একটা বিশ্বাসঘাতকতা, যার উপর ভর করে বজ্রকঠিন শত্রুর দুর্গেও ফাটল ধরাতে পারে যে কোনও ফৌজ। আর তাই কথায় আছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব সময় ভিতর থেকে খুলে যায় কেল্লার দরজা। কিন্তু, তাই বলে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ ইহুদি রাষ্ট্রে সেটা কি আদৌ সম্ভব? এত দিন উত্তর ‘না’ হলেও এ বার সেই অসাধ্যসাধন করে ফেলেছে ইরান। ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনীর অন্দরমহলে গুপ্তচর ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে তেহরান। সেই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জনপ্রিয় বলিউডি হিন্দি গানের একটি পঙ্ক্তির উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকেরা। সেটা হল, ‘শিকারি খুদ ইহাঁ শিকার হো গয়া’!
চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বায়ুসেনার দুই প্রযুক্তিবিদকে গ্রেফতার করে ইজ়রায়েল। ধৃতেরা তেল নফ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৫ লড়াকু জেটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ, ইরানি ফৌজকে তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি ছাউনির বিভিন্ন কৌশলগত এলাকা এবং হাতিয়ারের ছবিও পাচার করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া গোয়েন্দাদের রেডারে রয়েছেন আরও অন্তত আট জন সৈনিক। এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার যে প্রবল অস্বস্তির মুখে পড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
‘দ্য টাইম্স অফ ইজ়রায়েল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেফতারির পর গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেট, স্থলবাহিনী আইডিএফ (ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স) এবং ইহুদি পুলিশের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন বায়ুসেনার ওই দুই প্রযুক্তিবিদ। প্রাথমিক ভাবে তদন্তকারীদের অনুমান, অর্থের লোভে ইরানকে তথ্য পাচারে রাজি হন তাঁরা। সম্প্রতি, এ ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় তেল আভিভের গোয়েন্দা কর্তারা ভেঙে দেন তাঁদের নেটওয়ার্ক। কিন্তু, তার পরেও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা থামাননি দুই অভিযুক্ত। এর পরেই তাঁদের জালে তোলে পুলিশ।
গ্রেফতার হওয়া ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনীর দুই প্রযুক্তিবিদ কী কী তথ্য পাচার করেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘আর্মি রেডিয়ো’। তাদের দাবি, এক বছরের বেশি সময় ধরে তেহরানের গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেছেন তাঁরা। ইহুদি রাষ্ট্রের হাতে থাকা সবচেয়ে অত্যাধুনিক লড়াকু জেটের বিস্তারিত বিবরণ, কারিগরি নকশা, তেল নথ ঘাঁটির পরিকাঠামো এবং সেখান থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা সংক্রান্ত গোপন তথ্য শিয়া ফৌজের হাতে তুলে দিয়েছেন ওই দুই অভিযুক্ত। বিনিময়ে মোটা টাকা ঢুকেছে তাঁদের অ্যাকাউন্টে।
ইরানি গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে ধৃত ইহুদি সামরিক প্রযুক্তিবিদদের যোগাযোগের সময়কার একটি অডিয়ো ক্লিপ ইতিমধ্যেই ফাঁস করেছে ‘আর্মি রেডিয়ো’। সেখানে সরাসরি দর কষাকষির উল্লেখ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তথ্যপিছু ১,৩০০ ডলারে তাঁদের চরবৃত্তিতে রাজি করিয়ে ফেলে তেহরান। সাবেক পারস্যের হ্যান্ডলারদের মাধ্যমে তথ্য এবং ছবি পাচার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিন বেট। তবে তাঁদের টিকির নাগাল পায়নি ইহুদি গোয়েন্দা বাহিনী।
