মানুষের স্থাপত্য নিদর্শন বরাবরই প্রশংসনীয়। সুদূর প্রস্তর যুগ থেকে মানুষ চোখধাঁধানো নানা স্থাপত্য তৈরি করে আসছে। সেগুলি বর্তমানে আমাদের কাছে পর্যটনকেন্দ্র রূপে বিখ্যাত। তবে অনেকেই জানেন না যে, কেবল মাটির উপরে না, মাটির গভীরেও মানুষ সৃষ্টির ছাপ রেখেছে।
মাটির উপর আনুমানিক ৫০০ বর্গমিটার অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত একটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির। সেটির সংস্কার চালানোর সময় বেরিয়ে আসে ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা কয়েক হাজার বছরের পুরনো সমাধিক্ষেত্রের।
ইতিহাসের পাতায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে থাকা মন্দিরগুলি পরিচিত ‘জায়েন্ট অফ মাল্টা’ নামে। আর তার নীচে ছড়িয়ে থাকা সুড়ঙ্গগুলির নাম ‘হাল সাফলেইয়েনি হাইপোজিয়াম’। ১৯৮০ সালে সেটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।
নব্য প্রস্তর যুগে নির্মিত মেগালিথিক মন্দির বা স্মৃতিস্তম্ভগুলির মধ্যে অন্যতম ‘জায়েন্ট অফ মাল্টা’। ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত মাল্টা দ্বীপরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দ্বীপ গোজ়োয় রয়েছে এই মেগালিথিক মন্দির। আর তার ভূগর্ভেই রয়েছে এক ‘অন্য পৃথিবী’।
নব্য প্রস্তর যুগ মানে মানুষ তখনও সভ্যতার পথে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। চাকার ব্যবহারে সদ্য হাতেখড়ি হয়েছে। সেই সময় দাঁড়িয়ে কী করে এমন আশ্চর্য ঐতিহাসিক নিদর্শন বানিয়ে ফেলা সম্ভব? এ নিয়ে মাল্টাবাসীদের মুখে এক প্রাচীন লোককথা শুনতে পাওয়া যায়।
সেই কিংবদন্তি অনুযায়ী, সানসুনা নামের এক দৈত্যাকার মহিলা সেই সময় গোজ়ো দ্বীপে এসেছিলেন। তিনি নিজের হাতে বৃহদাকার চুনাপাথরের চাঁই তুলে সেই স্মৃতিস্তম্ভটি বানিয়েছিলেন। তাঁর এক হাতে থাকত চুনাপাথরের চাঁই, অন্য হাতে থাকত তাঁর সন্তান। প্রচলিত এই লোককথা বাদে প্রস্তর যুগে এর নির্মাণ হওয়া নিয়ে আর কোনও কাহিনির উল্লেখ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না।
হেরিটেজ মাল্টার তথ্যানুসারে, ১৯০২ সালে সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ পরিষ্কার করে বাড়ি নির্মাণ করার কথা ভাবেন মাল্টাবাসীরা। তখন মন্দিরের ছাদের কিছুটা অংশ ভেঙে পড়ে। সেই সময় মাল্টার লোকজন ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা অসামান্য নির্মাণকার্যের সন্ধান পান।
এর পরেই ‘জায়েন্ট অফ মাল্টা’ সরকারের অধীনে চলে যায়। ১৯১১ সাল পর্যন্ত সেখানে খননকার্য চালানো হয়। দেখা যায়, মন্দিরটি প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত। উপরিস্তর, যা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত, মধ্যস্তর এবং নিম্নস্তর।
ভূর্গভস্থ সেই অংশই ইতিহাসের পাতায় ‘হাল সাফলেইয়েনি হাইপোজিয়াম’ নামে খ্যাত। ভূগর্ভে এটি প্রায় ৩৫ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত।
