পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাতের প্রভাব পড়েছে অন্য দেশেও। সেই তালিকার বাইরে নেই ভারতও। ইতিমধ্যেই দেশে পেট্রোপণ্য এবং রান্নার গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে উদ্বেগ এখন আর জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এক অপ্রত্যাশিত দিক নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়তে শুরু করেছে।
এক কথায় বলতে গেলে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের প্রভাব এখন আর শুধু হেঁশেলে সীমাবদ্ধ নেই, প্রভাব পৌঁছে গিয়েছে শোয়ার ঘরেও। ভারতের ৮৬ কোটি ডলারের কন্ডোম উৎপাদন শিল্পে বড়সড় প্রভাব ফেলেছে এই সংঘাত।
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল এবং লুব্রিকেন্টের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় ভারতীয় কন্ডোম উৎপাদন শিল্পে প্রভাব পড়েছে বলে খবর। ভারতের কন্ডোম উৎপাদন শিল্প বছরে ৪০০ কোটিরও বেশি ইউনিট উৎপাদন করে।
কিন্তু বর্তমানে কাঁচামালের ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে শিল্পটিকে। এই সরবরাহ শৃঙ্খলের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার-পরিচালিত সংস্থা এইচএলএল লাইফকেয়ার লিমিটেডও।
বছরে প্রায় ২২১ কোটি কন্ডোম উৎপাদন করে এইচএলএল সংস্থাটি। এ ছাড়াও ম্যানকাইন্ড ফার্মা লিমিটেড এবং কিউপিড লিমিটেড-সহ প্রধান কন্ডোম উৎপাদন সংস্থাগুলি বর্তমানে সমস্যার মুখে পড়েছে।
কন্ডোম উৎপাদন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল— সিলিকন তেল এবং অ্যামোনিয়া। সিলিকন তেল একটি অত্যাবশ্যকীয় লুব্রিকেন্ট এবং এই উপাদানটিই বর্তমানে ঘাটতির সম্মুখীন। ফলে বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
কাঁচা ল্যাটেক্স স্থিতিশীল করার জন্য অ্যামোনিয়া অপরিহার্য এবং এর দামও ৪০-৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্যাকেজিং উপকরণের ক্রমবর্ধমান খরচও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কন্ডোম উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, “পিভিসি ফয়েল, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং প্যাকেজিং উপকরণের মতো প্রধান কাঁচামালের সরবরাহ সঙ্কট ও মূল্যের অস্থিরতা উৎপাদন এবং অর্ডারের উপর প্রভাব ফেলেছে।” কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় সমস্যাগুলি আরও বেড়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ওই কর্মকর্তার কথায়, “কন্ডোম উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য অ্যামোনিয়ার দাম ৪০-৫০ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিলিকন তেলের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।”
অন্য এক কন্ডোম সংস্থার কর্তার আবার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব পেট্রোকেমিক্যালযুক্ত যে কোনও উপাদানের উপরেই পড়ছে। তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই ক্ষতির মুখে পড়েছি। কিন্তু শিল্পের উপর এর প্রভাবের মাত্রা ও গভীরতা আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে।”
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে জ্বালানি সরবরাহে সঙ্কট তৈরি হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই সম্পদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ শুরু করেছে। ১১ মার্চ একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রকাশ করা হয় যে, উচ্চ-অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দিকগুলোকে রক্ষা করার জন্য পেট্রোকেমিক্যাল ইউনিটগুলির সম্পদ বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হতে পারে। ফলে কন্ডোমের মতো পণ্যের উপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে বলেই মনে করেছেন বিশেষজ্ঞেরা।
সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই সতর্ক করেছেন, উদ্ভূত সঙ্কট কেবল একটি ব্যবসায়িক বাধা নয়, এটি একটি সামাজিক ঝুঁকিও বটে। কন্ডোম উৎপাদনকারী সংস্থার এক কর্মী জানিয়েছেন, ভারতের কন্ডোমের বাজার পশ্চিমি দুনিয়ার মতো নয়।
ভারত স্বল্প-মুনাফায় বেশি পরিমাণ কন্ডোম বিক্রির মডেলে রয়েছে। ১৪০ কোটি মানুষের জন্য কন্ডোমকে সহজলভ্য করার জন্য দাম কম রাখা হয়েছে। ওই কর্মীর কথায়, ‘‘এর ফলে সরাসরি মুনাফার উপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও বাধ্যতামূলক মূল্যবৃদ্ধি আয় বাড়াতে পারে, তবে এতে বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”
ভারতের কন্ডোম উৎপাদন শিল্পে সঙ্কটের সুদূরপ্রসারী প্রভাবও রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত এই পণ্য। ফলে কন্ডোম ব্যবহারে সামান্য হ্রাসও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে মানবজীবনে।