পুলিশের জালে রাজধানী দিল্লির আরও এক ‘লেডি ডন’। কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিশ্নোই গ্যাংয়ের মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগে খুসনুমা আনসারি ওরফে নেহাকে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশের স্পেশ্যাল সেল কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স।
নেহা হলেন বিশ্নোই গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য তথা দক্ষ বন্দুকবাজ ববি কবুতরের দীর্ঘ দিনের সঙ্গী। বিশ্নোই গ্যাংকে অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার রাতে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন শার্পশুটার ববি। তাঁর সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় নেহাকেও।
ববির আসল নাম মহফুজ়। অভিযোগ, বিশ্নোই এবং হাশিম বাবা গ্যাংয়ের জন্য অস্ত্র-সহ আরও অনেক অবৈধ জিনিসপত্র সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে যোগ থাকা সেলিম পিস্তলের কাছ থেকে উচ্চ মানের আগ্নেয়াস্ত্র কিনেছিলেন ববি।
পঞ্জাবের গায়ক সিধু মুসে ওয়ালা খুন, অভিনেত্রী দিশা পটানির বাসভবনের বাইরে গুলি চালানো, দিল্লিতে নাদির শাহ হত্যা এবং সিলামপুরের জোড়া খুন-সহ বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল অপরাধে ওই বন্দুকগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
ববির সঙ্গে পুলিশের জালে পড়েছেন তাঁর দীর্ঘ দিনের সঙ্গী, ‘লেডি ডন’ খুসনুমা ওরফে নেহাও। তদন্তকারীদের অনেকেই মনে করছেন, বিশ্নোই গ্যাংয়ের মধ্যে মহিলা গ্যাংস্টারদের রমরমা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাংয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন তাঁরা। সে রকমই এক জন হলেন নেহা।
সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া চতুর্থ ‘লেডি ডন’ নেহা। এর আগে দীপা, জ়োয়া খান এবং জ়িকরা নামে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
এঁদের মধ্যে জ়োয়া গ্যাংস্টার হাশিম বাবার তৃতীয় স্ত্রী। জ়িকরা আবার জ়োয়ার বাউন্সার হিসাবে কাজ করতেন। একটি মাদক সংক্রাম্ত মামলায় জ়োয়া গ্রেফতার হওয়ার পরে অন্যত্র কাজে যোগ দেন।
তদন্তকারীদের অনুমান, বিশ্নোই গ্যাংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন নেহা। পরিচিত ছিলেন ‘ম্যাডাম জ়হর’ নামে। হিন্দি জ়হর শব্দের বাংলা অর্থ বিষ বা গরল।
পুলিশ সূত্রে খবর, দ্বৈত জীবন যাপন করতেন নেহা। দিনে দিল্লির একটি সাধারণ বিউটি পার্লারের মালিক নেহা রাতে হয়ে উঠতেন ‘ম্যাডাম জ়হর’। বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজকর্মের জাল বিস্তার করতেন রাতের অন্ধকারেই।
নেহার বিউটি পার্লারটি উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে রয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, ওই বিউটি পার্লারের আড়ালে গ্যাংয়ের অবৈধ কার্যকলাপ চালাতেন নেহা। মাদকচক্রের নেটওয়ার্কও পরিচালনা করা হত ওই বিউটি পার্লার থেকেই।
ববির সঙ্গে নেহার সম্পর্ক সাত বছরের। শুটার ববির হাত ধরেই উত্থান তাঁর। সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ববি এবং নেহার গতিবিধি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পেয়ে তাঁদের ধরার জন্য ফাঁদ পাতে দিল্লি স্পেশ্যাল সেলের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।
মঙ্গলবার মধ্যরাতে ববি এবং নেহা একটি এসইউভিতে ভ্রমণ করছিলেন। অভিযান চালিয়ে মহিপালপুর উড়ালপুলের কাছে গাড়িটিকে আটক করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয় গাড়ির ভিতর থেকে। গ্রেফতার করা হয় ববিকে।
মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে নেহাকে গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশের স্পেশ্যাল সেল। তাঁর কাছ থেকে মাদকও উদ্ধার করা হয়। পুলিশ উভয়ের বিরুদ্ধেই আইনের প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের করেছে।
ববি এবং নেহা— উভয়কেই হেফাজতে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে খবর। মাদকচক্র সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন এবং এনসিআর অঞ্চলে সক্রিয় গ্যাংয়ের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে জানার জন্যও তাঁদের জেরা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
২০২২ সালে পঞ্জাবি গায়ক মুসে ওয়ালা হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও নতুন তথ্য উঠে এসেছে তদন্তকারীদের হাতে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মুসে ওয়ালাকে কোথায় খুন করা হবে, তার জন্য রাস্তাঘাটে প্রাথমিক অনুসন্ধান বা রেকি করেছিলেন ববিই।
অভিযোগ, মুসে ওয়ালার গতিবিধি এবং যাওয়া-আসার রাস্তা দীর্ঘ দিন ধরে ট্র্যাক করে সেই তথ্য শুটারদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন ববি। মুসে ওয়ালা খুনের পরিকল্পনায় জড়িত আর এক গ্যাংস্টার শাহরুখের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে জানা গিয়েছে।
কয়েক মাস ধরে ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে পুলিশের চোখে ধুলো দিচ্ছিলেন ববি। ঘন ঘন অবস্থানও পরিবর্তন করছিলেন তদন্তকারীদের এড়াতে। তবে প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে তাঁকে মঙ্গলবার গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশের স্পেশ্যাল সেল। ধরা পড়েছেন সঙ্গী ‘লেডি ডন’ও।