IDF collapsed

লড়াইয়ে সেনার আকাল নেতানিয়াহুর দেশে! ইরান ও সহযোগীদের সাঁড়াশি আক্রমণে দম ফুরোবে ইহুদি ফৌজের?

টাইমস অফ ইজ়রায়েলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা নিয়ে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকে ইহুদি সেনাবাহিনীর হাঁড়ির হাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীদের সামনে ১০টি বিপদসঙ্কেত উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রতিরক্ষা প্রধান।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ১২:৩১
Share:
০১ ১৮

যুদ্ধের আবহে শঙ্কার মেঘ ঘনাচ্ছে ইহুদি রাষ্ট্রের মাথার উপর। ভিতরে ভিতরে শক্তিক্ষয় হয়ে চলেছে ইজ়রায়েলি সেনার। টানা যুদ্ধবিগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতির ফলে ভেঙে পড়তে পারে ইজ়রায়েলি বাহিনী। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান বহুমুখী যুদ্ধের চাপে ইজ়রায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রতিরোধ শক্তি কমে এসেছে। এই কথা কোনও বিদেশি রাষ্ট্র বা শত্রুপক্ষের দাবি নয়। এই তথ্য জানিয়েছেন খোদ প্রতিরক্ষা দফতরের শীর্ষকর্তা।

০২ ১৮

ইজ়রায়েলের ‘চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ’ বা সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনী নিয়ে আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। নিরাপত্তা ক্যাবিনেটের এক বৈঠকে তিনি জানান, জনবলের তীব্র সঙ্কটের কারণে ইজ়রায়েলের সামরিক বাহিনী ভিতর থেকে ‘ভেঙে পড়তে’ পারে। ক্রমবর্ধমান অভিযানের ফলে বাহিনীতে সেনার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দেশের পরিস্থিতি খুব একটা স্থিতিশীল নয়। এই অবস্থায় সেনার সঙ্কট নতুন করে চিন্তা বাড়িয়েছে তেল আভিভের।

Advertisement
০৩ ১৮

টাইমস অফ ইজ়রায়েলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা নিয়ে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকে ইহুদি সেনাবাহিনীর হাঁড়ির হাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামির। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীদের সামনে ১০টি বিপদসঙ্কেতের উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রতিরক্ষা প্রধান। টানা যুদ্ধ চলতে থাকলে সেনাবাহিনীর মনোবল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা জামিরের।

০৪ ১৮

আইডিএফ প্রধান জামির মূলত সরকারকে এই বার্তাই দিয়েছেন যে, ‘‘শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষও লাগে।’’ ক্রমাগত যুদ্ধের কারণে সেনাদের ওপর যে মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না বলে এক প্রকার হাত তুলে নিয়েছেন ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষা প্রধান।

০৫ ১৮

ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি সূত্র বলছে, বর্তমানে আইডিএফ-এ প্রায় ১২,০০০ সৈন্যের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭,০০০ জন সরাসরি কমব্যাট বা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার মতো সেনাসদস্য। বহু রিজ়ার্ভ সেনাকে ইতিমধ্যে ৬ থেকে ৭ বার তলব করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি রিজ়ার্ভ বাহিনীর কাঠামোও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত না নিলে সংরক্ষিত সেনাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা।

০৬ ১৮

ইজ়রায়েলি সেনাপ্রধানকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘‘এই মুহূর্তে আইডিএফের একটি বাধ্যতামূলক সামরিক আইন, একটি রিজ়ার্ভ ডিউটি আইন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য একটি আইন আনার প্রয়োজন। তা না হলে আইডিএফকে আর কোনও ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভবপর হবে না। সৈন্যসংখ্যা না বৃদ্ধি করলে অচিরেই ইহুদি বাহিনীর রিজ়ার্ভ ব্যবস্থাটিও ধসে পড়বে।

০৭ ১৮

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজ়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বর্তমানে ইরান, লেবানন (হিজবুল্লা) এবং পশ্চিম দিকে একাধিক ফ্রন্টে একসঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে ইজ়রায়েলি বাহিনীকে। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে পাল্টা ‘পাটকেল’ ধেয়ে আসছে তাদের দিকেও। এর পাশাপাশি ‘আল্ট্রা অর্থোডক্স’ ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে যোগদান নিয়ে ইজ়রায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চরম অস্থিরতা চলছে, যা এই সঙ্কটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

০৮ ১৮

গাজ়ার ঘটনার জন্য মোট সাতটি ফ্রন্টে লড়াইয়ের মুখে পড়েছে ইহুদি ফৌজ। গাজ়া যুদ্ধে হামাসের পাশে দাঁড়িয়ে ইজ়রায়েলে হামলা চালায় লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথি। এ ছাড়া পর্দার আড়ালে থেকে তাঁদের হাতিয়ার, গোলা-বারুদ এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছিল ইরান। ইরানের দিক থেকে সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি রয়েছে। সরাসরি স্থলযুদ্ধ এবং তীব্র রকেট হামলা হতে পারে গাজ়া ও লেবাননের দিক থেকে। তেল আভিভের পশ্চিম দিকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও অভিযানের জন্য সেনা পাঠাতে হচ্ছে আইডিএফকে। এ ছাড়াও ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন হুথির হামলা এবং ইরাক ও সিরিয়ার ড্রোন ও দূরপাল্লার হামলাকে রুখে দেওয়ার জন্য সর্ব ক্ষণ লড়া়ইয়ের ময়দানে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে ইজ়রায়েলি বাহিনীকে।

