জীবন বৃত্তাকার। তা ত্রিশ দশকের জনপ্রিয় অভিনেতা ভগবান দাদার ব্যক্তিজীবনের চড়াই-উতরাইয়ের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো অবস্থা ছিল তাঁর কৈশোরে। জীবনপথে ধাক্কা খেতে খেতে নিজেকে বলিউডের ‘শরীরীভাষার মাস্টার’ হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। জীবন ছিল বিলাসিতায় মোড়া। কিন্তু শেষ জীবনে এসে আবার দারিদ্রই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল অভিনেতাকে।
১৯১৩ সালের অগস্টে মহারাষ্ট্রের অমরাবতী শহরে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম ভগবানের। তাঁর আসল নাম অবশ্য ভগবান আবাজি পালাভ। তাঁর বাবা মুম্বইয়ের একটি সুতির কলের শ্রমিক ছিলেন। স্কুলে ভর্তি হলেও আর্থিক অনটনের কারণে অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন ভগবান।
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলতে ভগবানও একটি কাপড়ের কারখানায় শ্রমিক হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। অভাবের তাড়নায় কারখানায় কাজ করলেও তাঁর মন পড়ে থাকত রূপালি পর্দায়। সিনেমার প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। হলিউডের নির্বাক চলচ্চিত্রের অভিনেতা ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস ছিলেন ভগবানের অনুপ্রেরণা।
শারীরিক ভাবে বেশ শক্তিশালী ছিলেন ভগবান। অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি পেশাদার কুস্তিগির হওয়ারও ইচ্ছা ছিল তাঁর। আখড়ায় নিয়মিত কুস্তি লড়তে যেতেন তিনি। এই শরীরচর্চার অভ্যাস পরবর্তী কালে তাঁকে অ্যাকশন ও স্টান্ট দৃশ্যে দারুণ সাহায্য করেছিল।
অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার জন্য শ্রমিকের কাজ করার পাশাপাশি মুম্বইয়ের বিভিন্ন স্টুডিয়োর চারপাশে ঘোরাফেরা করতেন। বলিউডে নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৩১ সালে ‘বেওয়াফা আশিক’ ছবির মাধ্যমে অভিষেক হয়েছিল তাঁর।
অভিনয় শুরুর সাত বছর পর ১৯৩৮ সালে প্রথম একটি হিন্দি ছবি সহ-পরিচালনা করেছিলেন ভগবান। কেরিয়ারের গোড়ার দিকে উপার্জনের সমস্ত টাকা জমিয়ে পরের ছবি তৈরি করতেন তিনি।
কম বাজেটের সেই সব ছবির মূল দর্শক ছিলেন কলকারখানার খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের মনোরঞ্জনের কথা ভেবেই সহজ সরল চিত্রনাট্যের ছবি তৈরি করতেন তিনি। সেখানে অভিনয়ও করতেন। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৯ অবধি বেশ কিছু কম বাজেটের ছবি বানান ভগবান দাদা। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য ছবি ছিল ‘বন মোহিনী’। ১৯৪২ সালে পুরোদস্তুর প্রযোজক হয়ে ওঠেন ভগবান। পাঁচ বছর পরে চেম্বুরে একটি স্টুডিয়োও খুলে ফেলেছিলেন তিনি।
১৯৪২ সালে একটি ছবিতে নায়িকা ললিতা পাওয়ারকে চড় মারার দৃশ্যে অভিনয় করতে হত তাঁকে। কিন্তু তিনি এত জোরে চড় মেরে দিয়েছিলেন যে, নায়িকার কেরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, চড়ের আঘাতে ললিতার বাঁ চোখের শিরা ফেটে গিয়েছিল এবং মুখে প্যারালাইসিস হয়েছিল তাঁর। তিন বছর ধরে চিকিৎসা চলেছিল ললিতার। বাঁ চোখটি চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল অভিনেত্রীর।
রাজ কপূরের পরামর্শে ভগবান পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছিলেন ‘অলবেলা’। ১৯৫১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির নায়কও ছিলেন তিনি। বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন গীতা বালি। ‘অলবেলা’-র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভগবান দাদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সি রামচন্দ্র। বক্সঅফিসে দারুণ ব্যবসা করেছিল এই ছবি।
‘অলবেলা’র মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম সারির মুখ হয়ে উঠেছিল ভগবান। পরিচালক, প্রযোজক, নায়ক হিসাবে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভাগম ভাগ’ ছবিতে তিনি ছিলেন পরিচালক এবং নায়ক। এই ছবিও দর্শকমহলে প্রশংসিত হয়েছিল।
ভগবানের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নাচ। তাঁর দৌলতেই হিন্দি ছবিতে প্রবেশ করেছিল বিভিন্ন ধরনের নাচ। শম্মী কপূর থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চন, গোবিন্দ এবং পরবর্তী নায়কদের নৃত্যশৈলীতে ভগবানের গভীর প্রভাব ছিল। ১৯৩১ থেকে ১৯৯৬— এই দীর্ঘ সময় ধরে ভগবান যুক্ত ছিলেন হিন্দি ছবির সঙ্গে। কিন্তু শেষের দিকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে গিয়েছিল তিল তিল করে গড়ে তোলা তাঁর সাম্রাজ্য।
ভগবানের কেরিয়ারে দুঃসময় এসেছিল খুব দ্রুত। সুসময়ের বন্ধুরা সকলেই ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সিনেমার জন্যই আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিলেন ভগবান। স্ত্রীর অর্থ, নিজের সঞ্চিত আমানত, সব বাজি রেখে তিনি প্রযোজনা করেছিলেন ‘হসতে রহেনা’ নামের একটি ছবি। কিন্তু মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় ছবির কাজ। এই আর্থিক ক্ষতি তিনি আর সামলে উঠতে পারেননি।
পরিস্থিতির চাপে ভগবানকে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল মুম্বইয়ের জুহুর পঁচিশ কামরার বাংলো। সপ্তাহে সাত দিনের জন্য সাতটি আলাদা আলাদা গাড়ি ব্যবহার করতেন তিনি। দেনার দায়ে এক এক করে সব ক’টি গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন ভগবান। ১৫।
পরিচালনা এবং প্রযোজনা থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিয়েছিলেন ভগবান। অভিনয়েরও বিশেষ সুযোগ পাচ্ছিলেন না তিনি। কয়েকটি হিন্দি ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যেত তাঁকে। কিন্তু তাতে ভগবানের সংসার চলত না।
শেষ জীবনে জুহুর সমুদ্রসৈকতের সামনে ২৫ কামরার বাংলো ছেড়ে দিতে হয় ভগবানকে। পরিবার নিয়ে ঠাঁই হয় মুম্বইয়ের ঘিঞ্জি নিম্নবিত্ত এলাকায় এক কামরার ঘরে। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখানেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছিলেন ৮৯ বছর বয়সি ভগবান দাদা।