পশ্চিম এশিয়ায় ইহুদিদের ‘সিংহনাদ’! সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’। দুই মহাশক্তির যাবতীয় রাগ ফের একবার আছড়ে পড়ল সাবেক পারস্য দেশে। তাদের মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় নিহত ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। কেন তাঁকে নিকেশ করতে এতোটা মরিয়া ছিল আমেরিকা ও ইজ়রায়েল? কী ভাবেই বা রাজনৈতিক উত্থান হয় তেহরানের এই কট্টরপন্থী নেতার?
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইজ়রায়েল ও মার্কিন ফৌজ। রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক শহরে আছড়ে পড়ে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। এই আক্রমণের বেশ কয়েক ঘণ্টা পর গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। বলেন, ‘‘খামেনেই এবং পারস্যের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানকে নিশানা করেছিল আমাদের যৌথ বাহিনী। আর তাতেই প্রাণ হারিয়েছেন সেখানকার সর্বোচ্চ নেতা।’’
নেতানিয়াহুর এই বিবৃতির পর নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এই নিয়ে পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘ইতিহাসেরঅন্যতম কুখ্যাত ব্যক্তি খামেনেই। তাঁর বাহিনীর হাতে যাঁদের অঙ্গহানি বা মৃত্যু হয়েছে তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার হল।’’ ১ মার্চ সকালে সুপ্রিম লিডারের মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত করে তেহরান। শুধু তা-ই নয়, তাঁর মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে বলেও জানিয়েছে ইরান।
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের ঐতিহাসিক মাশহাদ শহরে জন্ম আলি খামেনেইয়ের। তাঁর বাবা সৈয়দ জাভেদের শরীরে ছিল আজ়ারবাইজানের তুর্কি রক্ত। অন্য দিকে পার্সি পারিবারের মেয়ে ছিলেন তাঁর মা। আট ভাই-বোনের মধ্যে খামেনেই তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান। মাত্র চার বছর বয়সে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে শুরু করেন তিনি। পবিত্র কোরান পাঠের মধ্যে দিয়ে এর সূচনা হয়েছিল। বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়তে থাকে তাঁর।
ইরানে তখন পুরোদস্তুর রাজশাহি চলছে। তেহরানের তখতে রয়েছেন মহম্মদ রেজ়া শাহ পহেলভি। যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গে যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক ছিল তাঁর। দেশকে আধুনিক করতে সেখানকার মুক্তচিন্তা পারস্যভূমিতে নিয়ে আসেন তিনি। শিয়া কট্টরপন্থীরা তা একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি। ফলে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দানা বাঁধে ক্ষোভ। বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন রুহুল্লাহ খোমিনি নামের এক ধর্মীয় নেতা। ধীরে ধীরে তাঁর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন আলি খামেনেই।
ইরানের সরকারি নথি অনুযায়ী, রেজ়া শাহ পহেলভির শাসনকালে রাজশাহির বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য অন্তত ছ’বার গ্রেফতার হন খামেনেই। তিন বছরের জন্য নির্বাসনেও যেতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭৯ সালে সাবেক পারস্য দেশে ঘটে যায় ‘ইসলামীয় বিপ্লব’। ফলে পরিবার নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শাহ পহেলভি। এই বিপ্লবের অন্যতম মুখ ছিলেন খামেনেই। ফলে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক উত্থান ঘটতে থাকে তাঁরও।
‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর পর ইরানকে কট্টরপন্থী শিয়া রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলেন রুহুল্লাহ খোমিনি। দেশের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারের পদ গ্রহণ করেন তিনি। তত দিনে অবশ্য তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয়ের মধ্যে চলে এসেছেন খামেনেই। ফলে প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত উত্থান হতে থাকে তাঁর। বিপ্লবের এক বছরের মাথায় তেহরান আক্রমণ করেন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। ফলে পড়শি দেশটির সঙ্গে দীর্ঘ এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সাবেক পারস্যের ফৌজ।
ইরাক-ইরান যুদ্ধ টানা আট বছর চলেছিল। এতে নেতৃত্ব দিয়ে পারস্যের ফৌজকে যথেষ্ট সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে যান খামেনেই। লড়াই চলাকালীনই ১৯৮১ সালের ২৭ জুন একরকম মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন তিনি। ওই দিন তেহরানের আবুজায় একটি মসজ়িদে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনার সময় সেখানে হাজির ছিলেন শিয়া ধর্মগুরু। মারাত্মক ভাবে জখম হন খামেনেই। শুধু তা-ই নয়, পক্ষাঘাতে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায় তাঁর ডান হাত।
তবে তেহরানের মসজিদে বিস্ফোরণ খামেনেইকে দমাতে পারেনি। হাসপাতাল থেকে ফিরে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কাজ চালিয়ে যান তিনি। তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্তদের কেউ রেহাই পায়নি। উল্টে একের পর এক চ্যালেঞ্জ টপকে ইরানি আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসিকে আরও শক্তিশালী করেন খামেনেই। এই বাহিনীর আনুগত্য ছিল শুধুই সুপ্রিম লিডার বা দেশের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি।
বিস্ফোরণের চার মাসের মাথায় ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন খামেনেই। তাঁকে ওই পদে নিয়োগ করেন রুহুল্লাহ খোমিনি। তাঁর ধারণা ছিল কট্টরপন্থী শিয়া নেতাদের মধ্যে খামেনেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং যোগ্য। তাঁর প্রমাণ অবশ্য পরবর্তী বছরগুলিতে মিলেছিল। প্রধানমন্ত্রী মির হুসেন মুসাভির নেতৃত্বে সাদ্দামের সেনাকে আটকে দিতে সক্ষম হন তিনি। ফলে ১৯৮৮ সালে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয় বাগদাদ।
ইরাকের সঙ্গে এই যুদ্ধে এক ইঞ্চিও জমি হারাতে হয়নি ইরানকে। ফলে হু হু করে বাড়তে থাকে খামেনেইয়ের জনপ্রিয়তা। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমিনির মৃত্যু হলে প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে সর্বোচ্চ নেতার আসনে গিয়ে বসেন তিনি। এর পরই কট্টরপন্থী নিয়মগুলি আরও কঠোর ভাবে নাগরিকদের উপর প্রয়োগ করতে শুরু করে পারস্যের সরকার। এর ফলে তেহরানের ভিতর নতুন করে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।
ইরানের ‘ইসলামীয় বিপ্লব’কে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। ফলে অচিরেই তেহরানের উপর একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাতে অবশ্য একেবারেই দমে যাননি খামেনেই। উল্টে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ওয়াশিংটনের উপর পাল্টা চাপ তৈরি করেন তিনি। পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে পশ্চিম এশিয়ায় একাধিক প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্ম দেওয়ার অভিযোগ তোলে ইহুদিরা। সেই তালিকায় রয়েছে গাজ়ার হামাস, লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথিদের নাম।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বিশেষ সেনা অভিযান শুরু করে রাশিয়া। ফলে পূর্ব ইউরোপে বেধে যায় যুদ্ধ। এই লড়াইয়ে খোলাখুলি ভাবে মস্কোকে সমর্থন জানান খামেনেই। শুধু তা-ই নয়, তাঁর নির্দেশে সংঘর্ষের মধ্যেই ক্রেমলিনকে বিপুল সংখ্যায় আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করতে থাকে আইআরজিসি। বিনিময়ে পারস্যের প্রতিরক্ষা গবেষকদের হাতে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তুলে দিতে কার্পণ্য করেননি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর প্যালেস্টাইনের গাজ়া থেকে ইজ়রায়েলের উপর ভয়ঙ্কর হামলা চালায় হামাস। তাদের ওই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন আল আকসা ফ্লাড’। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অতর্কিত আক্রমণে মৃত্যু হয় বহু নিরীহ ইহুদি নাগরিকের। সেই খবর মিলতেই হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেন নেতানিয়াহু। এই পরিস্থিতিতে হামাসের পক্ষ নিয়ে আসরে নেমে পড়ে হিজ়বুল্লা ও হুথিও।
ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই প্রতিরোধের অক্ষকে খোলা সমর্থন দিয়েছিলেন খামেনেই। পাশাপাশি, দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানকে পরমাণু শক্তিধর হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল তাঁর। সেই লক্ষ্যে আইআরজিসির তত্ত্বাবধানে পারস্যের প্রতিরক্ষা গবেষকদের ইউরেনিয়াম শুদ্ধকরণের কাজে লাগান তিনি। বিষয়টি নজরে আসতেই প্রমাদ গোনে ইজ়রায়েল। ফলে এক এক করে ইরানের সামরিক বিজ্ঞানীদের নিকেশ করা শুরু করে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ।
ইহুদিদের চক্রান্ত ধরে ফেলতে খামেনেইয়ের বেশি সময় লাগেনি। তাঁকে গদি থেকে সরানোর চেষ্টা করছিল আমেরিকাও। ফলে প্রায়ই ইজ়রায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় শয়তান’ বলে উল্লেখ করতেন তিনি। ১৯৭৯-এর বিপ্লবের পর ইরানি মহিলাদের হিজ়াব পড়াকে বাধ্যতামূলক করেন তাঁর পূর্বসূরি রুহুল্লাহ খোমিনি। ১৯৮৩ সালে এই নিয়ে কঠোর আইন পাশ করে তেহরানের পার্লামেন্ট। এই আইন বলবৎ করতে পারস্য দেশে গড়ে ওঠে ‘নীতি পুলিশ’ নামের একটি বাহিনী।
হিজাব বাধ্যতামূলক হওয়ায় ইরানি আমজনতার ক্ষোভ বাড়ছিল। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশক থেকেই ‘নীতি পুলিশের’ বিরুদ্ধে অত্যাচারের ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠতে শুরু করে। নিন্দকদের কথায়, সবটাই চলত খামেনেইয়ের আঙুলের ইশারায়। গত বছর ডলারের নিরিখে ইরানি মুদ্রার দাম মারাত্মক ভাবে পড়ে গেলে রাস্তায় নেমে আসে আন্দোলন। এই আন্দোলন দমন করতে বিদেশি ভাড়াটে সেনা নামিয়ে দেন খামেনেই। আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাতে দ্বিধা করেনি তারা।
এ-হেন খামেনেইয়ের মৃত্যুতে ফের ক্ষমতার পালাবদল দেখবে ইরান? সংঘর্ষের মধ্যে সেই জল্পনাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার আকাশে। ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন পারস্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও। ফলে তাঁর গদিতে তেহরান কাকে বসায়, সেটাই এখন দেখার।