ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত। ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত বার বার অবসানের চেষ্টা করেছে আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশ। তবে এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইউক্রেনের উপর হামলা করার ‘অপরাধে’ বিশ্বের অনেক দেশই রাশিয়ার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে।
তবে বিগত প্রায় চার বছর ধরে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন যখন সংঘাতে জড়িয়ে, তখন চুপি চুপি নিজেদের সামরিক শক্তি তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছে ইউক্রেনেরই এক প্রতিবেশী। ইউরোপের উদীয়মান ক্ষমতাশালী সামরিক শক্তি হিসাবে উঠে আসছে দেশটি।
দেশটি আর কেউ নয়, পোল্যান্ড। ইউক্রেন-রাশিয়ার প্রতিবেশী। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে বার বার রাশিয়ার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে দেশটি। ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক দ্বৈরথেও নেমেছে।
পোল্যান্ড উত্তরে বাল্টিক সাগর থেকে দক্ষিণে সুদেতেস এবং কার্পেথিয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত। পোল্যান্ডের উত্তরে কালিনিনগ্রাদ ওব্লাস্ট ও লিথুয়ানিয়া, পূর্বে বেলারুশ ও ইউক্রেন, দক্ষিণে স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র এবং পশ্চিমে জার্মানি রয়েছে।
পশ্চিম ইউরোপ এবং রুশ ভূখণ্ডের ‘বাফার রাষ্ট্র’ হিসাবে পরিচিত পোল্যান্ড। রাশিয়া-পোল্যান্ড সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩২ কিলোমিটার। মস্কো-কিভ সংঘাত চলাকালীন একাধিক বার রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের দেশের পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলা চালানোর অভিযোগ তুলেছে পোল্যান্ড।
ইউক্রেনের সীমান্তে ওয়ারশ-লুবলিন রেললাইনের দু’টি অংশে বিস্ফোরণের অভিযোগ তোলে পোল্যান্ড। বিদ্যুৎসংযোগ ব্যবস্থাতেও আঘাত হানার অভিযোগ তোলা হয়। পোল্যান্ডের অভিযোগ, রুশ বাহিনীর মদতপুষ্ট মিলিশিয়াই তাদের দেশে বিভিন্ন নাশকতার জন্য দায়ী।
পোল্যান্ড অতীতে একাধিক বার ইউক্রেনে সক্রিয় রুশ মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কার্যকলাপের অভিযোগ তুলেছে। আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে রুশ সেনার ড্রোনের বিরুদ্ধে। গত বছর রুশ বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধেরও ঘোষণা করেছিলেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক।
পাশাপাশি, গত বছর বেলারুশের ভূখণ্ডে পুতিনের পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সরব হয়েছিলেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। মস্কোর বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র সংবরণ’ নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছিলেন। রুশ হামলায় ঘরছাড়া ইউক্রেনের বহু নাগরিককে আশ্রয়ও দিয়েছে পোল্যান্ড।
২০২৫ সালে সম্ভাব্য রুশ হামলা ঠেকাতে সীমান্ত বরাবর যুদ্ধবিমান মোতায়েন শুরু করে সামরিক জোট নেটোর সদস্য রাষ্ট্রটি। শুরু হয়, আকাশসীমা বরাবর যুদ্ধবিমানের টহলদারি। ওই পরিস্থিতিতে নতুন করে ইউরোপে যুদ্ধের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
ফলে যুদ্ধে ইউক্রেন ধরাশায়ী হলে বা ইউক্রেনকে রাশিয়া দখল করলে ক্রেমলিনের আগামী টার্গেট হতে পারে পোল্যান্ড। আর সেই আশঙ্কা থেকেই নাকি গত চার বছরে মধ্য ইউরোপের দেশটি গোপনে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার তরফে ইউক্রেনে আক্রমণের পরেই নড়েচড়ে বসে পোল্যান্ড। তার পর থেকেই সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে মন দিয়েছে ইউক্রেনের প্রতিবেশী। যুদ্ধ শুরুর পরে নেটোর সদস্য দেশগুলিকে প্রতিরক্ষায় আরও বেশি ব্যয় করার আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রেও অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করছে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং বেলারুশের সীমান্তবর্তী দেশটি।
খবর, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে রিপাবলিক অফ কোরিয়ার (দক্ষিণ কোরিয়া) কাছ থেকে এক হাজার ‘কে২ ব্ল্যাক প্যান্থার’ ট্যাঙ্ক কিনছে পোল্যান্ড। ‘কে২ ব্ল্যাক প্যান্থার’ একটি দক্ষিণ কোরীয় চতুর্থ প্রজন্মের প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্ক। ১৯৯০-এর দশক থেকে উচ্চ গতিসম্পন্ন এবং কৌশলগত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এই ট্যাঙ্ক তৈরি শুরু করেছিল দক্ষিণ কোরিয়া।
ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প এবং প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী ‘হুন্দাই রোটেম’-এর সঙ্গে ওই ট্যাঙ্ক নিয়ে হাজার হাজার কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পোল্যান্ড। নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেটও এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়েছে মধ্য ইউরোপের দেশটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কে২ ব্ল্যাক প্যান্থার’ ট্যাঙ্ক কেনার পাশাপাশি আমেরিকার ‘আব্রাম’ ট্যাঙ্ক এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কেনার দিকেও মন দিয়েছে পোল্যান্ড। চুক্তিও সেরে ফেলেছে বেশ কয়েকটি।
এ ছাড়াও দেশকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে রাখতে ওয়ারশ (পোল্যান্ডের রাজধানী) প্রায় ৬০০ হাউইৎজ়ার, কয়েকশো রকেট লঞ্চার এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনছে।
শুধু আধুনিক সমরাস্ত্রই নয়, সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে পোল্যান্ড। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে পোল্যান্ডে আনুমানিক দেড় লক্ষ সেনা ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা নাকি প্রায় তিন লক্ষ। দেশটি কয়েক বছরের মধ্যে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করে পাঁচ লক্ষ করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে বলেও খবর।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পোল্যান্ড ক্রমাগত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করলেও তা রাশিয়ার সামরিক শক্তির ধারেকাছে নেই। বিভিন্ন সামরিক ক্ষেত্রে ওয়ারশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে মস্কোর থেকে। তবে রাশিয়ার মতো শক্তিধরকে ঠেকিয়ে রাখার মতো ক্ষমতা পোল্যান্ড অর্জন করে ফেলেছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।