US Mercenary Arrest

মার্কিন ভাড়াটে সেনার গ্রেফতারিতে বাড়ছে রহস্য, ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তৈরিতে ভারত ভাগের ‘চক্রান্তে’ শামিল আমেরিকা!

উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি নিয়ে একটি স্বাধীন ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তৈরির ষড়যন্ত্র করছে আমেরিকা? তাতে মায়ানমার এবং বাংলাদেশের কিছু এলাকাকে শামিল করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের? মার্কিন ভাড়াটে সেনা এবং তাঁর সহযোগীদের গ্রেফতারিতে উঠছে সেই প্রশ্ন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ১৫:১২
Share:
০১ ১৮

মার্কিন ভাড়াটে ফৌজি ম্যাথু ভ্যানডাইক-সহ সাত বিদেশির গ্রেফতারে তোলপাড় দেশ। তাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে চোরাপথে সাবেক বর্মা মুলুকে ঢুকে সেখানকার বিদ্রোহীদের ড্রোন প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক হাতিয়ার সরবরাহের মারাত্মক অভিযোগ। উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের জমি কেটে নিয়ে ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তৈরির ছক কষছিলেন তাঁরা, না কি ছিল আরও গভীর কোনও ষড়যন্ত্র? সেই প্রশ্নেরই জবাব খুঁজছে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি)।

০২ ১৮

গ্রেফতার হওয়া ভ্যানডাইকের কুকীর্তির সীমা নেই। ২০১১ সালে প্রথম বার খবরের শিরোনামে আসেন তিনি। লিবিয়ায় তখন গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ত্রিপোলির সরকারি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এই মার্কিন ভাড়াটে ফৌজি। মুক্তি পেয়ে ‘সন্স অফ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ বা সোলি নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন ভ্যানডাইক। তাদের মূল কাজ হল, বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহীদের সামরিক প্রশিক্ষণ।

Advertisement
০৩ ১৮

রুশ গোয়েন্দাদের দাবি, সিরিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত ছিলেন ভ্যানডাইক। তাঁর গতিবিধির উপর দীর্ঘ দিন ধরেই নজর রাখছিল মস্কো। সূত্রের খবর, মার্কিন ভাড়াটে ফৌজির পা ভারতে পড়তেই নয়াদিল্লিকে সতর্ক করে ক্রেমলিন। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয় এনআইএ। চলতি বছরের ১৩ মার্চ কলকাতা থেকে ভ্যানডাইককে গ্রেফতার করে তারা। এর পর উত্তরপ্রদেশের লখনউ এবং দিল্লি বিমানবন্দর থেকে তিন জন করে ধরা পড়েন আরও ছয় ব্যক্তি। তাঁরা প্রত্যেকেই ইউক্রেনীয় নাগরিক বলে জানা গিয়েছে।

০৪ ১৮

এনআইএ সূত্রে খবর, কখনও তথ্যচিত্র নির্মাতা, কখনও আবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং যুদ্ধ প্রতিবেদক হিসাবে নিজের পরিচয় দিতেন ভ্যানডাইক। ইউক্রেনীয় সঙ্গীদের নিয়ে পর্যটক ভিসায় ভারতে আসেন তিনি। প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই বিমানে পৌঁছোন গুয়াহাটি। সেখান থেকে মিজ়োরাম হয়ে চোরাপথে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান মায়ানমার। সাবেক বর্মা মুলুকে বেশ কিছু দিন ছিলেন তাঁরা। সেখানে থাকালীন উত্তর-পূর্বে জঙ্গি নাশকতায় জড়িত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে প্রশিক্ষণ দেন ওই মার্কিন ভাড়াটে ফৌজি।

