টেলিভিশনের পর্দায় আদ্যোপান্ত পারিবারিক কাহিনি ফুটিয়ে তুলে ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন একতা কপূর। সেই মেয়েই আবার বিপরীত রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলেন। একের পর এক রগরগে যৌনদৃশ্যে ভরপুর সিরিজ় তৈরি করে আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছিল তাঁকে। বার বার বিতর্কে জড়ানোর পর কী জানালেন একতা?
বিনোদন জগতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান পেয়েছিলেন একতা। ২০২১ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের হাত থেকে এই পদক গ্রহণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সমাজে নিজের ভাবমূর্তি নিজেই নষ্ট করেছেন একতা। এমনটাই দাবি করেছিলেন একতার তারকা-পিতা জীতেন্দ্র।
২০১৭ সালের এপ্রিলে একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একতা। বিনোদনজগতের নতুন শাখায় পা রাখার সময় একতা জানিয়েছিলেন, টেলিভিশনে যে সব সাহসী বা ভিন্নধর্মী গল্প বলা সম্ভব হয় না, সেগুলো দেখানোর জন্যই তিনি এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন। পরে সেই বিষয়বস্তুগুলি নিয়েই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সেই ওটিটির পর্দায় মুক্তি পেয়েছিল ‘ট্রিপল এক্স’ ওয়েব সিরিজের প্রথম পর্ব। সিরিজ়ের দ্বিতীয় পর্ব মুক্তি পায় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তার পর থেকেই বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করে।
এই ওয়েব সিরিজ়ের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, দেশের সেনাবাহিনীকে অপমান এবং জওয়ানদের পরিবারের ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে। মূলত দ্বিতীয় পর্বের কিছু ‘আপত্তিকর দৃশ্য’ নিয়েই বিতর্কের সূত্রপাত। ‘ট্রিপল এক্স’-এর দ্বিতীয় পর্বে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত এক জওয়ানের স্ত্রীর বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কাহিনি দেখানো হয়।
অভিযোগ, চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে যৌনদৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে সিরিজ় নির্মাতারা সেনার উর্দিকেও অপমান করেছেন। ওয়েব সিরিজ়ের কাহিনি অনুযায়ী, জওয়ান যখন দেশের কাজে নিয়োজিত, তখন তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী পরকীয়া সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন। এই চিত্রনাট্যের বিরুদ্ধেও আপত্তি উঠেছে।
একতা প্রযোজিত এই ওয়েব সিরিজ়ের বিরুদ্ধে ২০২০ সালে বিহারের বেগুসরাই আদালতে মামলা করেছিলেন প্রাক্তন সেনাকর্তা শম্ভু কুমার। তাঁর অভিযোগ, এই ওয়েব সিরিজ়ে এক জওয়ানের স্ত্রীকে নিয়ে একাধিক ‘আপত্তিকর দৃশ্য’ দেখানো হয়েছে। ভারতীয় সেনার পক্ষে এই দৃশ্য ‘লজ্জাজনক’ বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
আদালতে শম্ভু কুমার জানিয়েছিলেন, জওয়ানেরা দেশের সুরক্ষার জন্য নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করে কর্তব্য পালন করেন। তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করে একতার ওয়েব সিরিজ়ে বিপরীত মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। এই দৃশ্যগুলি দেশের মানুষের সামনে সেনার মাথা হেঁট করে দিচ্ছে বলে দাবি করেছিলেন শম্ভু।
প্রাক্তন সেনাকর্তার অভিযোগের ভিত্তিতে একতা এবং তাঁর মা শোভা কপূরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল বেগুসরাই আদালত। বিতর্কের কথা জানার পরেই একতা ‘ট্রিপল এক্স’ থেকে ওই ‘আপত্তিকর দৃশ্য’ বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তবে তাতে বিতর্ক থামেনি।
বেগুসরাই আদালতে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে একতার আইনজীবী মুকুল রোহতগি প্রথমে পটনা হাই কোর্টে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে দ্রুত বিচার পাওয়ার আশা না থাকায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি।
একতার আইনজীবীর বক্তব্য, নির্দিষ্ট ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন থাকলে তবেই ‘ট্রিপল এক্স’ দেখা যাবে। তাই এই সিরিজ় চাইলেই সকলে দেখতে পাবেন না। ‘ট্রিপল এক্স’ দেখবেন কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দর্শকের রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট একতা কপূরকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিল।
বেঞ্চের তরফে বলা হয়েছিল, ‘‘আদালতে সাধারণ মানুষ বিচারের জন্য আসেন। যাঁদের শেষ সম্বল আদালত, তাঁরাই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। যাঁরা তথাকথিত ‘আলোকপ্রাপ্ত’, তাঁরা যদি বিচার না পান, তা হলে সাধারণ মানুষ কী করবে!’’ একতা যে ‘তরুণ প্রজন্মকে কলুষিত করছেন’ তা-ও জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।
এমনকি, ২০২৪ সালের শেষের দিকে কয়েকটি সিরিজ়ে নাবালিকা চরিত্রকে আপত্তিকর দৃশ্যে দেখানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পকসো আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মুম্বই পুলিশ এই বিষয়ে তদন্তও শুরু করে।
ক্রমাগত আইনি চাপ এবং বিতর্কের মুখে একতা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছিলেন। ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে একতা এবং শোভা নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন। একতা জানিয়েছিলেন, এর ফলে তিনি ছবি এবং ধারাবাহিকের কাজে সময় দিতে পারবেন।
সম্প্রতি আবার অন্য সুরে গান গাইলেন একতা। তাঁর দাবি, এই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার সিদ্ধান্তে তিনি জীতেন্দ্র এবং শোভার সমর্থন পাননি। জীতেন্দ্র নাকি বার বার কটাক্ষ করতেন একতাকে।
একতার উদ্দেশে জীতেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, ‘‘তুমি পদ্মশ্রী সম্মান পেয়েছ। সমাজে তোমার একটি ভাবমূর্তি রয়েছে। অশ্লীল জিনিস বানাতে তোমার কি এক ফোঁটাও লজ্জা করছে না? নিজের ভাবমূর্তি নিজেই নষ্ট করছ তুমি।’’
বাবার কাছে বার বার কটাক্ষের শিকার হতে আর ভাল লাগছিল না একতার। তাই সমুদ্রে নেমেও মাঝসমুদ্র থেকে সাঁতার কেটে আবার পারে ফিরে আসেন তিনি। একতা এবং শোভার পরিবর্তে বর্তমানে বিবেক কোকা সামগ্রিক ভাবে প্ল্যাটফর্মটির কাজ দেখাশোনা করছেন। একটি পারিবারিক বিনোদন প্ল্যাটফর্ম হিসাবে অ্যাপটিকে নতুন ভাবে সাজানোর চেষ্টা করা চলছে।