পারস্যের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ! একের পর এক রণতরী পাঠিয়ে ইরানকে চক্রব্যূহে ঘিরছে মার্কিন নৌবাহিনী। পাল্টা হরমুজ় প্রণালীতে লড়াইয়ের মহড়ায় মত্ত তেহরান। এ-হেন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই ভারত ও আফগানিস্তানকে একসঙ্গে হামলার হুমকি দিল পাকিস্তান। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের হুঁশিয়ারিতে নড়েচড়ে বসেছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি, এই ঘটনায় দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা যে তীব্র হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
সম্প্রতি ‘ফ্রান্স-২৪’ নামের একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজ়া আসিফ। সেখানে জঙ্গিহামলা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন তিনি, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। খোয়াজ়ার অভিযোগ, ‘‘সন্ত্রাসবাদের নামে ইসলামাবাদের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ (প্রক্সি ওয়ার) চালাচ্ছে নয়াদিল্লি ও কাবুল। এই অবস্থায় রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের পক্ষে হাত গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়।’’
পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি ও কাবুল একই পৃষ্ঠার দুই দিক। এই বিষয়ে সঞ্চালকের একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এটা ঠিক যে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি কাবুলে রয়েছে। কিন্তু কাদের কথায় আমাদের উপরে হামলা চালাচ্ছে তারা? কে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে? রোজ আমরা রক্তাক্ত হচ্ছি। নিরীহ নাগরিকদের মৃত্যু হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বেশি দিন চলতে পারে না। আমরা প্রয়োজনে ফের বিমানহামলা করব। যাবতীয় পদক্ষেপের জন্য আমাদের বিমানবাহিনী প্রস্তুত।’’
এ বার কি তা হলে নয়াদিল্লিতে হামলার পরিকল্পনা করছে পাক বায়ুসেনা? ‘ফ্রান্স-২৪’-এর সঞ্চালকের এই প্রশ্নের জবাবে খোয়াজ়া আসিফ বলেন, ‘‘ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দিন দিন বাড়ছে। ফলে প্রয়োজন হলে দুই প্রতিবেশীর রাজধানীকেই আমরা নিশানা করব। কারণ, আমরা ছায়াযুদ্ধের (প্রক্সি ওয়ার) মুখোমুখি হয়েছি। আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের আছে।’’ তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পরই উপমহাদেশ জুড়ে হইচই পড়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সাক্ষাৎকারে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, নানা ইস্যুতে সংঘাতের পারদ চড়লেও ইসলামাবাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসছে না নয়াদিল্লি, যা আরও বেশি অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে খোয়াজ়া আসিফ বলেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে ভারতের কোনও রকমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ নেই। তবে কাবুলের তালিবান সরকার আমাদের সঙ্গে কথা বলছে। ফলে বন্ধু রাষ্ট্রগুলি মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’’
পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে বেশ কয়েক বার আলোচনার টেবিলে বসেছে ইসলামাবাদ ও কাবুল। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের মধ্যে বিবাদ মেটাতে আন্তরিক ভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে তুরস্ক ও কাতার। তাঁদের মধ্যস্থতায় ইস্তানবুল ও দোহায় তালিবান নেতৃত্বের সঙ্গে তিন-চার বার বৈঠক করেছি। এমনকি কাবুলেও গিয়েছিলাম। তবে কোনও লাভ হয়নি। ছায়াযুদ্ধ (প্রক্সি ওয়ার) থামানোর কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না তারা। ফলে আমাদেরও অন্য কিছু ভাবতে হচ্ছে।’’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শেষ ১০ মাসে অন্তত তিন থেকে চার বার ভারত আক্রমণের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাঁকে বাদ দিলে এ ব্যাপারে সুর চড়ানোর নিরিখে পিছিয়ে নেই ইসলামাবাদের সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। বর্তমানে তাঁর হাতেই রয়েছে পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির যাবতীয় পরমাণু হাতিয়ার। তা ছাড়া গত বছরই (পড়ুন ২০২৫ সাল) চিনা লালফৌজের কায়দায় একটি বিশেষ রকেট বাহিনী তৈরির নির্দেশ দেন তিনি।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একযোগে ভারত ও আফগানিস্তানকে যুদ্ধের হুমকি দেওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই হুঁশিয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির উপর চাপ তৈরির কৌশলও রয়েছে তাঁর। এককথায় জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফয়দা নিতে চাইছে ইসলামাবাদ। তা ছাড়া নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের।
চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। কোনও অবস্থাতেই তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করুক, চাইছে না ওয়াশিংটন। আর তাই পারস্য উপসাগরের শিয়া মুলুকটির উপর চাপ বাড়াতে সেখানে একের পর এক রণতরী পাঠিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাল্টা হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিতে শোনা গিয়েছে সেখানকার ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে।
মার্কিন নৌসেনা পারস্য উপসাগরে পৌঁছোনোর পর সংঘাত এড়াতে আলোচনায় বসে দু’পক্ষ। এখনও পর্যন্ত তাতে কোনও সমাধানসূত্র বার হয়নি। ফলে তেহরানে উপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের আশঙ্কা বাড়ছে। ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে আক্রমণের নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প। এ-হেন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের রক্তচাপ বাড়িয়ে শিয়া মুলুকটির পাশে দাঁড়িয়েছে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার। যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের পক্ষে অস্ত্র ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন হিন্দুকুশের যোদ্ধারা।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এর জেরে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী পঠানভূমির সীমান্তে আগুন ধরাতে চাইছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের ফৌজ তাতে সাফল্য পেলে তালিবানের পক্ষে ইরানের জন্য অস্ত্র ধরা যে কঠিন হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সংঘাত পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত খোয়াজ়া আসিফদের নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্নেহধন্য’ করে তুলতে পারে, আর্থিক সঙ্কট মেটাতে যা তাঁদের একান্ত প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, জানুয়ারির শেষ থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাড়তে শুরু করে ভারতের গুরুত্ব। ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির সঙ্গে মেগা বাণিজ্যচুক্তি সেরেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় পণ্যে শুল্কের পরিমাণ ৫০ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তা ছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি একরকম নিশ্চিত করে ফেলেছে ওয়াশিংটন। যদিও এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সইসাবুদ করেনি দুই দেশ।
ফেব্রুয়ারিতে ভারতসফরে এসে নয়াদিল্লির সঙ্গে ১১৪টি সাড়ে চার প্রজন্মের রাফাল লড়াকু জেটের চুক্তি সারেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। দিল্লিতে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) সম্মেলনেও যোগ দিতে দেখা গিয়েছে একগুচ্ছ পশ্চিমি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। সিলিকন উপত্যকার সরবরাহ শৃঙ্খলকে মজবুত করতে এবং চিনা নির্ভরশীলতা কমাতে গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের একটি জোট তৈরি করে আমেরিকা। আনুষ্ঠানিক ভাবে তারও অংশ হয়েছে ভারত।
পর পর এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশ ভারতকে আরও বেশি করে কাছে পেতে আগ্রহী। রাশিয়া ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ভাঙতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তাঁরা। সেই লক্ষ্যে ইসলামাবাদের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রেও সমস্যা নেই তাঁদের। আর তাই একযোগে দিল্লি ও কাবুল আক্রমণের হুমকি দিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছেন খোয়াজ়া আসিফ।
তবে মুখে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিলেও পাকিস্তানের পক্ষে একসঙ্গে দুই প্রতিবেশীকে নিশানা করা বেশ কঠিন। কারণ, সে ক্ষেত্রে দুই ফ্রন্টে লড়তে হবে ইসলামাবাদকে, যা রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের কাছে আত্মহত্যার শামিল। গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ভারতীয় ফৌজের হাতে ‘অপারেশন সিঁদুরে’ মার খাওয়ার স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেননি তাঁরা। নয়াদিল্লির ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষত এখনও সারিয়ে উঠতে পারেনি পশ্চিমের প্রতিবেশীর একাধিক বিমানঘাঁটি।
২০২৫ সালে তালিবান সরকারের আফগান লড়াকুদের সঙ্গে বেশ কয়েক বার সীমান্ত সংঘাতে জড়ায় পাক সেনা। পঠানভূমির আকাশসীমা লঙ্ঘন করে সেখানে ইসলামাবাদের বিমানবাহিনীকে বোমাবর্ষণ করতে দেখা গিয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের কথায়, জঙ্গিদের গুপ্ত ঠিকানায় বিমানহামলা চালিয়েছেন তাঁরা। যদিও হিন্দুকুশের কোলের দেশটি থেকে নিরীহ মহিলা ও শিশুদের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে। তার পরই প্রত্যাঘাত শানায় কাবুল।
আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের সেই হামলায় সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে পাক ফৌজ। সেখানকার কিছু কিছু জায়গায় বাঙ্কার ছেড়ে পালাতেও হয় তাঁদের। ওই ঘটনায় দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক যে রাতারাতি তলানিতে চলে যায়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে ইসলামাবাদ। সেখানে বলা হয়েছে, তাদের দু’জনের মধ্যে যে কেউ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশ যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করবে।
পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। সেটা হল ট্রাম্পের শান্তি সমঝোতা অনুযায়ী, প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকায় বাহিনী মোতায়েন করবে ইসলামাবাদ। ইজ়রায়েলি ফৌজের নির্দেশমতো সেখানে কাজ করতে হবে তাদের। এতে সংখ্যার নিরিখে রাওয়ালপিন্ডির সেনার শক্তি যে কমবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে হামলা চালানোর মতো দুঃসাহস দেখানো ফিল্ড মার্শাল মুনিরের পক্ষে একরকম অসম্ভব, বলছেন বিশ্লেষকেরা।