০৫ ১৮

ভ্যানডাইকের গ্রেফতারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন এ দেশের সাবেক সেনাকর্তা থেকে শুরু করে দুঁদে গোয়েন্দাদের একাংশ। তাঁদের দাবি, উত্তর-পূর্ব ভারতে, বাংলাদেশ এবং মায়ানমার থেকে কিছুটা জমি কেটে নিয়ে একটি পৃথক ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ গড়ে তুলতে চাইছে ওয়াশিংটন। আর তাই ওই এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএ-র সঙ্গে ধৃতদের যোগসূত্র মেলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা।

০৬ ১৮

সামরিক বিশ্লেষকদের এই আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতে পৃথক ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তৈরিতে উস্কানি দেওয়ার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক স্বার্থ রয়েছে। গত কয়েক বছরে আর্থিক এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চিনের প্রভূত শক্তিবৃদ্ধিতে ওয়াশিংটনের কপালের ভাঁজ চওড়া হয়েছে। এর জেরে বেজিঙের উপর কড়া নজর রাখতে চান মার্কিন গোয়েন্দাকর্তারা। পাশাপাশি চাপ বাড়াতে ড্রাগনের নাকের ডগায় ফৌজিঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।

০৭ ১৮

সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, আমেরিকা মনে করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাধীন ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তৈরি হলে নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের দ্বারস্থ হবে তারা। কারণ, নামমাত্র সম্পদ নিয়ে ‘আগ্রাসী’ চিনের সামনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা তাদের পক্ষে অসম্ভব। তখন খুব সহজেই সেখানে সেনাঘাঁটি নির্মাণ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেই কারণেই ওই এলাকার জাতিগত বিভাজনকে কাজে লাগাতে চাইছেন তারা।

০৮ ১৮

এ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৃথক ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ গঠনের দাবি কিন্তু আজকের নয়। গত শতাব্দীর ৪০-এর দশকে প্রথম বার এটি উত্থাপিত হয়। ভারত ত্যাগের আগে উত্তর-পূর্বের উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য জেলাগুলিকে নিয়ে একটি পৃথক ‘ক্রাউন কলোনি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। এতে সাবেক বর্মা মুলুকের পশ্চিমাঞ্চলে অন্তর্ভুক্তির নীলনকশাও ছকে ফেলেছিলেন তাঁরা।

০৯ ১৮

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আবার খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হয়ে ওঠার আলাদা ইতিহাস রয়েছে। ১৯ শতকে সেখানকার পার্বত্য উপজাতিরা সনাতনীদের আদলে পুজো-অর্চনা করতেন। প্রথম ইন্দো-বর্মা যুদ্ধের (১৮২৪-’২৬) পর ইয়ানদাবো চুক্তির মাধ্যমে নাগাল্যান্ড এবং মিজ়োরামের দখল নেয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এই লড়াইয়ের পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে সমগ্র উত্তর-পূর্বের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় জনজীবন।

১০ ১৮

কোম্পানির আমলেই নাগাল্যান্ড ও মিজ়োরামের মতো রাজ্যগুলিতে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের আনাগোনা বাড়ছিল। তাঁরা সেখানে প্রভু যিশুর বাণী ছড়িয়ে দেন। ফলে ২০ শতক আসতে আসতে স্থানীয়দের মধ্যে সনাতনী ধর্মাচরণ একরকম বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩৭ সালে প্রশাসনিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে সাবেক বর্মা মুলুককে (আজকের মায়ানমার) ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইংরেজ। ফলে নাগা, কুকি ও মিজ়োর মতো উপজাতি সম্প্রদায়গুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

১১ ১৮

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় খ্রিস্টান অধ্যুষিত উপজাতি এলাকাগুলি নিয়ে পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির প্রস্তাব দেয় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। তাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক রাজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ছিতানগঞ্জ এবং মায়ানমারের উত্তর দিকের বড় অংশের অন্তর্ভুক্তির কথা ছিল। কিন্তু, ইংরেজদের এই দাবির প্রবল বিরোধিতা করে জাতীয় কংগ্রেস। পাশাপাশি নাগা, কুকি বা মিজ়োর মতো উপজাতিগুলিরও এ ব্যাপারে যথেষ্ট আপত্তি ছিল।

১২ ১৮

ভারত স্বাধীন হলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রাখতে চেয়েছিল ব্রিটেন। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই ‘ক্রাউন কলোনি’র চক্রান্তে নেমে পড়ে তারা। শেষ পর্যন্ত তাতে সফল না হলেও দেশভাগের সময় সুযোগ বুঝে একটা ঘা দিতে সক্ষম হয় সুচতুর ইংরেজ। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিতাইগঞ্জকে ইচ্ছাকৃত ভাবে পূর্ব পাকিস্তানে ঠেলে দেয় তাঁরা। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর বাংলাদেশ তৈরি হলে এলাকাটি চলে যায় ঢাকার কব্জায়।

১৩ ১৮

ইউরোপীয় ধর্মযাজকদের প্রভাবে খ্রিস্ট ধর্ম উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতার পরও সেই ধারা অব্যাহত থেকেছে। এই এলাকায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। তারা হল মণিপুরের কুকি, মিজ়োরামের মিজ়ো এবং মায়ানমারের চিন। এরা প্রত্যেকেই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। সম্প্রতি, সম্মিলিত ভাবে এরা নিজেদের ‘জো’ জনগোষ্ঠী হিসাবে তুলে ধরায় জটিল হয়েছে পরিস্থিতি।

১৪ ১৮

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সেখানে নজর পড়েছে আমেরিকার। তা ছাড়া চিনের একেবারে ঘাড়ের কাছে পাহাড়ঘেরা এলাকায় সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা ওয়াশিংটনের পক্ষে অনেকটাই সহজ হবে। এ-হেন স্বপ্নের ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’টিতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বান্দরবান এবং তার আশপাশের এলাকাকে যুক্ত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, সেখানেও বহুল পরিমাণে থাকেন ‘জো’ জাতিগোষ্ঠীভুক্তেরা।

১৫ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, উত্তর-পূর্বের খ্রিস্টান মিশনারিদের সঙ্গে যথেষ্ট সুসম্পর্ক রয়েছে আমেরিকার। আর তাই গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) মার্চে এই ইস্যুতে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারকে সতর্ক করে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন মিজ়োরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা। তাঁর কথায়, ‘‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন-সহ একাধিক পশ্চিমি নাগরিক মায়ানমারে যাওয়ার জন্য আমাদের রাজ্যকে ট্রানজ়িট রুট হিসাবে ব্যবহার করছেন। এটা নিরাপত্তার দিক থেকে বিপজ্জনক।’’

১৬ ১৮

২০২৪ সালে কুকি বনাম মেইতেই জাতিগোষ্ঠীর সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয় মণিপুর। ওই সময় নিরাপত্তাবাহিনীর উপর ড্রোন হামলা চালায় সেখানকার একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। মায়ানমারের গৃহযুদ্ধেও প্রচুর পরিমাণে পাইলটবিহীন সামরিক যান ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, গোটাটাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গুলিহেলনে। সাবেক বর্মা মুলুকে চিনা প্রভাবও পুরোপুরি শেষ করতে চায় ওয়াশিংটন।

১৭ ১৮

২০২২ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তিমুর লেস্তে নামে নতুন একটি দ্বীপরাষ্ট্রের জন্ম দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একসময় যা ছিল ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্গত। এ দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, ভারতের উত্তর-পূর্বেও একই স্টাইলে ‘অপারেশন’-এর ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবাহিনী সিআইএ। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরেও সেনাঘাঁটি পেতে চাইছে তারা।

১৮ ১৮

সেই কারণে ভ্যানডাইক এবং তাঁর সঙ্গীদের গ্রেফতারিকে একেবারেই হালকা ভাবে নিতে নারাজ এনআইএ। দফায় দফায় চলছে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মায়ানমারের রয়েছে খোলা সীমান্ত। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সুবিধা বন্ধ করবে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার? বদলে ফেলবে ব্রিটিশ আমলের আইন? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement