উপকূল লাগোয়া সমুদ্রের বিপুল জলরাশির তলায় চাপা পড়ে তরল সোনার ভান্ডার, যার হদিস মিলতেই রাতারাতি বদলে যায় ভাগ্য! এ-হেন কুবেরের ধন হাতে চলে আসার পরও হুঁশ হারায়নি সেখানকার সরকার। উল্টে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ওই সম্পত্তির উপর ভর করে কয়েক লক্ষ কোটি ডলারের তহবিল গড়ে তোলে তারা। এই এক সিদ্ধান্তই ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’টিকে বিশ্বের অন্যতম সুখী রাষ্ট্রে বদলে যেতে সাহায্যে করেছে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নরওয়ে। সেখানকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল ছ’মাস দিন ও ছ’মাস রাত্রি। ফলে ওই এলাকায় মধ্যরাত্রেও মাঝ-আকাশে নাচতে দেখা যায় সূর্যকে। এ-হেন নরওয়ের ইতিহাসের একটা বড় অংশ দখল করে রয়েছে দুঃসাহসিক অভিযানপ্রেমী ও যুদ্ধবাজ ভাইকিংরা। তবে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, অসলোর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইট-কাঠ-পাথরে, যাকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থা বললে অত্যুক্তি হবে না।
১৯৬৯ সালে উত্তর সাগরে খনিজ তেলের হদিস পায় নরওয়ের সরকার। সেই আবিষ্কার অসলোর তৎকালীন রাষ্ট্রনেতাদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়নি। উল্টে তরল সোনার খোঁজ মিলতেই একটি প্রশ্ন তোলেন ভাইকিং দেশটির দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য ছিল, একসময় ফুরিয়ে যাবে তরল সোনার ভান্ডার। তখন রাতারাতি দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়লে কী ভাবে বজায় থাকবে ঠাটবাট?
এই চিন্তা থেকেই গত শতাব্দীতে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’, যার নাম দেওয়া হয় ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’। বর্তমানে এর তহবিলে রয়েছে ২১.২ লক্ষ কোটির বেশি নরওয়েজিয়ান ক্রোনার। মার্কিন মুদ্রা ডলারের নিরিখে টাকার অঙ্কটা দুই লক্ষ কোটি বলে জানা গিয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) প্রায় অর্ধেক অর্থ আছে ওই প্রতিষ্ঠানের সিন্দুকে!
‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’ গড়ে তোলার নেপথ্যে অসলোর দু’টি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, অর্থনীতির কোনও ক্ষতি না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সম্পদের উপর ভর করে বিপুল অর্থের একটি সার্বভৌম তহবিল প্রতিষ্ঠা। অচিরেই ওই সংস্থাটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী লগ্নিকারীদের মধ্যে জায়গা করে নেয়। পাশাপাশি, এটি নরওয়ের আর্থিক ভিত্তিকে মজবুত করেছিল, যা একে দুনিয়ার অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে সাহায্য করে।
‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’-এর জন্মলগ্নে নরওয়ের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দু’টি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি কোনও দিনই শুধুমাত্র খনিজ তেলভিত্তিক অর্থনীতির একটি তহবিল ছিল না। বরং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ইঞ্জিন হিসাবে তা আত্মপ্রকাশ করে। ফলে তরল সোনার উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার বহু বছর পরেও সংস্থাটি অসলোকে লাগাতার রাজস্ব জুগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে এর মুনাফার অঙ্ক।
গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকে বিস্তীর্ণ উপকূল সংলগ্ন এলাকায় খনিজ তেলের ভান্ডারের হদিস পাওয়ার পর নরওয়ের অর্থনীতিতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। হঠাৎ করে হু-হু করে বাড়তে থাকে জাতীয় আয়। তবে এর ঝুঁকি সম্পর্কে গোড়া থেকেই ওয়াকিবহাল ছিলেন অসলোর রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ফলে কখনওই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তরল সোনা উত্তোলন করেননি তাঁরা। ১৯৭৩ সালে আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধ চলাকালীন তেলের দাম অস্থির হলে আরও সতর্ক হয় অসলো।
এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পরিবর্তন এড়াতে এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকে বড় সিদ্ধান্ত নেয় উত্তর ইউরোপের ওই ভাইকিং রাষ্ট্র। প্রাথমিক ভাবে অসলো ঠিক করে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তরল সোনা উত্তোলন এবং ব্যবহার করবে তারা। ১৯৯০ সালে এই নিয়ে একটি বিশেষ আইন পাশ করে নরওয়ের পার্লামেন্ট। তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’। যদিও তাতে লেনদেন হতে আরও ছ’বছর সময় লেগে গিয়েছিল।
১৯৯৬ সালে সংশ্লিষ্ট তহবিলে প্রথম বার টাকা জমানো শুরু করে অসলো প্রশাসন। ওই বছর পেট্রোলিয়াম রাজস্বের উদ্বৃত্ত অর্থ সেখানে জমা দিয়েছিল নরওয়ের সরকার। পরবর্তী বছরগুলিতেও তা অব্যাহত রাখে তারা। বিশ্লেষকদের দাবি, এর ফলে তরল সোনা সংরক্ষণ ও বিনিয়োগে সক্ষম হয় ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’। পাশাপাশি, এর মাধ্যমে তৎকালীন ও ভবিষ্যৎ উভয় প্রজন্মকেই উপকৃত করতে পেরেছিল তারা। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার পরও তা বজায় ছিল বলে জানা গিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তহবিল তৈরির কয়েক বছরের মধ্যেই সেখানকার অর্থ সম্পূর্ণ ভাবে বিদেশে লগ্নির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে নরওয়ে প্রশাসন। এটা ঘরোয়া বাজারের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অসলোকে সাহায্য করেছিল। তা ছাড়া, এই সংস্থার উপর ভিত্তি করে মজুরি ও মুদ্রার উপর আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সক্ষম হয় তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ফলে ভরসাযোগ্য ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীতে বদলে যেতে ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’-এর বেশি দিন সময় লাগেনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) পর্যন্ত বিশ্বের মোট ৬৮টি দেশে বিনিয়োগ করেছে নরওয়ের এই প্রতিষ্ঠান। সেই তালিকায় নাম আছে ভারতেরও। এ দেশে অনুমানিক ৯৬টির বেশি সংস্থার স্টক কিনে রেখেছে তারা, যার বাজারমূল্য ১.৪১ লক্ষ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। এ ছাড়াও ১০ হাজার ২০০টির বেশি ব্যক্তিগত হোল্ডিং রয়েছে ভাইকিং রাষ্ট্রের সংস্থার কাছে।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, বর্তমানে বিশ্বের তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির প্রায় দেড় শতাংশের মালিকানা রয়েছে নরওয়ের তহবিলটির কাছে। ফলে দুনিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তি বাড়ছে অসলোর ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’-এরও। সংস্থাটি কোনও একটি দেশের উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে সার্বিক ভাবে প্রতি বছরই তাদের বৃদ্ধির সূচক ঠিক থাকছে বলে মনে করেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার শেয়ার বা ইক্যুইটিকে নরওয়ের এই তহবিলটির মেরুদণ্ড বলা হয়ে থাকে। কারণ, মোট বাজারমূল্যের ৭১ শতাংশই সেখান থেকে পাচ্ছে ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ কম-বেশি ১৫.১ লক্ষ কোটি নরওয়েজিয়ান ক্রোনার বলে জানা গিয়েছে। মোট ৬০টি দেশের ৭,২০০-র বেশি সংস্থার স্টকে লগ্নি আছে অসলোর এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। কিছু ক্ষেত্রে ছোট ব্যবসার অংশীদারিও নিয়েছে তারা।
