French Elimination Operation in Africa

মাক্রোঁর নির্দেশে তৈরি হিটলিস্ট, শুরু কাজও! পথের কাঁটা সরাতে ২২ নেতাকে খুন করে ‘সাহারায় শিহরন’ তুলবে ফ্রান্স?

আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে ফরাসি ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়েছে রুশ গুপ্তচরবাহিনী। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘অন্ধকার মহাদেশ’টির অন্তত ২২ জন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে খুন করতে উঠেপড়ে লেগেছে ফ্রান্স।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৪
Share:
০১ ১৮

কোথাও সাবেক স্বৈরশাসকের ছেলেকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া। কোথাও আবার একের পর এক সামরিক ছাউনিতে জঙ্গিহামলা। চলতি বছরে (পড়ুন ২০২৬ সাল) ফের অশান্তির আগুনে পুড়তে শুরু করেছে পশ্চিম আফ্রিকা। পর্দার আড়ালে থেকে তাতে নাকি পেট্রল ছেটাচ্ছে ফ্রান্স! গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে এ বার সেই ষড়যন্ত্র ফাঁস করল রুশ গুপ্তচর সংস্থা। তাদের দেওয়া রিপোর্ট মস্কোর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই সর্বত্র পড়ে গিয়েছে শোরগোল।

০২ ১৮

এ বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি আফ্রিকার ঘরোয়া রাজনীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে রুশ গণমাধ্যম স্পুটনিক। সেখানে মস্কোর গুপ্তচরবাহিনী এসভিআর-এর একটি রিপোর্টকে সামনে রেখে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানায় তারা। স্পুটনিকের দাবি, ‘অন্ধকার মহাদেশ’টিতে প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। আর তাই সেখানকার ‘অবাঞ্ছিত’ নেতা-নেত্রীদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

Advertisement
০৩ ১৮

এসভিআর-কে উদ্ধৃত করে স্পুটনিক লিখেছে, প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর আদেশ মেলায় কোমর বেঁধে কাজে নেমে পড়ে ফরাসি গুপ্তচর সংস্থা ‘দিরেক্সিওঁ জেনারেল দ্য লা সেক্যুরিতে এক্সতেরিয়্যর’ বা ডিজিএসই। জানুয়ারিতেই আফ্রিকার ২২ জন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ‘হিটলিস্ট’ তৈরি করে ফেলে তারা। সেই তালিকায় নাম ছিল লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়ম্মর গদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গদ্দাফির। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই তাঁকে বাড়িতে ঢুকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় অজ্ঞাতপরিচয় একদল দুষ্কৃতী।

০৪ ১৮

১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার ক্ষমতা দখল করেন কর্নেল গদ্দাফি। ২০১১ সালে ‘আরব বসন্তের’ ছোঁয়ায় উত্তর আফ্রিকার খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশটিতে গণআন্দোলন শুরু হলে পতন হয় তাঁর। ওই সময় ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে লিবিয়া। এর আঁচে বিদ্রোহীদের হাতে পড়ে প্রাণ হারাতে হয় তাঁকে। এ-হেন গদ্দাফির দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন সাইফ আল-ইসলাম। বাবার মৃত্যুর পর ত্রিপোলির অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন তিনি।

০৫ ১৮

৫৩ বছরের সাইফের রহস্যজনক খুন হওয়া নিয়ে অবশ্য মুখ খুলতে চায়নি লিবিয়া প্রশাসন। অন্য দিকে ওই ঘটনাকে ‘গুপ্তহত্যা’ বলে উল্লেখ করে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন গদ্দাফি-পুত্রের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওখমান। সৌদি আরবের গণমাধ্যম আল আরাবিয়া জানিয়েছে, রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের জ়িনতান শহরে থাকছিলেন সাইফ। সেখানেই চড়াও হয়ে তাঁকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় চার দুষ্কৃতী।

০৬ ১৮

গদ্দাফি-পুত্রের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, হামলাকারীদের প্রত্যেকেই মুখোশ পরে ছিল। সাইফকে ঘর থেকে টেনে বাগানে বার করে এনে গুলি করে তারা। হত্যার আগের মুহূর্তে বাড়ির সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেয় ওই চার আততায়ী। ফলে সাইফকে গুলি করার মুহূর্তের কোনও ছবি পাওয়া যায়নি। সমাজমাধ্যমে আবদুল্লাহের দেওয়া এই বিবরণ ফরাসি গুপ্তচরবাহিনীকে নিয়ে সন্দেহ জোরালো করেছে।

