রাস্তার মাঝে কোনও ক্রমে দাঁড়িয়ে টলছেন তরুণ-তরুণী। কারও আবার শিরদাঁড়া সোজা রাখতেও করতে হচ্ছে সীমাহীন কষ্ট। চোখে-মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ। কারও গায়ে গভীর ক্ষতের চিহ্ন। গত কয়েক দিনে এমন বহু ভিডিয়োয় ভরে গিয়েছে সমাজমাধ্যম। সব ক্ষেত্রে একটা নামই উঠে এসেছে, ‘জ়ম্বি ড্রাগ’।
পঞ্জাব থেকে বিহার, মহারাষ্ট্র— ইতিমধ্যেই দেশের বহু রাজ্য থেকে জ়ম্বি ড্রাগ সম্পর্কিত খবর উঠে এসেছে। যদিও যাঁদের দেখে জ়ম্বি ড্রাগের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে, তাঁরা আদৌ সেই মাদকের নেশাতেই আচ্ছন্ন কি না তা এখনও সঠিক ভাবে জানতে পারা যায়নি।
জ়ম্বি ড্রাগ নামটি ভারতীয়দের কাছে নতুন। তবে বিজ্ঞানের ভাষায় এর ভিন্ন নামও রয়েছে। সেটি হল জ়াইলাজ়িন।
জ়াইলাজ়িন আদতে ‘খলনায়ক’ নয়। মানুষ সেধে এটিকে তা বানিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা মানুষের জন্য নয়। পশুদের জন্য এই ড্রাগ ব্যবহার করা হয়।
পশুচিকিৎসায় জ়াইলাজ়িনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। এটি একটি আফিমবিহীন ট্রাঙ্কুলাইজ়ার। সাধারণত বৃহদাকার পশু, যেমন- ঘোড়া, গরু প্রভৃতিকে অস্ত্রোপচারের আগে অ়জ্ঞান করার জন্য বা তাদের ব্যথা কমানোর জন্য এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
তা হলে আফিম না থাকা সত্ত্বেও জ়াইলাজ়িনকে কেন জ়ম্বি ড্রাগ আখ্যা দিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? কারণ, আমেরিকায় বহু দিন ধরে এটিকে মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে সেবন করার চল চলে আসছে, যা বর্তমানে ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আমেরিকায় প্রায় ১০০ জন এই জ়ম্বি ড্রাগের নেশার কবলে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই সংখ্যাই ২০২৩-এ আনুমানিক ৬০০০-এ পৌঁছে যায়!
আফিমবিহীন এই ট্রাঙ্কুলাইজ়ারকে ফেন্টানল বা হেরোইনের মতো মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে সেবন করা হয়। এর ফলে নেশা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তবে যেহেতু এই ওষুধ মানুষের ব্যবহারযোগ্য নয়, তাই মানবদেহে এর অতি ক্ষতিকারক প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। জ়াইলাজ়িনে আফিম থাকে না, তাই নারকান (মাদকের ‘ওভারডোজ়’ শিথিল করতে ব্যবহৃত ওষুধ) এর প্রভাব শিথিল করতেও পারে না। এর ফলে এই ড্রাগ সেবনে ‘ওভারডো়জ়’ হওয়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে।
এটিকে জ়ম্বি ড্রাগ আখ্যা দেওয়ার কারণ এর ক্ষতিকারক প্রভাব। জ়াইলাজ়িনের সবচেয়ে ক্ষতিকারক প্রভাব হল, এটি শরীরে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচনশীল ক্ষত বা ঘা দেখতে পাওয়া যায়।
বহু মানুষ সিরিঞ্জের সাহায্যে শরীরে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করান। সে ক্ষেত্রে যে স্থান দিয়ে মাদক গ্রহণ করা হয়, সেই স্থানেও ক্ষত হতে দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু না করলে সেই স্থান কেটে বাদও দিতে হতে পারে।
এ ছাড়া সেবনকারীর স্নায়ুতন্ত্র শিথিল হয়ে যায়। আশপাশে কী হচ্ছে সে সম্বন্ধে তাঁর আর কোনও হুঁশ থাকে না। ঠিক যেমন ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলিতে দেখা যাচ্ছে। মাদকাসক্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন। কী করছেন, কেন করছেন তা তিনি নিজেও বুঝে উঠতে পারেন না।
মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে জ়াইলাজ়িন সেবন করলে হৃৎপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি পায়। রক্তচাপ কমতে থাকে, দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে যায়। এ ভাবে মানুষ ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
জ়াইলাজ়িনের নেশা এক বার শুরু করলে তার প্রতি আসক্তি জন্মে যায়। পরবর্তী কালে সেটিকে ছাড়া মুশকিল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘উইথড্রল সিম্পটমস’।
জ়াইলাজ়িনের নেশা ছাড়তে চাওয়া ব্যক্তি হতাশার সাগরে তলিয়ে যান। খিদে কমে যায় বা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, আত্মহননের ভাবনাচিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। এই সময় অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছেও নেন।
বর্তমানে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া এবং নিউ ইয়র্কে জ়াইলাজ়িনের নেশায় আসক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা সর্বাধিক। তবে ক্রমশ এই ড্রাগ ইউরোপ এবং এশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলিতে দেখতে পাওয়া তরুণ-তরুণীকে দেখে জ়ম্বি ড্রাগের নেশার বুঁদ মনে হলেও আদতে এর কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। সবটাই মানুষের ধারণা এবং তরুণ-তরুণীর রাস্তার ঠায় বেহুঁশের মতো দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিমার উপর ভিত্তি করে রটানো হচ্ছে।
ভারতে এখনও পর্যন্ত কেবল পশুচিকিৎসার ক্ষেত্রেই জ়াইলাজ়িন ড্রাগ ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, জ়াইলাজ়িনের নেশা যদি সত্যিই ভারতে ছড়িয়ে পড়ে তবে তা মারাত্মক আকার ধারণ করলেও করতে পারে। বাকি সময়ই বলতে পারবে।