চুনাপাথর দিয়ে তৈরি এই মন্দির দেখলে কেউ বলবে না যে সেটি নব্য প্রস্তর যুগে নির্মিত। মন্দিরের ভূগর্ভস্থ অংশটি মূলত গোলকধাঁধা। সুড়ঙ্গ ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এক কোণ থেকে অপর কোণে। সুড়ঙ্গগুলির বিভিন্ন কোণে রয়েছে গোলাকৃতি ঘর। কোথাও কোথাও রয়েছে বড় করিডর।
মন্দির থেকে সমাধিক্ষেত্র, নির্মাণকার্যের জন্য সমস্ত পাথরগুলি কাটা হয়েছে অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে। দেওয়াল জুড়ে রয়েছে হরেক রকম নকশা। তবে সমাধিক্ষেত্র হিসাবে যে স্থান ব্যবহার করা হবে, সেই স্থানে করিডর, আলাদা আলাদা কক্ষ করার কারণ গবেষকদের কাছে অজানা।
আইএফএল সায়েন্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২০ সালে করা একটি গবেষণায় জানতে পারা গিয়েছে যে মাল্টার ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের দেওয়ালে আঁকিবুঁকি করা লাল বর্ণের নকশাগুলি সাধারণ নয়। দেওয়ালে কাটা সমস্ত নকশার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে সঙ্গীতের বিভিন্ন স্কেল এবং ধ্বনির। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এক কক্ষের সঙ্গে অন্য কক্ষের দেওয়ালে কাটা নকশার মধ্যে কম্পাঙ্কের মিল রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা সে সকল সুড়ঙ্গে বিভিন্ন আকৃতির মৃৎপাত্র, অলঙ্কার, পশুর মূর্তি প্রভৃতির সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলি বেশির ভাগই লাল গেরিমাটি দিয়ে তৈরি।
মাল্টার সুড়ঙ্গে পাওয়া এক বিখ্যাত ভাস্কর্য হল ‘দ্য স্লিপিং লেডি’। ভাস্কর্যটি দেখলে মনে হয় যেন কোনও মহিলা হাত-পা গুটিয়ে শুয়ে রয়েছেন। অনেকে মনে করেন সেই সময় লোকজন ‘প্রকৃতি মাতা’র মূর্তি হিসাবে এটি তৈরি করেছিলেন। তবে একদলের মতে, শায়িত এই মহিলা আসলে মৃত্যুর প্রতীক।
গল্প এখানেই শেষ নয়। সুড়ঙ্গ থেকে খুঁজে পাওয়া জিনিসের তালিকায় বাকি রয়েছে আরও নানা জিনিস। গবেষকেরা মাল্টার সুড়ঙ্গে সন্ধান পেয়েছেন প্রায় ৭০০০ মানুষের কঙ্কালেরও। তবে বর্তমান মানুষের কঙ্কালের সঙ্গে সেই কঙ্কালের কিছু বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও সাক্ষী থেকেছে মাল্টার গোপন সুড়ঙ্গগুলি। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৩ সাল, জার্মানি, ইটালি এবং জাপান তখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। চলছে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অক্ষশক্তি যে সমস্ত অঞ্চলে বোমাবর্ষণ করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম মাল্টা।
মাল্টাবাসীরা সেই সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত ‘জায়েন্ট অফ মাল্টা’র ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা সুড়ঙ্গগুলিতে আশ্রয় নেন। মন্দিরের অবশিষ্ট অংশগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সুড়ঙ্গে সেই বোমাবর্ষণের আঁচ পৌঁছোতে পারেনি।
মাল্টার এই গোপন সুড়ঙ্গগুলি সম্বন্ধে নানা তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেলেও, বহু প্রশ্নেরই উত্তরের খোঁজ গবেষকেরা এখনও করে চলেছেন। বর্তমানে এই স্থান বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে খ্যাত। বিশ্বের বহু প্রান্ত থেকে মানুষ এই প্রাগৈতিহাসিক সৃষ্টির নিদর্শন দেখতে যান।