০৭ ১৮

২০১১ সালে গদ্দাফির পতনের পর বিদ্রোহীদের হাতে গ্রেফতার হন সাইফ। প্রায় এক দশক লিবিয়ার একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি শহরে বন্দি থাকতে হয়েছিল তাঁকে। মুক্তি পাওয়ার পর ফের জাতীয় রাজনীতিতে পা জমানোর চেষ্টা করেন তিনি। উত্তর আফ্রিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও অংশ নেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। যদিও, আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকারি কোনও পদে ছিলেন না তিনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমজনতার মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা যে বাড়ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

০৮ ১৮

রুশ গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, সাইফ ছাড়াও বুরকিনা ফাসোর তরুণ সামরিক শাসক তথা অন্তর্বর্তিকালীন প্রেসি়ডেন্ট ইব্রাহিম ট্রায়োকে নিশানা করেছে ফ্রান্স। ইতিমধ্যেই দু’-তিন বার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় তারা। ফলে এ বার পরিকল্পনা, পাল্টা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির সাহায্যে তাঁকে কুর্সি থেকে টেনে নামানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন প্যারিসের গুপ্তচরেরা। পাশাপাশি চলছে ইব্রাহিমের ‘ক্যারিশ্মাটিক’ ভাবমূর্তিতে কালি ছেটানোর প্রক্রিয়াও।

০৯ ১৮

গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা চার দিন বুরকিনা ফাসোর একাধিক জায়গায় হামলা চালায় কয়েকশো জঙ্গি। ক্যাপ্টেন ইব্রাহিমের শক্তির ভরকেন্দ্র সামরিক ছাউনিগুলিকে নিশানা করে তারা। সন্ত্রাসীদের অতর্কিত আক্রমণে প্রাণ হারান একগুচ্ছ অফিসার ও সৈনিক। ‘অপারেশন’ শেষে দ্রুত যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় জঙ্গিরা। সংশ্লিষ্ট হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও নেপথ্যে আল-কায়দা ও ইসলামিক স্টেট বা দায়েশ, দুই কুখ্যাত গোষ্ঠীরই হাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

১০ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম হামলাটি হয় বুরকিনা ফাসোর পূর্ব দিকের বেলাঙ্গা সেনাছাউনিতে। ঠিক তার পরের দিন অন্য দু’টি সেনাঘাঁটিকে নিশানা করে সন্ত্রাসীরা। সেগুলির নাম চিটাও এবং তানজ়ারি। ১৫ তারিখ সর্বশেষ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটে নারে এলাকার সেনাছাউনিতে। অফিসার ও সেনা ছাড়া জঙ্গিরা সেখানে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবকদের বুকও গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। প্রাণ হারান সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলির নিরীহ নাগরিকেরাও।

১১ ১৮

জঙ্গিদের এই হত্যাকাণ্ডে মোট কত জনের মৃত্যু হয়েছে, তা অবশ্য স্পষ্ট করেনি বুরকিনা ফাসোর সরকার। যদিও স্থানীয় সূত্রে খবর, বেলাঙ্গার সেনাছাউনির হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ৪০ ছাড়াতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির উত্তরে রয়েছে মালি এবং পূর্বে নাইজ়ার। এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আল-কায়দা এবং দায়েশের শক্ত ঘাঁটি বলা যেতে পারে। এ বারও সেখান থেকেই যে নাশকতার পরিকল্পনা হয়েছে, তা একরকম স্পষ্ট।

১২ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ১৯ শতকে পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় উপনিবেশ গড়ে তোলে ফ্রান্স। ফলে ১৮৯৬ সালে পুরোপুরি ভাবে প্যারিসের কব্জায় চলে যায় বুরকিনা ফাসো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-’১৮) পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে সম্পদ লুটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় ইউরোপের এই দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫) পর অবশ্য তাঁদের সেই নিয়ন্ত্রণ আর থাকেনি। ১৯৬০ সালের অগস্টে ফ্রান্সের থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতা পায় বুরকিনা ফাসো।

