তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ, ইরানের শেষ শাহ (পড়ুন রাজা) মহম্মদ রেজা পহেলভি ছিলেন পুরোপুরি ভাবে আমেরিকাপন্থী। ওই বছরই তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিবিদ ও কর্মী মিলিয়ে মোট ৫২ জনকে পণবন্দি করে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
আটক কূটনীতিবিদদের উদ্ধার করতে ১৯৮০ সালে কমান্ডো অভিযান চালায় আমেরিকা। এর কোড নাম ছিল ‘অপারেশন ইগল ক্লজ়’। কিন্তু এতেও ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। মরু ঝড়ের মুখে পড়ায় ভেঙে গিয়েছিল মার্কিন সামরিক কপ্টার। পরে অবশ্য কূটনৈতিক পথে পণবন্দিদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল ওয়াশিংটন। ওই ঘটনার পর থেকে বহু বার সাবেক পারস্য দেশের সরকার বদলের চেষ্টা চালিয়েছে আমেরিকার গুপ্তচরবাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএ। কিন্তু, এখনও পর্যন্ত তাতে সাফল্যের মুখ দেখেনি তারা।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বিমানবাহিনী। এর পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানকে আটকাতে পারেনি তেহরান। পাল্টা পশ্চিম এশিয়ার আমেরিকার বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল শিয়া ফৌজ। সেগুলিকে অবশ্য মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করে ওয়াশিংটনের এয়ার ডিফেন্স।
গত ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টো নাগাদ) ভেনেজ়ুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ঢুকে হামলা চালায় আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। আক্রমণ চলাকালীন সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেফতার করে তুলে নিয়ে আসে তারা। এই সামরিক অভিযানের কোড নাম ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’ (পরম সংকল্প) রেখেছে আমেরিকা। পরে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে সে কথা জানিয়ে দেন ট্রাম্প। এ বছর মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কিউবা এবং ইরানের মতো দেশগুলির সঙ্গে লড়াইয়ে জড়ালে তাঁর শান্তিকামী ভাবমূর্তি যে ক্ষুণ্ণ হবে, তা বলাই বাহুল্য।