শেয়ার বা ইক্যুইটিকে বাদ দিলে স্থায়ী আয়ের মতো ক্ষেত্রগুলিতে মোট বাজারমূল্যের ২৬.৫ শতাংশ লগ্নি করে রেখেছে ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’। টাকার অঙ্কে সেটা ৫.৬ লক্ষ কোটি নরওয়েজিয়ান ক্রোনার। মোট ৪৮টি দেশের সরকারি, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা দ্বারা জারি করা বন্ড এর আওতাভুক্ত। স্টকের তুলনায় সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ অনেক বেশি কম ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া সেখান থেকে স্থিতিশীল আয় করে থাকে অসলোর ওই তহবিল।
এ ছাড়া ১৪টি দেশে ১,৩৮৯টি রিয়্যাল এস্টেটেও বিনিয়োগ করে রেখেছে নরওয়ের ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’। ওই লগ্নির পরিমাণ ৩৭ হাজার ২০০ কোটি নরওয়েজিয়ান ক্রোনার। পাশাপাশি পাঁচটি দেশের পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি পরিকাঠামোতেও লগ্নি রয়েছে তাদের। এগুলি বিনিয়োগকারী হিসাবে অসলোর তহবিলটির অবস্থান মজবুত করেছে।
গোড়ার দিকে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটা বড় অংশ সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখত নরওয়ের সরকার। পরবর্তী কালে এই অর্থই বিদেশের শেয়ার বাজার, সরকারি বন্ড, রিয়্যাল এস্টেট বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে লগ্নি করতে থাকে তারা। বর্তমানে তেল ও গ্যাসের থেকে প্রাপ্ত টাকা এর মূল আয়ের উৎস নয়। সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগগুলি থেকে তহবিলটিতে মোট মূল্যের অর্ধেকের বেশি রিটার্ন আসছে বলে জানা গিয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে বিদেশের বাজারে লগ্নি শুরু করা অসলোর ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’-এর বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠতে এক দশকের বেশি সময় লেগেছিল। ২০০০ সাল নাগাদ তহবিলটির অর্থের পরিমাণ এক লক্ষ কোটি নরওয়েজিয়ান ক্রোনারে পৌঁছে যায়। ২০১৩ সালে আরও বেড়ে টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় পাঁচ লক্ষ কোটি ক্রোনার। ২০২৫ সালেও এর সূচকের বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।
তহবিলটির টাকা খরচ বা লগ্নির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলে নরওয়ের সরকার। প্রতি বছর মোট বাজারমূল্যের একটা ছোট অংশ ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে থাকে অসলোর ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেটা জাতীয় বাজেটের সর্বোচ্চ এক পঞ্চাংশ। ফলে ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’ নিজের মূলধন অক্ষত রাখতে পারছে। এর লগ্নি থেকে প্রাপ্ত রিটার্নের একটা বড় অংশ জনসেবামূলক কাজে খরচ করে থাকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’।
আর্থিক মন্দা পরিস্থিতিতেও এই তহবিলের অর্থ ব্যবহার করতে পারে নরওয়ের সরকার। তা ছাড়া এর সাহায্যে বাজেটঘাটতি পূরণের নিয়মও রয়েছে সেখানে। তবে অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির টাকায় হাত দিতে পারবে না অসলো প্রশাসন। তখন কেবলমাত্র রিটার্নের টাকা জনসেবার কাজে ব্যবহার করা যাবে।
উত্তর সাগরের খনিজ তেলের ভান্ডার একদিন ফুরিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করে নরওয়ের সরকার। সেই কারণেই বিশ্বব্যাপী লগ্নির একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে অসলো। এর মাধ্যমে আগামী দিনেও স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো ও অবসরকালীন ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক কাজ চালিয়ে যেতে পারবে বলে আশাবাদী উত্তর ইউরোপের ওই ভাইকিং রাষ্ট্র।