সংশ্লিষ্ট গ্রেফতারি নিয়ে আরও বিস্ফোরক খবর দিয়েছে ‘কান পাবলিক ব্রডকাস্টার’। তাদের দাবি, ইজ়রায়েলি জেট ইঞ্জিনের নকশা এবং যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষকের মুখের ছবি ইরানি গুপ্তচরদের হাতে তুলে দেন ধৃত দুই প্রযুক্তিবিদ। কিন্তু তাতে তেহরান খুশি না হওয়ায় বায়ুসেনা ঘাঁটির কৌশলগত এলাকাগুলির ছবি পাচার করেন তাঁরা। এর মধ্যে আছে কন্ট্রোল টাওয়ার, রানওয়ে, ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জামের ডিপো এবং রেডার স্টেশন। তবে এর জন্য বাড়তি ডলার তাঁদের দেয়নি সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।
‘আর্মি রেডিয়ো’ আবার জানিয়েছে, একটি ইজ়রায়েলি লড়াকু জেটের ছবি হ্যান্ডলার মারফত তেহরান পাঠান ধৃত দুই প্রযুক্তিবিদ। এর জন্য কোনও টাকা নেননি তাঁরা। পরে তাঁদের ইহুদি বিমানবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল তোমের বারকে হত্যার নির্দেশ দেয় ইরানি ফৌজ। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, এ ব্যাপারে সরাসরি কোনও ইতিবাচক উত্তর দেননি তাঁরা। তবে পারস্যের এজেন্টকে ‘চেষ্টা করে দেখব’ বলে জানান ওই দুই অভিযুক্ত। এর পর ধৃতেরা খুনের ছক কষছিলেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইজ়রায়েলি গোয়েন্দা সূত্রে খবর, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন গভির, অর্থমন্ত্রী বেজ়ালেল স্মোট্রিচ এবং আইডিএফের অবসরপ্রাপ্ত চিফ অফ স্টাফ (সেনাপ্রধান) লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারজ়ি হালেভির বাসভবন এবং সেই এলাকার যাবতীয় তথ্য জোগাড় করতে অভিযুক্তদের কাজে লাগায় ইরান। হেভিওয়েট এই সমস্ত রাজনৈতিক নেতা এবং সেনা অফিসারদের বাড়ির সামনের রাস্তা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দিনের রুটিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়ার কথা ছিল তাঁদের।
এ ছাড়া রাজধানী তেল আভিভের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি এলাকা রথচাইল্ড ও কাপলাল স্ট্রিট, সেখানকার সামরিক ঘাঁটি এবং বায়ুসেনার পদস্থ লড়াকু-পাইলটদের বাসভবনের ছবি ধৃত দুই প্রযুক্তিবিদের কাছে চেয়েছিল তেহরান। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, গত বছর (২০২৫ সাল) ইজ়রায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) আয়রন ডোমের ছবি এবং তার কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত কিছু তথ্য ইরানের হাতে তুলে দেন তাঁরা। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এর জেরে হাইপারসনিক (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রে ইহুদি রাষ্ট্রটিকে নিশানা করতে সুবিধা হয়েছে উপসাগরীয় দেশটির শিয়া ফৌজের।
গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইজ়রায়েল। ইহুদি গোয়েন্দাদের দাবি, লড়াই শুরু হওয়ার মুখে বিমানবাহিনীর দুই প্রযুক্তিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তেহরান। সংঘর্ষ বিলম্বিত করার নির্দেশ দেওয়া হয় তাঁদের। কিন্তু অভিযুক্তেরা তাতে রাজি না হওয়ায় ভেস্তে যায় ওই পরিকল্পনা। তদন্তকারীদের অনুমান, ধৃতদের গুপ্তচরবৃত্তির খবর জানতেন ওই ঘাঁটির আরও আট জন সৈনিক। যদিও কোনও এক অজানা কারণে কর্তৃপক্ষের কাছে এই নিয়ে মুখ খোলেননি তাঁরা।
ইজ়রায়েলি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ঘটনার পর তেল নফ বিমানঘাঁটির শীর্ষ কমান্ডারদের তলব করে শিন বেট। গোয়েন্দা সংস্থার দফতরে হাজিরা দেওয়ার পর ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন তাঁরা। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তিনটি সংস্থা যৌথ ভাবে তদন্ত করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। শিন বেটের পাশাপাশি সেখানে নাম আছে সেনা পুলিশ এবং ইজ়রায়েলি পুলিশের। পাশাপাশি, নাগরিকদের সতর্ক করে একটি অ্যাডভাইসরি জারি করেছে তাঁর দফতর।
