বিভিন্ন দেশের পণ্যের উপর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার আমেরিকার শীর্ষ আদালত এই ঘোষণা করেছে।
ট্রাম্প অবশ্য তাতে দমেননি। কড়া ভাষায় আদালতের সমালোচনা করেছেন এবং পাল্টা আরও ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। আদালতের নির্দেশের পর ট্রাম্পের পাল্টা ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়টিকে অর্থনৈতিক চাল হিসাবে দেখছেন অনেকে। মার্কিন আইন উল্লেখ করে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ১২২ নম্বর ধারার অধীনে আরোপিত স্বাভাবিক শুল্কের উপরে ১০ শতাংশ আন্তর্জাতিক (গ্লোবাল) শুল্ক তিনি আরোপ করছেন। শুল্ক আরও বাড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু আদালতের নির্দেশের পর কি এত দিনের শুল্কবাবদ আয়ের টাকা ফেরত দিয়ে দিতে হবে ট্রাম্প প্রশাসনকে? এখন এই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে আন্তর্জাতিক মহলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আমদানি শুল্ক বাবদ ট্রাম্পের আয় হয়েছে ১৩.৩৫ হাজার কোটি ডলার। শুল্ককে বেআইনি বললেও টাকা ফেরতের বিষয়টি স্পষ্ট করেনি আমেরিকার আদালত।
ট্রাম্পের শুল্কবাণের ফলে যে দেশগুলির বাণিজ্যে কুপ্রভাব পড়েছিল, তার অন্যতম ভারত। দীর্ঘ টালবাহানার পর অবশেষে সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ব্যাপারে সম্মত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সব দেশে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক চাপালেও ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই আবহে ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক জন মহান ব্যক্তি। তিনি অন্যদের সঙ্গে আলোচনায় যতটা কঠোর ছিলেন, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে ততটা কঠোর ছিলেন না।” তাঁর সংযোজন, “আমরা ভারতের সঙ্গে একটি ন্যায্য চুক্তি করেছি। তাই এটি অপরিবর্তিত থাকছে।”
তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি— কোন পথে এগিয়েছে ভারতের উপর ট্রাম্পের শুল্কবাণ? দেখে নেওয়া যাক এক নজরে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি। ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্টের আসনে দ্বিতীয় বার বসার পর আমেরিকাসফরে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে গিয়ে বাণিজ্যচুক্তির বার্তা দেন তিনি। ওই চুক্তি হলে দেশের বাণিজ্যে অগ্রগতি হবে, এই মনে করে খুশির হাওয়া বয়ে গিয়েছিল দেশের বণিকমহলে।
তবে এর পরেই এপ্রিল মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। সেই দিনটিকে ‘লিবারেশন ডে’ বা ‘মুক্তি দিবস’ হিসাবেও ঘোষণা করেন তিনি। এর পর ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর ২৬ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক এবং বিশ্বব্যাপী আমদানির উপর ১০ শতাংশ বেসলাইন শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেন। হইচই পড়ে যায় ভারতীয় বাজারে।
বস্তুত, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। ভারতের উপরে চড়া হারে শুল্ক চাপানোর নেপথ্যে সেটিও ছিল অন্যতম কারণ। ট্রাম্পের এ-ও দাবি ছিল, ভারতীয় বাজারে মার্কিন পণ্যের উপর অনেক চড়া শুল্ক নেওয়া হয়। সেই কারণে প্রথমে ভারতের উপর ২৫ শতাংশ ‘পারস্পরিক শুল্ক’ চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ২৩ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের হয়ে রাজেশ আগরওয়াল ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে শুল্ক এবং বাণিজ্যিক বাজার নিয়ে কাঠামোগত আলোচনা শুরু করেন। বাড়তি শুল্কে ৯ জুলাই পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।
এর পর মে মাসে আইফোন প্রস্তুতকারী সংস্থা অ্যাপ্লকে সতর্কবার্তা দেন ট্রাম্প। ঘোষণা করেন, আমেরিকায় বিক্রি হওয়া আইফোনগুলি বিদেশে তৈরি হলে তার উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
