ইরানের প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে পাকিস্তানে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের নেতৃত্বে আমেরিকার প্রতিনিধিদলও রওনা দিয়েছে ইসলামাবাদের উদ্দেশে। দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মাঝে এ বার আলোচনায় বসছে আমেরিকা এবং ইরান। বৈঠকের আয়োজন করছে পাকিস্তান।
তবে ইরান এবং আমেরিকার শান্তিবৈঠকের কাঁটা আটকে রয়েছে হরমুজ় প্রণালীতেই। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসাবে ইরান প্রাথমিক ভাবে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগর (আরব সাগরের অংশ) সংযোগরক্ষাকারী হরমুজ় প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজের অবাধ যাতায়াতে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার তেহরান জানায়, হরমুজ় প্রণালীর উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। দু’সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতি পর্বে দিনে ১৫টির বেশি জাহাজ ওই জলপথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। এবং তার জন্য দিতে হবে শুল্ক, যাকে ট্রাম্প সরাসরি ‘তোলাবাজি’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে ইতি টানা নিয়ে সমঝোতা হলেও হরমুজ় পারাপারের জন্য জাহাজগুলির থেকে শুল্ক আদায় করতে পারে তারা। ট্রাম্প যদিও অনড়, শুল্ক ইরানকে নিতে দেবেন না। মেরিল্যান্ডে বিমান ধরার আগে তিনি বলেন, ‘‘ওরা তা করতে চাইলে আমরা করতে দেব না।’’
অন্য দিকে ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমরা জাহাজগুলিতে সবচেয়ে শক্তিশালী গোলাবারুদ, এখনও পর্যন্ত তৈরি হওয়া সেরা অস্ত্র বসাচ্ছি। এমনকি আগের বার যা করেছিলাম, তার চেয়েও ভাল। যদি চুক্তি না হয়, এ বার আমরা তাদের ধ্বংস করে দেব।’’ শনিবার নিজের সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘ইরান কোনও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। তারা শুধু আন্তর্জাতিক জলপথের মাধ্যমে বিশ্বে তোলাবাজি করতে পারে। কেন তা হবে?’’
ফলে তেহরান এবং ওয়াশিংটন যদি হরমুজ় নিয়ে নিজেদের অবস্থানে অটল থাকে, তা হলে পশ্চিম এশিয়ায় আবার সংঘাত শুরুর আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা। কিন্তু এ বার যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকার অত্যাধুনিক অস্ত্রসম্ভারের হামলা কি ঠেকাতে সক্ষম হবে ইরান?
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা-ইজ়রায়েলকে ছেড়ে কথা বলবে না ইরান। মনে করা হচ্ছে, প্রথম দফার সংঘাতে ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের কেবলমাত্র এক তৃতীয়াংশ ধ্বংস করতে পেরেছে আমেরিকা। এ ছাড়াও তেহরানের সবচেয়ে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভার প্রথম দফার সংঘাতে নাকি ব্যবহারই করেনি ইরান। তেমনটাই উঠে এসেছে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
ইরানের হাতে ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ়— দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের হাতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি। ৩০০ কিলোমিটার থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার এই সব ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একাধিক ধরন রয়েছে।
স্বল্পপাল্লার অস্ত্রের মধ্যে শাহাব-১ (৩৫০ কিমি) এবং শাহাব-২ (৭৫০ কিমি) ব্যবহার করে ইরান। এ ছাড়াও রয়েছে কিয়াম-১, যার পাল্লা ৭৫০ কিমি। সব ক’টিই তরল জ্বালানি দিয়ে চলে। কঠিন জ্বালানি চালিত ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্র ফতেহ পরিবারের মধ্যে রয়েছে ফতেহ-১১০ (৩০০ কিমি), ফতেহ-৩১৩ (৫০০ কিমি) এবং জ়োলফা (৭৫০ কিমি)।
ইরানের হাতে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, সেজ্জিল, গদর ১১০-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির পাল্লা ১,২০০ থেকে ৩,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে।
প্রথম দফার সংঘাতে আমেরিকা-ইজ়রায়েল শত্রুজোটের বিরুদ্ধে কঠিন জ্বালানি চালিত, তরল জ্বালানি চালিত, হাইপারসনিক— বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইরান। হামলা চালিয়েছে ‘ডান্সিং মিসাইল’ নামে পরিচিত সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও। সেজ্জিল ইরানের সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও নকশায় তৈরি দ্বিপর্যায়ের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা চলে কঠিন জ্বালানির সাহায্যে। ‘ডান্সিং মিসাইল’ ছাড়াও সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র পরিচিত সাজ্জিল, আশৌরা এবং আশুরা ক্ষেপণাস্ত্র নামেও।
তবে সূত্র বলছে, এখনও পর্যন্ত আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্রভান্ডারের দুই ‘রত্ন’ কাসিম বশির এবং ফাতা-২ ব্যবহারই করেনি ইরান। কাশিম বশির এবং ফাতা-২, উভয়ই মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।
প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পাল্লার কঠিন জ্বালানি-চালিত কাসিম বশির ক্ষেপণাস্ত্র গত বছরের মে মাসে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইরান ফৌজের এলিট ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড অ্যারোস্পেস ফোর্স’-এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন সে দেশের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ় নাসিরজাদে। বস্তুত, এটি ইরান ফৌজের গত এক দশক ধরে ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হজ কাসিমের উন্নততর সংস্করণ।
ইরান থেকে ইজ়রায়েলের দূরত্ব ১৫০০ কিলোমিটার। ইজ়রায়েলের আকাশ রক্ষার জন্য ‘নিশ্ছিদ্র রক্ষক’ তথা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ রয়েছে। ইরান দাবি করেছিল, ইজ়রায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সমর্থ কাসিম বশির। ২০২৫ সালের জুন মাসে সে কথা প্রমাণও হয়েছিল। ‘আয়রন ডোম’ ভেদ করে তেল আভিভে গিয়ে হামলা চালিয়েছিল কাসিম বশির।
কাসিম বশির ক্ষেপণাস্ত্রটি ৫০০ কেজির ‘ওয়ারহেড’ বহন করতে পারে। পাশাপাশি, এতে রয়েছে ‘অপটিক্যাল টার্মিনাল সিকার’, যা জ্যামারের মতো বাধাকে সহজেই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। ফলে কাসিম বশিরকে ‘অপ্রতিরোধ্য’ বলেই দাবি করে ইরান। যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরুর পর থেকে মাঝারি পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করেনি ইরান।
এ ছাড়াও ইরানের অস্ত্রাগারে রয়েছে ফাতা-২ ক্ষেপণাস্ত্র। শোনা যাচ্ছে, মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রটিও সম্প্রতি শেষ হওয়া যুদ্ধে শত্রুদের উপর নিক্ষেপ করেনি তেহরান। ফাতা-২ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের সেই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’, যা ইরানের সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)’ ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রকাশ্যে আনে।
ফতেহ-১-এর এই উত্তরসূরি একটি ‘হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (এইচজিভি)’, যা উচ্চ গতি এবং কৌশলগত ক্ষমতা অর্জনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইরানের বিবৃতি অনুযায়ী, ফাতা-২ সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার গতিতে ভ্রমণ করতে পারে। ১,৪০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারে। অর্থাৎ, তেহরান থেকে তেল আভিভে গিয়ে হামলা চালাতে ফাতা-২-এর সময় লাগবে ৭-৮ মিনিট।
যদিও বিশ্লেষকেরা এই দাবিগুলির উপর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কারণ, এ রকম বহু দাবি সত্ত্বেও ফতেহ-১ কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়নি। তবে ফাতা-২-এর ক্ষমতা নিয়ে নিজেদের দাবিতে প্রথম থেকেই অটল ইরান।
কিন্তু কেন কাসিম বশির এবং ফাতা-২-কে আমেরিকার এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ব্যবহার করেনি ইরান? আন্তর্জাতিক মহলের বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর নেপথ্যে রয়েছে ইরানের গোপন কৌশল।
মনে করা হচ্ছে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে, যখন শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাবে, তখন কাসিম বশির এবং ফাতা-২-কে ব্যবহার করতে চাইছে ইরান। লক্ষ্য, শত্রুপক্ষের ঘাঁটিতে অবাধ হামলা এবং বড় ক্ষতিসাধন। পাশাপাশি, তাদের কতটা ক্ষমতা, তা যাতে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল আন্দাজ না করতে পারে, তার জন্যই নাকি এখনও পর্যন্ত নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে ইরান। তবে দ্বিতীয় দফায় সংঘাত শুরু হলে, তেহরান সেগুলি ব্যবহার করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।