ঠান্ডা ফলের গায়ে হাত দিলেই ছেঁকা লাগার উপক্রম। ভ্লাদিমির পুতিনের দেশে লাগামছাড়া দামে বিকোচ্ছে শসা। রাশিয়ান স্যালাড হোক বা নিত্য দিনের খাবারের তালিকা, শসা পাতে রাখতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হওয়ার জোগাড় রাশিয়ার আম নাগরিকের। ফেব্রুয়ারি পড়তেই হঠাৎ করে পুতিনের দেশে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে শসার দাম। রাশিয়া নিজেরাই শসার চাষ করে। বিদেশ থেকে যা আমদানি করে সেটি হল কলা। সেই কলার দামকেও টপকে গিয়েছে দেশে ফলন হওয়া শসা।
রাশিয়ার প্রধান ফলগুলির তালিকায় শসা অন্যতম। মস্কো-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে শসার দাম প্রতি কেজিতে ৩০০ রুবল ছুঁয়েছে। প্রতি কেজির দাম ভারতীয় মুদ্রায় ৩৮৫ টাকা। বিদেশ থেকে আমদানি করা ফল বা মাংসের দামের সমান হয়েছে রোজের খাদ্যতালিকায় থাকা প্রয়োজনীয় ফলটি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে নতুন বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শসার দাম ১১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে।
হেঁশেলের নিত্যপ্রয়োজনীয় ফল ‘সোনার দরে’ কিনতে হচ্ছে ছা-পোষা রুশ নাগরিককে। শীতের মরসুমে সাধারণত শসার দাম চড়ার দিকেই থাকে দেশটিতে। এই বছর সেই দামের দ্বিগুণেরও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে ফল। কোনও কোনও জায়গায় আরও চড়া দাম। চাহিদা বেশি জোগান কম থাকায় অনেক দোকানই প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে শসা বিক্রি করছে। সাধারণ মানুষ মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
এরই মাঝে সাইবেরিয়ায় সুপার মার্কেটগুলিতে ক্রেতাদের শসা কেনার পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত করে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার প্রথম সারির একটি সংবাদপত্র পাঠকের বাড়ি বাড়ি সংবাদপত্রের সঙ্গে বিনামূল্যে শসার বীজ পাঠাতে শুরু করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ নিজস্ব ফলনের মাধ্যমে চাহিদা মেটাতে পারেন।
আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে পুতিনের সরকারের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে রাশিয়ার অন্দরে। শসার দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ আমজনতা। চলতি বছরের শেষের দিকে নির্বাচন রয়েছে রাশিয়ায়। শসার দাম বেলাগাম হওয়ায় রুশ আইনপ্রণেতারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সদস্যেরাও। অ্যান্টি মোনোপলি রেগুলেটর কমিটি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করেছে।
সাধারণ এই ফল ফলান যাঁরা এবং খুচরো বিক্রেতাদের কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছে একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি। পুতিনের সরকারের কৃষি মন্ত্রক অবশ্য জানিয়েছে শসার আগুন দামের নেপথ্যে রয়েছে ঋতুগত কারণ। সাধারণ একটি ফলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মরসুমি পরিবর্তনের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সরকার। আঙুল তুলতে শুরু করেছেন বিরোধীরা।
রুশ পার্লামেন্টে ‘আ জাস্ট রাশিয়া’ পার্টির নেতা সের্গেই মিরোনভ প্রকাশ্যে পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। তিনি বক্তৃতা করার সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘‘এই শীতে রাশিয়ার দোকানগুলিতে শসা একটি নতুন সুস্বাদু খাবার হয়ে উঠেছে।’’ গত বছরে একই ভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল আলুর। সেই সময় একই ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছিল পুতিনের সরকার বলে তোপ দেগেছেন প্রাক্তন প্যারাট্রুপার ও রাজনীতিবিদ মিরোনভ। মিরোনভের দল এবং কমিউনিস্ট পার্টি, দুই দলেরই রুশ সংসদের নিম্নকক্ষ ডুমাতে আসন রয়েছে। তারা মৌলিক খাদ্যদ্রব্যের উপর খুচরো বিক্রেতাদের নির্দিষ্ট দামের সীমা নির্ধারণে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করার পরামর্শও দিয়েছে।
রাশিয়ার কৃষি বিভাগের আধিকারিকদের দাবি, শীতকালে এমনিতেই শসার ফলন কম হয়। শীতকালে শসার উৎপাদন সাধারণত বেশি ব্যয়বহুল। গ্রিন হাউস পরিচালন খরচ এবং প্রাকৃতিক ফলন কম থাকা, দুইয়ের যোগফল এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। শসাচাষিরা আশ্বস্ত করেছেন যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ মসৃণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তাঁদের আশা, আগামী মাসে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
মস্কোর ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা ইয়েভগেনি পপভ সমাজমাধ্যমে শসার মাত্রাতিরিক্ত দামের সমস্যাটিকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করতেই ক্ষোভের আগুন ছড়়িয়েছে। তাঁর দাবি, শসার দাম কমবে এবং রাশিয়া এই পণ্যের ক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়িই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। তাঁর এই পোস্টটি ঘিরে বিতর্ক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। রুশ নাগরিকেরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নেটমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানিয়েছেন, শসা এবং টম্যাটোর দাম অসহনীয়, একসময় সরকার বলত ডিম সোনালি (কারণ এগুলো এত দামি ছিল।) এখন শসা ‘সোনালি’। অর্থাৎ, সোনার দামের মতোই বিক্রি হচ্ছে ফলটি।
সাধারণ একটি পণ্যের হঠাৎ করে দামবৃদ্ধি নিয়ে ওয়াকিবহল মহলের মত, শসার দামের এই ঊর্ধ্বগতি বিচ্ছিন্ন নয়। বছরের শুরু থেকেই সামগ্রিক ভাবে জীবনধারণের খরচ রাশিয়ায় ২.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আংশিক কারণ হিসাবে যুক্তমূল্য কর (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট) বৃদ্ধিকেই দায়ী করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা। ২০২৬ সাল থেকে যুক্তমূল্য (ভ্যাট) ২০ থেকে ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেশ কিছু দিন ধরে রাশিয়ায় পেট্রলের দাম, বিদ্যুৎ বিল এবং আবাসন খরচ মারাত্মক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ এই আর্থিক বোঝা বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। শসার দাম বৃদ্ধি তাঁদের আরও চিন্তিত করে তুলছে।
রাশিয়ায় যে মহামন্দার ঢেউ আছড়ে পড়তে চলেছে তা গত বছরই কবুল করে নিয়েছিলেন অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী ম্যাক্সিম রেশেতনিকভ। আর্থিক মন্দা আগামী দিনে আরও জেঁকে বসতে চলেছে সাবেক সোভিয়েত দেশে। সমস্ত সূচকই নিম্নমুখী। ধীরে ধীরে মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, এই নিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনকেও সতর্ক করেছিলেন রেশেতনিকভ।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় প্রতিরক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে রাশিয়া। এই যুদ্ধ গোটা বিশ্ববাজারেই এক বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। রাশিয়ার সামরিক-কেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার ফলে অসামরিক খাতে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। শিল্পক্ষেত্রে ভর্তুকি কমছে।
এর আগে ঢালাও ভর্তুকি গ্রিন হাউস শিল্পকে চাঙ্গা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ এবং পরবর্তী খসড়া তৈরির ফলে শ্রমিক সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে রুশ দেশে।
প্রায় একই কথা শোনা গিয়েছে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনার গলায়। সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘‘মস্কোর অর্থনীতি থেকে অতিরিক্ত উত্তাপ নির্গত হচ্ছে।’’ তবে বিশ্লেষকদের দাবি, এখনই সামরিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না পূর্ব ইউরোপের দেশটি। কারণ, মুদ্রাস্ফীতি মস্কোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির নেপথ্যে পুতিন প্রশাসনের শুল্কনীতিকেও দায়ী করেছে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। গত বছর ডলারের নিরিখে রুশ মুদ্রা রুবলের দাম অনেকটা পড়ে গিয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মস্কোর উপর বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপায় ওয়াশিংটন। রুবলের দামের পতনের সেটিই মোক্ষম কারণ বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকেরা। তবে বছরের শুরুতে পতনের ধাক্কা কিছুটা হলেও সামলে উঠেছে রুবল।
গত বছরের মাঝামাঝি আর্থিক অবস্থাকে ‘অতি উত্তপ্ত’ বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এ বছর মস্কোর আর্থিক বৃদ্ধিতে আড়াই শতাংশ মন্থর গতি লক্ষ্য করা গিয়েছে, যা ৩.৯ শতাংশে পৌঁছোবে বলে মনে করা হয়েছিল। বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিকে বাদ দিলে রাশিয়ার অন্য শিল্পক্ষেত্রগুলি নিষেধাজ্ঞার কারণে সে ভাবে ব্যবসা করতে পারছে না। সেই কারণেই দেশ জুড়ে থমকে গিয়েছে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি। তারই ফলাফল শসার মতো সাধারণ পণ্যের চড়া দাম।