১৩ ১৮

ইউরোপীয় শাসনের কবল থেকে বেরিয়ে এলেও পশ্চিম আফ্রিকার দেশটিতে ফরাসি প্রভাব কিন্তু কমেনি। বুরকিনা ফাসোর সাবেক প্রেসিডেন্ট পল-হেনরি সান্দাওগো দামিবাকে প্যারিসের ‘বাধ্য ছেলে’ বললে অত্যুক্তি হবে না। আর তাই আর্থিক দিক থেকে দেশ চরম দারিদ্রের মুখে পড়লেও কখনও ফ্রান্সবিরোধী পদক্ষেপ করেননি তিনি। উল্টে ফরাসি কোষাগার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ‘সিএফএ ফ্রাঁ’ ব্যবহার করতে আমজনতাকে একরকম বাধ্য করেন সান্দাওগো।

১৪ ১৮

২০১৫ সাল থেকে বুরকিনা ফাসোয় অশান্তি পাকিয়ে ওঠে। ২০২২ সালে অন্তর্বর্তিকালীন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন ইব্রাহিম। কুর্সিতে বসেই ফ্রান্সকে সামরিক ঘাঁটি সরাতে বলেন তিনি। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে প্যারিস। অন্য দিকে, গত কয়েক বছরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এর জেরে অচিরেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর ‘চক্ষুশূল’ হয়ে ওঠেন ইব্রাহিম।

১৫ ১৮

ইব্রাহিম অবশ্য গোড়া থেকেই বুরকিনা ফাসোকে পশ্চিমি প্রভাব মুক্ত করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব দেখিয়ে এসেছেন। এর জেরে সমর্থকেরা তাঁকে ‘আফ্রিকার চে গেভারা’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশটির বাইরেও তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। কেউ কেউ আবার তাঁকে মার্কসবাদী বিপ্লবী থমাস সাঙ্কারার উত্তরসূরি মনে করেন। এ-হেন পরিস্থিতিতে পুরনো জমি ফিরে পেতে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ফ্রান্সই ষড়যন্ত্রের জাল বিছোচ্ছে বলে দাবি করেছে রাশিয়া।

১৬ ১৮

গত বছর ইব্রাহিমের ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিম আফ্রিকায় আশন্তি তৈরি করছেন ওই সামরিক শাসক। তাঁর স্বৈরাচারী মনোভাবের জন্য বহু নিরীহ বাসিন্দাকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। ফ্রান্সের নিরাপত্তা সে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। নিজের স্বার্থে প্যারিসের সঙ্গে সেই চুক্তি ভেঙেছেন তিনি। ফলে জঙ্গিহামলা আটকাতে আমরা বাহিনী মোতায়েন করতে পারছি না।’’

১৭ ১৮

২০২১ সালে মালির সামরিক শাসক তথা অন্তর্বর্তিকালীন প্রেসিডেন্ট আসিমি গোইতারকে হত্যার চেষ্টা করে এক ব্যক্তি। মসজিদে নমাজ পাঠের সময় অভিযুক্ত ছুরি নিয়ে তাঁর উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীদের তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে যান আসিমি। পরে জেলবন্দি অবস্থায় মৃত্যু হয় ওই ‘ভাড়াটে’ দুষ্কৃতীর। ওই ঘটনাতেও ফরাসি গুপ্তচরবাহিনীর হাত থাকার যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করেছে স্পুটনিক।

১৮ ১৮

বিশেষজ্ঞদের দাবি, দু’টি কারণে আফ্রিকায় প্রভাব বাড়াতে চাইছেন মাক্রোঁ। প্রথমত, বিগত দিনের মতো সেখানকার একাধিক দেশে সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। দ্বিতীয়ত, লিবিয়া, বুরকিনা ফাসো বা মালির প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে যথেষ্ট নজর আছে প্যারিসের। একই কারণে ফ্রান্সকে হটিয়ে সেই জায়গায় নিজেকে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখছে রাশিয়াও। ফলে আগামী দিনে ‘অন্ধকার মহাদেশ’টিকে ঘিরে ক্ল্যাশ অফ টাইটান্‌সে মাততে পারে দুই মহাশক্তি।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement