চোখ বন্ধ করে ‘বন্ধু’কে বিশ্বাস। আস্থা এতটাই ছিল যে একসময় সিন্দুক খুলে টন টন সোনা তার হাতে তুলে দিতেও কুণ্ঠা বোধ করেনি ইউরোপের ওই দেশ। কিন্তু সময়ের কাঁটা এগোতেই বদলে গেল পরিস্থিতি। পুরনো সব কিছু ভুলে গিয়ে হঠাৎই যেন কানে বেজে উঠছে শত্রুতার সুর! আর তাই তড়িঘড়ি ‘বন্ধু’র কাছে থাকা হলুদ ধাতুর সম্ভার ঘরে ফেরানোর দাবিতে সোচ্চার হয়েছে ইউরোপীয় দেশটির রাজনৈতিক মহল। তাঁদের ওই দাবির জেরে দীর্ঘ দিনের ‘প্রেম’ ভাঙতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অটুট বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বললে অত্যুক্তি করা হবে না। সম্পর্ক এতটাই মধুর ছিল যে, দেশের স্বর্ণভান্ডারের একটা বড় অংশ আমেরিকার ভল্টে রেখে নিশ্চিন্তে ছিল বার্লিন। কিন্তু ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসার পরই রাতারাতি বদলে গিয়েছে সেই পরিস্থিতি। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভুক্ত রাষ্ট্রটিতে ঘরের সোনা ঘরে ফেরানোর দাবি জোরালো হতে শুরু করেছে।
রাষ্ট্রীয় স্বর্ণভান্ডারের নিরিখে বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে আছে জার্মানি। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বার্লিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হাতে রয়েছে ৩,৩৫২ টন সোনা। এই তালিকায় দীর্ঘ দিন ধরেই অবশ্য প্রথম স্থানটি ধরে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের মজুত করা সোনার পরিমাণ প্রায় ৮,১৩৩ টন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট স্বর্ণভান্ডারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভের ভল্টে রেখেছে জার্মানি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বার্লিনের এ-হেন বিশ্বাস কিন্তু এক দিনে তৈরি হয়নি। এ ছাড়াও জার্মান সরকারের এ-হেন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মধ্য ইউরোপের দেশটিকে দু’টি ভাগে ভাগ করে ফেলে বিজয়ী মিত্রপক্ষ। এর একটা অংশ পেয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া)। অপর অংশের উপর দখলদারি ছিল আমেরিকার।
বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে (কোল্ড ওয়ার) জড়িয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর জেরে দু’পক্ষের মধ্যে পারদ চড়তে থাকায় প্রমাদ গোনে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিম জার্মানি (ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানি বা এফআরজি)। যে কোনও মুহূর্তে মস্কোর লালফৌজের আক্রমণের মুখে পড়ার আতঙ্ক তাদের গ্রাস করেছিল। আর তাই দেশের সোনা নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে ফেলার তাগিদ অনুভব করেছিলেন ইউরোপীয় দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে ‘ঠান্ডা লড়াই’কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের মধ্যে সংঘাত তীব্র হলে দেশের সোনা আমেরিকায় রাখা শুরু করে পশ্চিম জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ১৯৪৯ সালে আটলান্টিকের পারের ইউরোপীয় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গড়ে তোলে ওয়াশিংটন। এর নাম দেওয়া হয় ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ বা নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)। ১৯৫৫ সালে এতে যোগ দেয় এফআরজি। নেটোর সদস্যপদ লাভের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সোনা রাখার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয় জার্মান সরকার।
১৯৯০ সালে মস্কোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দুই জার্মানির একীকরণ ঘটে। এর ঠিক পরের বছর সোভিয়েতের পতন হলে বার্লিনের উপর ক্রেমলিনের আক্রমণের আশঙ্কা একরকম শূন্যে নেমে আসে। তার পরও আমেরিকার ভল্টে সোনা পাঠানো বন্ধ করেনি মধ্য ইউরোপীয় দেশটির সরকার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের মজুত করা হলুদ ধাতুর আনুমানিক পরিমাণ ১,২০০ টন ছাড়িয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই সোনা অবিলম্বে ফেরত আনার দাবি তুলেছে জার্মানির প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল।
জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নাম ‘ডয়েচ বুন্দেসব্যাঙ্ক’। সম্প্রতি আমেরিকা থেকে সোনা ফেরত আনার বিষয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন এই প্রতিষ্ঠানটির সাবেক গবেষণা প্রধান (হেড অফ রিসার্চ) ইমানুয়েল মোঞ্চ। ‘হ্যান্ডেলস্বল্যাট’ নামের একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘‘দেশের বৃহত্তম কৌশলগত স্বাধীনতার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে মজুত থাকা হলুদ ধাতু অবিলম্বে ফিরিয়ে আনা উচিত। কারণ, ওয়াশিংটন আর আগের মতো মিত্রতার জায়গায় নেই। তাদের শরীরী ভাষা বদলে গিয়েছে।’’
জার্মানির আবার ২৭টি দেশের সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ রয়েছে। বার্লিনের সোনার ব্যাপারে বিবৃতি দিয়েছেন এর করদাতা সমিতির প্রধান মাইকেল জ়েগার। তাঁর কথায়, ‘‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইইউ-ভুক্ত দেশগুলির সম্পর্কের ক্রমাবনতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সোনা রাখা জার্মানির জন্য একেবারেই নিরাপদ নয়। অবিলম্বে সেখান থেকে হলুদ ধাতু সরিয়ে আনা উচিত।’’
জ়েগার অবশ্য এই কথা প্রথম বলছেন এমনটা নয়। গত দু’বছর ধরেই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে জার্মান সরকারের উপর চাপ তৈরি করে চলেছেন তিনি। ২০২৪ সালের নভেম্বরের আগে পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও বার্লিনের সম্পর্কে কোনও ফাটল লক্ষ করা যায়নি। ওই সময় হওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের জন্য জয়ী হন ট্রাম্প। তার পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করে।
প্রেসিডেন্ট ভোটে জেতার কয়েক দিনের মাথাতেই পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন ট্রাম্প। আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে ‘সবুজ দ্বীপ’ দখল করার কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় সুমেরু সাগর সংলগ্ন বরফে ঢাকা ওই এলাকায় যান ট্রাম্প-পুত্র। গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলেন তিনি।
কানাডার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে স্বশাসিত সরকার। তবে আন্তর্জাতিক ভাবে ইউরোপীয় দেশ ডেনমার্কের অধিকার এর উপর স্বীকৃত। ২০১৯ সালে প্রথম বার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে কোপেনহেগেনের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। যদিও তাঁর দাবি পত্রপাঠ খারিজ করেছিল ওই ইউরোপীয় দেশ।
জার্মানির মতোই ডেনমার্কেরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ রয়েছে। আর তাই ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলতেই কোপেনহেগেনের পাশে দাঁড়িয়ে তার বিরোধিতা করে বার্লিন। ‘পোটাস’ (পড়ুন প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) তাকে একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি। উল্টে নেটো-ভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলিকে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) পাঁচ শতাংশ খরচ করতে চাপ দিতে থাকেন তিনি।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার পর থেকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মাঝেমধ্যেই সুর চড়াচ্ছিলেন ট্রাম্প। তবে ২০২৬ সালে পা দিয়ে ‘সবুজ দ্বীপ’ কব্জা করার ব্যাপারে একরকম রোখ ধরে বসেন তিনি। ‘পোটাস’-এর যুক্তি, ওই এলাকার আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে চিন ও রাশিয়ার ডুবোজাহাজ, যা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। আর তাই গ্রিনল্যান্ড অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চাইছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই নাছোড়বান্দা মনোভাবের জেরেই জার্মান রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনে আসে বড় পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন তাঁরা। এ ব্যাপারে বার্লিনের গণমাধ্যম রাইনিশ পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন জ়েগার। তাঁর কথায়, ‘‘গ্রিনল্যান্ডের জন্য পোটাস যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। হয়তো জার্মানির উপর তিনি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেবেন। তখন আমেরিকার ভল্ট থেকে সোনা বার করে আনা আমাদের পক্ষে কঠিন হবে।’’
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) এপ্রিলে পারস্পরিক শুল্কনীতি চালু করেন ট্রাম্প। এর জেরে প্রথমে ২০ এবং তার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যে ৩০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেয় মার্কিন প্রশাসন। এর জেরে আমেরিকার বাজারে ব্যবসা করা জার্মানির পক্ষে কঠিন হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তও বার্লিনকে যে রুষ্ট করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
জার্মান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সোনা ফেরত চাওয়ার নেপথ্যে আরও একটি কারণ রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বেড়েছে হলুদ ধাতুর দাম। ফলে নিউ ইয়র্কের ভল্টে থাকা বার্লিনের সোনার বাজারমূল্য ১২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার বা তার বেশি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে আমেরিকার থেকে হলুদ ধাতু ফেরত আনার ব্যাপারে জার্মানির সকলে একমত নন। উদাহরণ হিসাবে ইফো ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের সভাপতি ক্লেমেন্স ফুরেস্টের কথা বলা যেতে পারে। তাঁর কথায়, ‘‘হঠাৎ করে সব সোনা ফেরত চাইলে বার্লিন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাড়বে কূটনৈতিক শৈত্য। মনে রাখতে হবে ট্রাম্প আজীবনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকবেন না। আর রুশ আগ্রাসনের আশঙ্কা এখনও দূর হয়নি।’’
গত শতাব্দীতে বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে তীব্র সঙ্কট দেখা দিলে প্রায় ৪৭ টন সোনা ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডে গচ্ছিত রাখতে বাধ্য হয় ভারত। ১৯৯০-’৯১ সালের মধ্যে ওই হলুদ ধাতু সেখানে পাঠায় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। এর পরই পরিস্থিতি বদলাতে আর্থিক উদারীকরণ নিয়ে আসেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। এর উপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় নয়াদিল্লি।
২০২৪ সালের মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড থেকে প্রায় ১০০ টন সোনা দেশে ফেরায় কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। বিশেষ বিমানে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে নিয়ে আসা হয় ওই হলুদ ধাতু। নয়াদিল্লির পথে হেঁটে একই সিদ্ধান্ত নেবে জার্মান প্রশাসন? না কি অন্য কোনও পন্থা অবলম্বন করবে তারা? এর উত্তর দেবে সময়।