ফেলে দেওয়া লোহালক্কড় থেকে অত্যাধুনিক দু’চাকা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চলবে সেই বাইক! কণ্ঠস্বরের নির্দেশে রাস্তায় গড়াবে চাকা, নিয়ন্ত্রিত হবে গতিবিধি। সুরতের তিন তরুণ তুর্কি জানিয়েছেন, তাঁদের এই ধরনের বাইক তৈরির প্রেরণা ইলন মাস্কের সংস্থা টেসলার বৈদ্যুতিন গাড়ি।
সামনে কোনও বাধা এলে আপনাআপনিই থেমে যাবে এই বাইক। কোনও গাড়ি ১২ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে ঢুকে পড়লে দু’চাকার গাড়িটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে গতি কমিয়ে দেবে। তিন ফুটের মধ্যে যদি কোনও বাধা আসে, তা হলে বাইকটি সম্পূর্ণ রূপে থেমে যাবে। এমনকি আরোহী ব্রেকের ব্যবহার না করলেও বাইকটি থেমে যাবে।
ভারতের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত বাইক ‘গরুড়’। প্রথম ঝলকে বাইকটিকে দেখলে কল্পবিজ্ঞানের কোনও কাহিনি থেকে উঠে আসা চরিত্রের বাহন বলে দিব্যি চালিয়ে দেওয়া যায়। বিজ্ঞানের কল্পকাহিনির গবেষণাগার থেকে তৈরি বলে ভ্রম হতে বাধ্য।
মহাবীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিবম মৌর্য, গুরপ্রীত অরোরা এবং গণেশ পাটিল মিলে তৈরি করে ফেলেছেন যুগান্তকারী এই বাইকটি। এটি হাতেগোনা কিছু বিদেশি যন্ত্র ছাড়া বাদবাকি সমস্ত অংশ ফেলে দেওয়া বাতিল লোহার জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি, যাতে সুপার বাইক তৈরির খরচে রাশ টানা যায়।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তিন পড়ুয়া এমন একটি স্মার্ট বৈদ্যুতিক বাইক তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করবে। অথচ তার জন্য ব্যয়বহুল যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না। এই চ্যালেঞ্জটিকে বাস্তব রূপ দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। বর্জ্য থেকে বাহন তৈরি করার সেই বাধা সফল ভাবে পার করতে পেরেছেন ত্রয়ী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি সুপার বাইকের পরিকল্পনার একেবারে গো়ড়া থেকেই তিন তরুণের লক্ষ্য ছিল পকেট বাঁচিয়ে কাজ করা। তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, নতুন কিছু উদ্ভাবনের জন্য সব সময় গোছা গোছা টাকার প্রয়োজন হয় না। সেই ফাঁক পূরণ করা সম্ভব প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে।
বাতিল লোহা ও কিছু উন্নত যন্ত্র দিয়ে তৈরি এই বাইকটি তৈরির খরচ মূলত পকেটমানি থেকেই দিয়েছেন তিন ছাত্র। ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় তৈরি হয়েছে টেসলার বৈদ্যুতিক বাইকের ভারতীয় সংস্করণটি।
কী ভাবে কাজ করে এই সুপার বাইকের বুদ্ধিমত্তা সেন্সর? ‘গরুড়’কে অন্য ইভি বাইকগুলির থেকে আলাদা করে তুলেছে এর বিশেষ নিরাপত্তা বা সুরক্ষা সেন্সর। বাইকটিতে দু’টি উচ্চ ক্ষমতার সেন্সর রয়েছে যা চলন্ত অবস্থায় ক্রমাগত সামনের রাস্তা স্ক্যান করে চলে।
বাইকটির নিয়ন্ত্রক বা কন্ট্রোল রুম হল ‘রাসপবেরি পাই’ নামের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। এর মাধ্যমেই ভয়েস কমান্ডে নির্দেশ পায় ‘গরুড়’। সেই নির্দেশ পালন করে স্রেফ ‘তিন ফুটের মধ্যেই দাঁড়িয়ে যাও’-এর মতো ভয়েস কমান্ডে ‘গরুড়’ নিজে থেকেই থমকে দাঁড়ায়।
‘গরুড়’ এমন অনেক আধুনিক প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে সজ্জিত যা সাধারণত শুধুমাত্র উচ্চমানের দামি বৈদ্যুতিন যানবাহনেই দেখা যায়। একটি পূর্ণ টাচস্ক্রিন ড্যাশবোর্ডে জিপিএস নেভিগেশন, ফোনের সংযোগ এবং গাড়ির মতো গান বাজানোর সুবিধা রয়েছে এতে। বাইকে দেওয়া হয়েছে অয়্যারলেস মোবাইল চার্জিংয়ের সুবিধাও।
সামনের এবং পিছনের ক্যামেরাগুলি সরাসরি ডিসপ্লেতে লাইভ ভিডিয়ো ফিড স্ট্রিম করে। যানজটের সময় ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের রাস্তায় বাইকচালকদের রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে ক্রমাগত তথ্য সরবরাহ করতে থাকে।
প্রোটোটাইপ হওয়া সত্ত্বেও, গরুড়ের পারফরম্যান্স বহু মানুষেরই নজর কেড়েছে। লিথিয়াম-আয়নের ব্যাটারিচালিত বাইকটি এক বার চার্জ দিলে ইকো মোডে ২২০ কিমি এবং স্পোর্ট মোডে ১৬০ কিমি পর্যন্ত ছুটতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ চার্জ হতে সময় লাগে মাত্র দু’ঘণ্টা।
‘গরুড়’ নির্মাতারা জানিয়েছেন, গাড়ির ব্যাটারিটি এমন ভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে বাইকটির ওজন হালকা হয় অথচ নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। গাড়ির গতি ও দক্ষতার সঙ্গে কোনও ভাবে আপস করা হয়নি বলেও দাবি তাঁদের।
গরুড়ের জনপ্রিয়তার নেপথ্যের কান্ডারি শিবম। হাতে-কলমে ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক্স এবং ভবিষ্যতের যানবাহনের নকশা কেমন হতে পারে সে সমস্ত বিষয়বস্তু নিয়ে একটি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলও পরিচালনা করেন তিনি। সেই চ্যানেলটির ২০ লক্ষ অনুসারী তৈরি হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সহজলভ্য প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে সুরতের এই তিন ছাত্র প্রমাণ করেছেন যে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা যায়। গাড়ির বাজারে ই-স্কুটারের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাহনের সংজ্ঞাও পাল্টাচ্ছে দিন দিন। বাতিল, ফেলে দেওয়া ভাঙাচোরা জিনিস দিয়ে ‘বিষ্ণুর বাহন’টি কবে বাজারে পাখা মেলবে, তা জানা সময়ের অপেক্ষা।