তেল আভিভের জারি করা অ্যাডভাইসরিতে হুঁশিয়ারির সুরে বলা হয়েছে, ‘‘সেনা হোক বা কোনও সাধারণ নাগরিক, ইজ়রায়েলের শত্রু রাষ্ট্র বা বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে না কেউই। গোপনে কারও সঙ্গে দেখা করা বা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসাবে গণ্য করা হবে। অভিযোগ প্রমাণ হলে চরম ফল ভোগ করতে হতে পারে।’’
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাত চলাকালীন অতি গোপনীয় দু’টি গোয়েন্দা নথি ফাঁস করে আমেরিকার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস। ওই প্রতিবেদনে ছিল তেহরানের উপর তেল আভিভের সম্ভাব্য আক্রমণের সামরিক প্রস্তুতির বিবরণ। ন্যাশনাল জিয়োস্প্যাকিয়াল-ইনটেলিজেন্স এজেন্সির (এনজিএ) মহাফেজখানা থেকে নথিগুলি সর্বসমক্ষে চলে এসেছে বলে জানিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ওই গণমাধ্যম। বিষয়টি নিয়ে দুনিয়া জুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি অনুযায়ী, ফাঁস হওয়া নথিগুলি ২০২৪ সালের ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের। এগুলি ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। নথিতে আমেরিকার গুপ্তচর উপগ্রহের পাঠানো ছবি ও তার ব্যাখ্যাও ছিল। শিয়া মুলুকটির উপর হামলা চালাতে কী ভাবে ইহুদিরা প্রস্তুতি নিচ্ছে, কোন কোন হাতিয়ার ব্যবহার হতে পারে, সেই সংক্রান্ত তথ্যও ছিল সেখানে।
ফাঁস হওয়া দু’টি নথির মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল, ‘ইজ়রায়েল: ইরানে প্রত্যাঘাতের জন্য বিমানবাহিনীর নিরন্তর অনুশীলন’। ওই নথিতে ছিল ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনীর সামরিক মহড়ার একাধিক ছবি। জানা যায়, মাঝ-আকাশে লড়াকু জেটে জ্বালানি ভরার অনুশীলনে জোর দিচ্ছে ইহুদি ফৌজ। যুদ্ধাভ্যাসে তাঁরা ৪ থেকে ৫ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা ব্যবহার করেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় নথিতে কৌশলগত এলাকায় আইডিএফ হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফাঁস হওয়া রিপোর্টে ইহুদি ফৌজের অনুশীলনের উল্লেখ থাকলেও ছিল না কোনও উপগ্রহচিত্র। সেগুলি মার্কিন গোয়েন্দারা ভাল করে পর্যালোচনা করেছেন বলে জানানো হয়েছিল। ওই সময় ইহুদি ফৌজ সংক্রান্ত গুপ্ত সামরিক নথি ফাঁস হওয়া নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করেন আমেরিকার পদস্থ সেনাকর্তাদের একাংশ।
গুপ্তচরবৃত্তির দুনিয়ায় ইজ়রায়েলের আলাদা স্বীকৃতি রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইহুদি রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই একের পর এক অসম্ভব অভিযানে দুর্দান্ত পারফর্ম করে সারা দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে তাঁদের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ। ইরাক থেকে রাশিয়ার তৈরি মিগ-২১ লড়াকু জেট ‘চুরি’ করে আনা হোক বা ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীকে খুন, কখনও ব্যর্থ হয়নি তারা।
ইরানের অন্দরেও ইজ়রায়েলি গুপ্তচরদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর জেরে গত দু’-তিন বছরে তেহরানের একের পর এক শীর্ষ কমান্ডারকে বিমানহামলায় নিকেশ করেছে তেল অভিভ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সঙ্গে যৌথ অভিযানে সাবেক পারস্যের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে উড়িয়ে দেয় ইহুদি বায়ুসেনা। এই ঘটনাগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে শত্রুর ঘরে সিঁদ কাটতে সক্ষম হয়েছে উপসাগরীয় শিয়া মুলুক? উঠছে প্রশ্ন।