গত বছর পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পর ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জবাব দিয়েছিল ভারত। সেই আবহে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংক্ষিপ্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী পাকিস্তান। তার পর থেকেই তাদের জেট, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ‘যুদ্ধ পরীক্ষিত’ তকমা দিয়ে সেগুলি আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। তাদের দাবি, বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহী হয়েছে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান কিনতে।
ইসলামাবাদ দাবি করেছিল, চিনের সঙ্গে যৌথ ভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধ এবং প্রশিক্ষণ বিমান, ড্রোন ও অস্ত্র সম্পর্কিত চুক্তির জন্য ১৩টি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যার মধ্যে ছয় থেকে আটটি দেশের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। শীঘ্রই যুদ্ধবিমান বিক্রি করে ভাঁড়ার ভরানোর দাবিও করে ফেলে পাকিস্তানের শাহবাজ় শরিফের সরকার।
তবে এই সব খবরই আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়েছে পাকিস্তানি সূত্র মারফত। পাকিস্তানের সামরিক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এখনও অবধি কোনও চুক্তির বিশদ বিবরণ দেয়নি। যদিও দেশটির প্রতিরক্ষা উৎপাদনমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, বেশ কয়েকটি দেশ যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের প্রতি আগ্রহী। পাশাপাশি, তাঁর মুখে শোনা গিয়েছে উদ্বেগের কথাও। যার মর্মার্থ, এর মধ্যে একটিও চুক্তি ফলপ্রসূ না হতে পারে।
ফলে পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠান তাদের যুদ্ধবিমানগুলি ‘যুদ্ধ পরীক্ষিত’ এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদা তৈরি করেছে বলে ঢাকঢোল পেটালেও পুরো বিষয়টিতে ‘জল মিশে রয়েছে’ বলেই মত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞমহলের একাংশের।
ওই বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, পাকিস্তান যে দাবি করছে, বাস্তব তার থেকে আলাদা। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের যুদ্ধবিমানের আগ্রহ বৃদ্ধির বিষয়ে ইসলামাবাদ কয়েক মাস ধরে দাবি করলেও এখনও অবধি একটিও জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান রফতানি করতে পারেনি তারা। হয়নি কোনও চুক্তিও।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং প্রশিক্ষণ বিমান বিক্রি নিয়ে ১৩টি দেশের সঙ্গে আলোচনা করলেও এখনও কোনও চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। পাশাপাশি, ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা উৎপাদনমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাগুলি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদনমন্ত্রী রাজ়া হায়াত হররাজ রয়টার্সকে বলেছেন, ‘‘এই আলোচনা চলছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ভেস্তেও যেতে পারে।” যুদ্ধবিমান এবং অস্ত্র নিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে আলোচনাগুলিকে ‘অত্যন্ত গোপনীয়’ বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পাক প্রতিরক্ষা উৎপাদনমন্ত্রীর দাবি, কোনও দেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে মানেই যে সে দেশ যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তেমনটা নয়। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক প্রশ্ন উঠে আসছে। কিন্তু আমরা আলোচনা করছি।’’
পাকিস্তানের সামরিক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও যুদ্ধবিমান বিক্রি সংক্রান্ত কোনও তথ্য দিতে অস্বীকার করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকে মনে করছেন, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘অসারের তর্জন গর্জন সার’-এর মতো হয়েছে। ‘যুদ্ধ পরীক্ষিত’ যুদ্ধবিমান নিয়ে এত জিগির তুললেও এখনও সেগুলি বিক্রি করতে পারছে না ইসলামাবাদ।
অত্যাধুনিক পশ্চিমি যুদ্ধবিমানের সস্তা বিকল্প হিসাবে জেএফ-১৭-কে খাড়া করেছিল ইসলামাবাদ। আক্রমণাত্মক ভাবে বাজারজাত করার চেষ্টা করছিল সেটিকে। এর পর গত বছর ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষের পরবর্তী সময়ে সেই বিমানগুলি ‘যুদ্ধ পরীক্ষিত’ বলেও দাবি করতে শুরু করে পাকিস্তান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, ‘‘বেশ কয়েকটি দেশ পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য সক্রিয় ভাবে আলোচনা চালাচ্ছে।’’ যদিও বাস্তবে সেই বিবৃতিগুলির কয়েক মাস পরেও এখনও কোনও রফতানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
আলোচনায় থাকা দেশগুলির মধ্যে রয়েছে সুদান, নাইজ়েরিয়া, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, বাংলাদেশ এবং লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসন। তবে এই দেশগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক ভাবে অস্থিতিশীল বা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার তদন্তের অধীনে রয়েছে। চিনের অনুমোদন ছাড়া তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করার সম্ভাবনাও কম।
‘স্টকহলোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সিমন ওয়েজ়ম্যান রয়টার্সকে বলেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কারণে সুদান এবং লিবিয়ার মতো দেশগুলিতে যুদ্ধবিমান বিক্রি করা কঠিন।
পাকিস্তান যে ভাবে জেএফ-১৭-কে বাণিজ্যিক পণ্যের পরিবর্তে আর্থিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। ঋণদাতা এবং বন্ধুদেশগুলিকে নগদ অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে যুদ্ধবিমান সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামাবাদ। সৌদি আরবের সঙ্গে এই নিয়ে চুক্তিও হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতিটি পাকিস্তানের আরও গভীর সঙ্কটের প্রতিফলন। পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনও বেলআউট, রোলওভার এবং জরুরি তহবিলের উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল।
কিন্তু কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ত্রাণের ‘শর্টকাট’ হিসাবে অস্ত্র রফতানিতে জোর দিচ্ছে ইসলামাবাদ। আদতে বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানের মাটি নরম করছে। অন্তত তেমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
পাশাপাশি, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদনমন্ত্রীর কথাতেও স্পষ্ট যে, সে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে প্রত্যাশা কমিয়েছে। হররাজের ‘আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে’ মন্তব্য প্রমাণ করে যে ইসলামাবাদের দাবি আসলে কতটা ভঙ্গুর।
বিশ্লেষকরা এ-ও মনে করছেন, আন্তর্জাতিক চাপ, রফতানির উপর চিনের ভেটো ক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পাকিস্তানের সীমিত উৎপাদন ক্ষমতা— এ সবই অস্ত্র চুক্তিগুলির কার্যকর হওয়ার পরিপন্থী।
অনেকে আবার মনে করছেন, পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রচার এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তির দাবি আসলে সে দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার উপায়।
যদিও বিশেষজ্ঞদের অন্য একাংশ এখনও পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান বিক্রির দাবির উপরই ভরসা রাখছেন। ওই বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে সৃষ্ট ব্যাঘাতের পর দেশগুলি নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল খুঁজছে। সে ক্ষেত্রে সঠিক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে পাকিস্তান। ফলে জেএফ-১৭ এবং অন্য যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে অন্য দেশগুলির সঙ্গে পাকিস্তানের আলাপ-আলোচনায় সময় লাগলেও তা খুব তাড়াতাড়ি ফলপ্রসূও হতে পারে।