অগস্ট মাসে ভারতের পণ্যে ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক চাপান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পরে রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ‘জরিমানা’ বাবদ আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপান। তার পর থেকে বাণিজ্যচুক্তির ব্যাপারে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল।
এর পরেই ভারতীয় পণ্যের বিকল্প বাজার ধরতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাতে থাকে কেন্দ্র। ব্রিটেন, নিউ জ়িল্যান্ড-সহ একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সারে ভারত। বাণিজ্যচুক্তি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও। তবে বিশেষজ্ঞমহলের প্রথম থেকেই দাবি ছিল, অন্য যে কারও সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করলেও আমেরিকার বাজার ভারতীয় পণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমীকরণে পরিবর্তন আসে। বাণিজ্যচুক্তির কথা হয় দু’দেশের মধ্যে। ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণাও করা হয়।
ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে ভারত। পরিবর্তে আমেরিকা থেকে বেশি করে তেল কিনবে নয়াদিল্লি। এ ছাড়া আমেরিকা থেকে ৪৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৬২২ কোটি টাকার পণ্যও ভারত কিনবে বলে কথা দিয়েছেন মোদী। শুল্ক কমানোর নেপথ্যে এগুলিই অন্যতম কারণ বলে ব্যাখ্যা করেন ট্রাম্প। এর পর মনে করা হচ্ছিল চলতি বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি নাগাদ এই বাণিজ্যচুক্তি সংক্রান্ত সইসাবুদ হতে পারে দুই দেশের মধ্যে।
বাণিজ্য সমঝোতা অনুযায়ী ভারত থেকে কোনও পণ্য আমেরিকায় রফতানি করতে গেলে আপাতত ১৮ শতাংশ শুল্কই দিতে হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেই জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য ব্যবহৃত আইনকে হাতিয়ার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন যে আন্তর্জাতিক শুল্পনীতি প্রণয়ন করেছিলেন, তাতে বাদ সাধে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার আমেরিকার শীর্ষ আদালত ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘আন্তর্জাতিক আমদানি শুল্ক’ বেআইনি ঘোষণা করেছে।
ফলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর আমেরিকার তরফে ভারতের উপর চাপানো ১৮ শতাংশ শুল্কও বাতিল হয়ে গেল। আর ১৮ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কোনও শুল্ক নয়াদিল্লিকে দিতে হবে না। তবে ১০ শতাংশ হারে নতুন যে শুল্কের কথা ট্রাম্প বলেছেন, তা অন্যান্য দেশের মতো দিতে হবে ভারতকেও। আপাতত ১৫০ দিন এই হারে শুল্ক দিয়ে যেতে হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক কার্যকর হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে হোয়াইট হাউসও।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের উপরে যে বাড়তি শুল্ক চাপানো হয়েছিল, সেগুলি আর কার্যকর হবে না। আর ওই হারে শুল্ক আদায় করা হবে না। অর্থাৎ, সে ক্ষেত্রে ভারতের উপর আমেরিকার আমদানি শুল্কও ১০ শতাংশে নেমে আসছে।
শুক্রবার প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন ন’জন বিচারপতির বেঞ্চ ৬-৩ ভোটের ভিত্তিতে ঘোষিত রায়ে বলেছে, ‘‘জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া একক সিদ্ধান্তে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর এই বিশাল শুল্ক আরোপ করে প্রেসিডেন্ট তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।’’ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
তবে আমেরিকার শীর্ষ আদালত ট্রাম্পের ‘আন্তর্জাতিক আমদানি শুল্ক’কে বেআইনি ঘোষণার পর সেই রায়কে ‘হতাশাজনক’ বলে জানান ট্রাম্প। তাঁর দাবি, আদালত বিদেশি স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত। এর পরেই আদালতের রায় ‘অবমাননা’ করে আরোপিত শুল্কের উপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক (গ্লোবাল) শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, তিনি আরও বেশি শুল্ক বৃদ্ধি করতে পারেন।