পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি। তাতে শামিল হয়েছে আমেরিকাও। পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তি মানেই বিশ্বে জ্বালানি তেলের সঙ্কটের আভাস ওঠা অবশ্যম্ভাবী। এরই সঙ্গে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি নিয়েও মধ্যবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিচ্ছে। বাণিজ্যিক গ্যাসের আকালের জন্য দেশের বহু জায়গায় ছোটখাটো রেস্তরাঁর বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও দেখা দিয়েছে।
এখনও পর্যন্ত বহু জায়গাতেই সে ভাবে রান্নার গ্যাস বা জ্বালানি তেলের সমস্যা না দেখা দিলেও, ভারতে ইতিমধ্যে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। তারই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তা-ও বলা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে ভোগা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বর্তমান যুগে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, ভারতের বেশির ভাগ পরিবারই রান্নার জন্য এলপিজির উপর নির্ভরশীল। অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক বাড়িতেই বিকল্প উপায় নেই বললেই চলে। ইন্ডাকশন অভেনের চল থাকলেও অনেকেই এখনও সে পথে পা বাড়াননি।
কিন্তু ভবিষ্যতে ভারতে যদি রান্নার গ্যাসের আকাল ভয়াবহ রূপেও দেখা যায়, তা-ও একটি গ্রামের মানুষজনের জীবনধারায় তার কোনও প্রভাব পড়বে না। তাঁদের আগেও যেমন সব চলছিল, ভবিষ্যতেও সবই তেমন দিব্য চলবে। রান্নার গ্যাসের না থাকা এঁদের ভাবাবে না।
কথা হচ্ছে পঞ্জাবের হশিয়ারপুর জেলার লম্ব্রা কাঙ্গরী গ্রাম নিয়ে। বিগত দশ বছর ধরে এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ এলপিজি ব্যবহারকে বয়কট করেছেন।
তবে রান্নার গ্যাসের উপর রাগ করে বা অন্য কোনও নেতিবাচক কারণে সেটিকে বাদ দেননি এঁরা। এলপিজির বিকল্প পেয়ে যাওয়ার এঁরা আর সেটির দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করেননি।
সাল ২০১৬। লম্ব্রা কাঙ্গরী মাল্টিপারপস কোঅপারেটিভ সোসাইটির তরফ থেকে বানানো হয়েছিল একটি জৈব গ্যাস প্ল্যান্ট। প্রতি দিন আনুমানিক ২৫০০ কেজি গোবর সেই প্ল্যান্টে দেওয়া হয়। সেখানে তৈরি হয় মিথেন, যা পাইপের সাহায্যে গ্রামের বাড়িগুলিতে পাঠানো হয়।
গ্রামের মোট ৪৪টি বাড়ি সেই গোবরগ্যাসের সাহায্যে নিজেদের জীবন এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। গত দশ বছর ধরে তাঁরা এই গ্যাসের উপর নির্ভর করেই রান্না করছেন।
প্রতি দিন সকালে গ্রামের এই ৪৪টি বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করে এনে জৈব গ্যাসের প্ল্যান্টে ফেলা হয়। তার পর সেখান থেকে মিথেন উৎপন্ন হয়ে পাইপের সাহায্যে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যায়। একটা রান্নার গ্যাস কিনতে যেখানে হাজার টাকার কাছাকাছি বেরিয়ে যায়, সেখানে জৈব গ্যাস উৎপাদনে মাসিক ২০০-৩০০ টাকা মতো খরচ হয়।
লম্ব্রা কাঙ্গরীর বাসিন্দা জসবিন্দ্র সিংহ সৈনীর মাথায় সবার প্রথমে গ্রামকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার ভাবনা ডানা মেলেছিল। তিনি শিক্ষামূলক ভ্রমণের সূত্রে দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার লোকেদের বর্জ্য পদার্থ থেকে শক্তি উৎপাদনের চল নজর কাড়ে জসবিন্দ্রের। তিনি তখনই ঠিক করে নেন যে নিজের গ্রামে ফিরে তিনি এই ব্যবস্থা প্রয়োগের চেষ্টা করবেন।
গ্রামে ফেরার পর জসবিন্দ্র দেখেন যে কী ভাবে শয়ে শয়ে গরুর বর্জ্য লম্ব্রা কাঙ্গরীর জলনিকাশি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে। গোবর জমে নর্দমা, খাল প্রভৃতির মুখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জল বেরোতে পারছে না।
তাই দেখে জৈব গ্যাস প্রকল্পের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন জসবিন্দ্র। তিনি লুধিয়ানায় অবস্থিত পঞ্জাব কৃষি বিদ্যালয় এবং পঞ্জাব দূষণ নিয়ন্ত্রক বোর্ডের থেকে কারিগরি সহায়তা পাওয়ার জন্য কথা বলেন। সেখান থেকে জসবিন্দ্রকে সাহায্যও করা হয়।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি মন্ত্রণালয় থেকে তিনি ২ লক্ষ টাকা সরকারি অনুদান পেয়েছিলেন। এরই সঙ্গে লম্ব্রা কাঙ্গরী কো-অপারেটিভ সোসাইটি জসবিন্দ্রকে বেশ বড় অঙ্কের অনুদান দেন। সে সবের সাহায্যে ২০১৬-তে তিনি নিজের গ্রামে জৈব গ্যাসের প্ল্যান্ট বানানোর স্বপ্ন পূরণ করতে সফল হন।
লম্ব্রা কাঙ্গরীর জৈব গ্যাস প্ল্যান্টটি চালনা করার জন্য আলাদা কর্মীর প্রয়োজন পড়ে না। গ্রামের মানুষেরাই সেটি চালনা করতে পারেন। সকালে সেখানে গোবর ফেলে দিলেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। তার পর প্ল্যান্ট সংলগ্ন ভূগর্ভস্থ পাইপের মাধ্যমে বাড়িগুলিতে মিথেন পৌঁছে যায়।
কোন বাড়িতে কী পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি পরিমাপেরও ব্যবস্থা করা আছে। ৪৪টি পরিবারের প্রতিটিতে মাসিক কতটা করে জৈব গ্যাসের প্রয়োজন পড়ে সেটি হিসাব করা হয় ডিজিটাল মিটারের সাহায্যে। তার পর তাঁদের বাড়িতে রসিদ পৌঁছে যায়।
পঞ্জাবের লম্ব্রা কাঙ্গরীর মতন গুজরাটের জ়াকারিয়াপুরা, ত্রিপুরার দাসপাড়া প্রভৃতি গ্রামের বহু মানুষ বায়োগ্যাসকে রান্নার গ্যাসের বিকল্প হিসাবে বেছে নিয়েছে। ক্রমবর্ধমান দূষণ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সময়কালে বর্জ্যই তাঁদের আশার আলো দেখাচ্ছে।