০৯ ১৮

এতগুলি লড়াইয়ে সক্রিয় থাকতে গিয়ে সেনাদের কোনও বিশ্রাম বা রুটিনে বদল করা সম্ভব হচ্ছে না। আইডিএফ প্রধানের ভাষায় যা ‘মানবিক সক্ষমতার বাইরে’। সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথও এই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর গলায়ও একই সুর। জামিরের বক্তব্যকে সমর্থন করে তিনি জানিয়েছেন, ইজ়রায়েলের পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের নীতি আইডিএফ-এর সীমিত সেনাবলের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।

১০ ১৮

উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ব্লুথ জানিয়েছেন যে, গত এক বছরে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার জর্ডন উপত্যকা এবং সমগ্র পশ্চিম তীর জুড়ে অসংখ্য বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। এখানকার বাসিন্দাদের উন্নয়ন ও সুরক্ষার জন্য বর্ধিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা দেওয়ার ক্ষমতা আইডিএফের এই মুহূর্তে নেই। তিনি বলেন, ‘‘সরকারের নীতি বাস্তবায়িত করার জন্য নিরাপত্তা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। এর জন্য আরও ইহুদি বাহিনীর প্রয়োজন।”

১১ ১৮

ইজ়রায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু এখন এটি। কয়েক দশক ধরে ‘আল্ট্রা-অর্থোডক্স’ ইহুদিরা ধর্মীয় পড়াশোনার অজুহাতে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে অব্যাহতি পেয়ে এসেছেন। যদিও সে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই ছাড়কে অবৈধ ঘোষণা করে সকলকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অবিলম্বে আলোচনা এবং নীতি নির্ধারণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিরোধীরা।

১২ ১৮

আর তাতেই প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর শিরে সংক্রান্তি। জোট সরকারের শরিক দলগুলো (ধর্মীয় দল) যদি এই নিয়োগের বিরোধিতা করে সরকার থেকে বেরিয়ে যায়, তা হলে সরকার পতনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা ওয়াকিবহাল মহলের। অন্য দিকে, সাধারণ জনগণ ও সামরিক বাহিনী চাইছে এই বৈষম্য দূর হোক। তাতে আইডিএফের কাঠামো আরও মজবুত হবে।

১৩ ১৮

প্রতিরক্ষা প্রধান ও সামরিক শীর্ষপদাধিকারীদের সতর্কবার্তা প্রকাশ্য আসতেই সরব হয়েছে ইজ়রায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। সেনাপ্রধানের সতর্কবার্তা সম্প্রচারিত হওয়ার পর বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে সরকারকে তুলোধনা করেছেন। নির্দিষ্ট সামরিক কৌশল, অপ্রতুল সৈন্য এবং পর্যাপ্ত রসদ ছাড়া সেনাবাহিনীকে বহুমুখী যুদ্ধে পাঠানোর জন্য নেতানিয়াহুর সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তিনি।

১৪ ১৮

ইজ়রায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহুর সরকারকে একহাত নিয়ে জানিয়েছেন, ইজ়রায়েলি নেতৃত্ব আইডিএফ-কে জিততে বাধা দিচ্ছে। তাঁর দাবি, সেনাদলে ২০,০০০ সৈন্যের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের উপযুক্ত এক লক্ষ ‘আল্ট্রা-অর্থোডক্স’ গোষ্ঠীর হারেদি তরুণকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। যদি তাঁদের মাত্র এক-পঞ্চমাংশকেও নিয়োগ করা হয়, তা হলে এই সঙ্কট কেটে যাবে বলে ধারণা তাঁর।

১৫ ১৮

সেনাঘাটতির বিষয়ে আইডিএফ প্রধানের উদ্বেগ প্রকাশের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তাদের চিঠি লিখে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, জনবলের ঘাটতি শীঘ্রই সেনাবাহিনীর অভিযানিক প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ২০২৪ সালের অগস্টে ইজ়রায়েলে পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা দেওয়ার মেয়াদ ৩০ মাস করা হয়। সেই মেয়াদ ৩৬ মাসে বৃদ্ধি করার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন জামির। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদের তালিকাভুক্ত প্রথম দলটিকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। তাই চলতি আইন পরিবর্তন না করা হলে সঙ্কট আরও বাড়বে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

১৬ ১৮

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে যৌথ ভাবে যুদ্ধঘোষণার এক মাস অতিক্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণই নেই পশ্চিম এশিয়ায়। এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয় তেহরান। মারের জবাব পাল্টা মার দেওয়ার রণনীতিতে অটল সাবেক পারস্যভূমি। ইজ়রায়েলের মতো সেনাসঙ্কটের মুখোমুখি যাতে না হতে হয় তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি সেরে রাখছে মোজতবা খামেনেইয়ের নেতৃত্বাধীন ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী।

১৭ ১৮

নতুন করে বহু ইরানি তরুণকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাতেই অনেকে বাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন। ইরানের সংবাদ সংস্থার দাবি, যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ চোখে পড়ছে। ইরানের এই পদক্ষেপ থেকে পরিষ্কার, হাল ছাড়তে নারাজ তেহরান। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই সব রকম পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত থাকছেন।

১৮ ১৮

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে পশ্চিম এশিয়ায় সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করেছে আমে‌রিকা। আমেরিকার সেনাবাহিনী ইরানের ভিতরে ঢুকে হামলা চালাতে পারে আশঙ্কা করে প্রস্তুতি সেরে রাখছে তেহরান। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার দরজা খুলে রাখার পাশাপাশি বড় সংঘাতের ঘর গুছোতে শুরু করেছে ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনী। এই পরিস্থিতিতে ইজ়রায়েলের সেনার সঙ্কট নতুন করে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর। শুক্রবারও ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে ইরান। ছোড়া হচ্ছে মাঝারি ও দূরপাল্লার একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement