কার্যকর হল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লি ও মস্কোর মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। সেই চুক্তি অনুযায়ী, শুধু যৌথ উদ্যোগে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণ কিংবা প্রযুক্তি হস্তান্তর নয়, সম্ভাব্য সংঘাত-পরিস্থিতিতে ভারত এবং রাশিয়া একে অন্যের ভূখণ্ড এবং সামরিক পরিকাঠামোও ব্যবহার করতে পারবে। তেমনটাই উঠে এসেছে রুশ সংবাদসংস্থা ‘তাস’-এর প্রতিবেদনে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তি মোতাবেক ভারত এবং রাশিয়া এখন থেকে একে অপরের ভূখণ্ডে সেনাঘাঁটি, বন্দর এবং বিমানঘাঁটি ব্যবহার করার পাশাপাশি সর্বাধিক ৩,০০০ সেনাও মোতায়েন করতে পারবে।
রাশিয়ার সংবাদসংস্থা স্পুটনিকও জানিয়েছে, এই চুক্তির অধীনে ভারত এবং মস্কো একে অপরের মাটিতে পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ, ১০টি যুদ্ধবিমান এবং ৩,০০০ সেনা মোতায়েন করতে সম্মত হয়েছে।
ভারত এবং তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য বন্ধু রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ও রসদ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘ইন্দো-রাশিয়ান রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিকস এগ্রিমেন্ট’ বা ‘রেলোস’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের ভারতসফরের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পরে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রে বেলুসোভের বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছিল চুক্তির রূপরেখা।
সেটি আইনগত ভাবে কার্যকর করতে গত ডিসেম্বরে সামরিক বিধির প্রয়োজনীয় সংশোধন করেছিল মস্কো। নয়াদিল্লি-মস্কো যৌথ উদ্যোগে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পে তৈরি অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম ভারত যাতে তৃতীয় দেশে রফতানি করতে পারে, বিধি সংশোধনের মাধ্যমে তারও ছাড়পত্র দিয়েছে পুতিন সরকার।
মস্কো এবং নয়াদিল্লির রেলোস চুক্তি পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। এমনকি এর মেয়াদও বাড়ানো যেতে পারে। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি সুমেরু পর্যন্ত ভারতের কৌশলগত পরিধিও প্রসারিত করেছে।
রাশিয়া এবং চিন এই বিশাল সামুদ্রিক প্রান্তরে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। ফলে উত্তর মেরুতে ভারতের কৌশলগত পরিধি বিস্তৃত হলে বিশ্বের দরবারে ভারতের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
শুধু তাই নয়, মস্কোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়ার মুরমানস্ক এবং সেভেরোমোরস্কের মতো বিশাল বন্দরগুলিতেও নয়াদিল্লি প্রবেশাধিকার পাবে বলে জানা গিয়েছে।
অন্য দিকে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছ থেকে রসদ সরবরাহে সহযোগিতা চাইছে মস্কো। এই চুক্তির আওতায় ভারত থেকে ভারত মহাসাগরে জ্বালানি সরবরাহ, মেরামত, খুচরো যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহের মতো সহায়তা পাবে রাশিয়ার জাহাজগুলি।
মস্কো-নয়াদিল্লির রেলোস চুক্তিতে অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে একে অপরের ব্যয় পরিশোধের সুযোগও রয়েছে। দাবি, রাশিয়া এবং ভারতের মধ্যে সেনাকর্মী ও সামরিক সরঞ্জামের পাশাপাশি জাহাজ ও যুদ্ধবিমান একে অপরের ভূখণ্ডে পাঠানোর পদ্ধতি সম্পর্কিত চুক্তির শর্তাবলি শুক্রবার সরকারি ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই চুক্তিতে দুই দেশের আকাশসীমার পারস্পরিক ব্যবহার এবং রাশিয়া ও ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের একে অপরের বন্দর বা পোতাশ্রয়ে প্রবেশের বিষয়টিকেও নিশ্চিত করা হয়েছে। এই চুক্তিটি যুদ্ধ এবং শান্তিকালীন উভয় সময়েই কার্যকর থাকবে। দুই দেশকে দূরপাল্লার অভিযানে অর্থ এবং সময় সাশ্রয় করতেও সাহায্য করবে চুক্তিটি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার জানিয়েছে, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, মানবিক সহায়তা প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের মোকাবিলা এবং পারস্পরিক সম্মতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রেও পরস্পরের সামরিক পরিকাঠামো ব্যবহার করা যাবে।
রুশ পার্লামেন্ট কর্তৃক চুক্তিটি অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান ভ্যাচেস্লাভ নিকোনভ সম্প্রতি মস্কোয় বলেছেন, ‘‘পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ, ১০টি যুদ্ধবিমান এবং তিন হাজার সৈন্য একসঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দেশের ভূখণ্ডে পাঁচ বছরের জন্য মোতায়েন করা যাবে এবং উভয় পক্ষ সম্মত হলে তা আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো যেতে পারে।’’
আমেরিকার সঙ্গেও আগে একই ধরনের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ভারত। ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অফ এগ্রিমেন্ট’ বা ‘লেমোয়া’ নামে পরিচিত চুক্তিটি জ্বালানি ভরা, রসদ সরবরাহ এবং লজিস্টিক সহায়তার জন্য সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার দেয়। তবে একে অন্যের দেশে সেনা মোতায়েনের বিধান না থাকায় এটি ভারত-রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি রেলোস-এর থেকে ভিন্ন।
সুইডেনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘স্টকহলম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা ‘সিপ্রি’র ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সরঞ্জাম এবং সিস্টেমের বৃহত্তম সরবরাহকারী রাশিয়া।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ছিল বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময়কালে দেশটির মোট প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ৩৬ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে।